খেলাধুলা সম্পর্কে ইসলাম কি বলে

লেখকঃ মুহাম্মদ ফরহাদ হোসেন

শরীরবিদ্যা ও স্বাস্থ্যবিদ্যায় একটি মোদ্দা কথা হল, ‘খেলাধুলা দেহ-মনের উৎকর্ষ সাধন করে এমনকি পারস্পরিক সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব সৃষ্টিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে।’ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাও কম-বেশি কথাটির সঙ্গে একমত। আজ থেকে দেড় হাজার বছরেরও আগে সর্বকালের, সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ও নবী হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (দঃ) সে কথার গুরুত্ব ও তাৎপর্যের আবহ জাগিয়ে তুলেছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘তোমরা মাঝে মাঝে অন্তরকে বিশ্রাম ও আরাম দেবে।’ (আবু দাউদ)

এ থেকে প্রমাণিত হয়, অনুমোদিত খেলাধুলার মাধ্যমে অন্তর মস্তিষ্কের বিনোদন এবং এর জন্য কিছু সময় বের করা বৈধ।
বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক মুসলিম দেশেই খেলাধুলা চিত্তবিনোদনের একটি বিশেষ মাধ্যম। পশ্চিমা দেশগুলোতে চিত্তবিনোদক হিসেবে খেলাধুলার প্রভাব সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। একসময় মুসলিম দেশের ক্রীড়া ক্ষেত্র ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশ থেকে ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। কালক্রমে পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুকরণে সে ভিন্নতা দূর হয়েছে অনেকাংশেই। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, মুষ্টিযুদ্ধ, কুস্তি, দাবা ইত্যাদির খেলাধুলা এখন আর কেবল পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপ এবং আমেরিকার মহিলারা অনেক আগেই এতে সম্পৃক্ত হয়েছে। মুসলিম দেশগুলোতেও মহিলাদের সম্পৃক্ততা বেড়েছে ব্যাপক হারে এবং এ ব্যাপকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক মুসলিম দেশের সরকার এসব ক্রীড়ায় মহিলাদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করেছে। আমাদের দেশে এটি বাধ্যতামূলক না হলেও সম্প্রতি কুস্তি ফেডারেশন আয়োজিত জাতীয় মহিলা কুস্তি প্রতিযোগিতা এবং কিছু ইসলামী গ্রুপের প্রতিবাদের মুখে শেষমেশ বন্ধ করে দেয়াকে কেন্দ্র করে নানা মহলে যে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে-সে প্রসঙ্গে ইসলামের প্রকৃত অর্থ ও মর্মবাণীর ব্যাখ্যা বাঞ্ছনীয়।

খেলাধুলার ব্যাপারে ইসলামের যুক্তি হচ্ছে, যে খেলা শারীরিক ব্যায়াম তথা স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য অথবা অন্য কোন ধর্মীয় ও পার্থিব উপকারীতা লাভের জন্য অথবা কমপক্ষে মানসিক অবসাদ দূর করার জন্য খেলা হয়, সে খেলা শরীয়ত অনুমোদন করে, যদি তাতে বাড়াবাড়ি না করা হয় এবং এতে ব্যস্ত থাকার কারণে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম বিঘিœত না হয়। মুস্তাদরাক হাকেমে বর্ণিত হযরত আবু হুরায়রার রেওয়ায়েতে রাসুল (সদঃ) বলেন, ‘পার্থিব সব খেলাধুলা বাতিল; কিন্তু তিনটি বাতিল নয়। (১) তীর-ধনুক নিয়ে খেলা। (২) অশ্বকে প্রশিক্ষণ দানের খেলা এবং (৩) নিজের স্ত্রীর সঙ্গে হাস্যরসের খেলা। এ তিন প্রকার খেলা বৈধ। অবশ্য হাদিস বিশারদগণ বলেছেন, বর্ণিত তিনটি ক্রীড়া মূলত প্রতিনিধিত্বমূলক। এগুলোর ওপর কেয়াস করে এ শ্রেণীর অন্যান্য ক্রীড়া ও বিনোদনকে গ্রহণ করা যেতে পারে।

শরীর চর্চা ও সুস্থ বিনোদনের উদ্দেশ্যে যে সব ক্রীড়া নিবেদিত ইসলাম তাকেও উৎসাহিত করেছে। যেমন, অ্যাথলেটিক, বর্শা নিক্ষেপ, দৌড় ইত্যাদি। ইবনে আরাবী ‘আহকামুল কোরআন’-এ বলেনঃ পারস্পরিক দৌড় প্রতিযোগিতা শরীয়তসিদ্ধ হওয়ার কথা সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত আছে। সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমদে হযরত সালাম ইবনে আকওয়া বর্ণনা করেন, জনৈক আনসারী দৌড়ে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। প্রতিযোগিতায় কেউ তাকে হারাতে পারত না। তিনি একদিন ঘোষণা করলেন, কেউ আমার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে প্রস্তুত আছে কি? আমি রাসুলুল্লাহ (দঃ) এর কাছে অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন। অতঃপর প্রতিযোগিতায় আমি জয়ী হয়ে গেলাম। খ্যাতনামা কুস্তিগীর রোকানা একবার রাসুল (দঃ)-এর সঙ্গে কুস্তিতে অবতীর্ণ হলে তিনি তাকে ধরাশায়ী করে দেন। (আবু দাউদ)

আবিসিনিয়ার কতিপয় যুবক মদীনা তায়্যিবায় সামরিক কৌশল অনুশীলনকল্পে বর্শা, তীর ইত্যাদি নিয়ে খেলায় প্রবৃত্ত ছিল। রাসুল (দঃ) হযরত আয়শাকে (রাঃ) নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে তাদের খেলা উপভোগ করছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেন, খেলাধুলা অব্যাহত রাখ। (বায়হাকী)

কতক রেওয়ায়েতে আছে, তোমাদের ধর্মে শুষ্কতা ও কঠোরতা পরিলক্ষিত হোক-এটা আমি পছন্দ করি না। এ থেকে প্রমাণিত হয় বর্শা নিক্ষেপ, তীর নিক্ষেপ, শুটিং ইত্যাদিতে প্রতিযোগিতা করা বৈধ। একইভাবে সাঁতার কাটা, নৌকা বাইচ ইত্যাদি প্রতিযোগিতাও জায়েজ।

আবার কতিপয় খেলা প্রচলিত আছে যেগুলো রাসুল (দঃ) বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন। যেমন, দাবা খেলা। যদিও এতে কিছু উপকার নিহিত আছে তবুও নবী করীম (দঃ) এটি খেলতে নিষেধ করেছেন। ইসলামের সারমর্ম হল, যে খেলায় দ্বীন থেকে পথভ্রষ্ট হওয়ার বা অন্যকে পথভ্রষ্ট করার উপায় থাকে এবং মানুষকে ইসলামী বিশ্বাস থেকে দূরে সরিয়ে গুনাহ ও অশ্লীল কাজে লিপ্ত হতে প্ররোচনা দেয় সেগুলো খেলা হারাম ও কঠোর গুনাহ।

পুরুষদের পাশাপাশি ইসলাম নারীদেরও খেলাধুলায় উৎসাহিত করেছে। তবে শালীনতাবোধ ও কৌশলগত কারণে পুরুষ ও নারীর খেলাধুলায় ভিন্নতা রাখা হয়েছে। যেমন, ইবনে আব্বাসের বর্ণনা মতে, এক হাদিসে রাসুল (সাঃ) বলেন, ‘মুমিনের শ্রেষ্ঠ খেলা সাঁতার কাঁটা এবং নারীর শ্রেষ্ঠ খেলা সুতা কাটা’।

আরেক হাদিসে আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের অল্প বয়সী মেয়েদের খেলাধুলার আবেদনকে মূল্যায়ন করবে।’ (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

আরেক হাদিসে আয়েশা (রাঃ) বলেন, মহানবী (সাঃ) আমার ঘরে এলেন তখন দুটি কিশোরী বুঅস যুদ্ধের গান গাইছিল। তখন তিনি বিছানায় শয়ন করলেন এবং মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। এ সময় আবু বকর (রাঃ) এসে রাগতস্বরে বললেন, রাসুল (দঃ)-এর দরবারে শয়তানের বাঁশি। তখন মহানবী (দঃ) তাঁর দিকে ফিরে বললেন, ওদের গাইতে দাও। (সহীহ বুখারীঃ কিতাবুল ঈদাইন)

বুঝা গেল, মহানবী (দঃ) নারীর চাহিদা, নারীর অধিকার কিংবা নারীর প্রতিভাকে অবমূল্যায়ন করেননি বরং তাদের প্রতিভাকে জাগিয়ে তোলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে সে ইঙ্গিতের অর্থ এ নয় যে, নারী তার লজ্জাবোধ, শালীনতাবোধ ও সম্ভ্রমের মূলে কুঠারাঘাত করে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনায় গা ভাসিয়ে দেবে। কাজেই কুস্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করানোর মাধ্যমে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমরা যদি নারীদের ইজ্জত, সম্ভ্রম ও শালীনতা রক্ষার অধিকার কেড়ে নেই তাহলে তা হবে আমাদের মানব সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কাতার, আরব আমিরাত, আফগানিস্তান, পাকিস্তানসহ কতিপয় মুসলিম দেশে মহিলা কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন ও এতে ওই সব দেশের সরকারের উদ্বুদ্ধকরণে ইসলামের কোন যোগসূত্র নেই। কোন মুসলিম দেশ বা তার সরকার ইসলাম শরীয়তের দলীল নয়। কাজেই মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে সংক্রান বিষয়ে কোরআন, হাদীস ও ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই হবে শুভবুদ্ধির পরিচায়ক। ইসলাম রূঢ় জীবনের বিবর্ণ পথ চলাকে উৎসাহিত করেনি বরং মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা ও সুকুমারবৃত্তিকে লালন করার শিক্ষা দিয়েছে। আমাদের মুসলিম নারীদের জন্য ওই সব খেলা অনুমোদিত হওয়া উচিত। যেগুলোতে তাদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পায় খেলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যেন তাদের আত্মমর্যাদা শালীনতার অধিকারে বিঘ্ন না ঘটে।###

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More