পবিত্র রমযান হচ্ছে আত্মশুদ্ধি, আত্মসংশোধন ও তাকওয়া অনুশীলনের মাস। আল্লাহ মূলতঃ সিয়াম তথা রোযা পালনকে মানুষের উপর এ কারণে ফরয করেছেন যাতে মানুষ সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজেদের বাস্তব জীবনে তাকওয়া অর্জন করতে পারে। কেননা তাকওয়া বা খোদাভীতি হচ্ছে মানবজীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাকওয়ার মাধ্যমে মানুষ পার্থিব জীবনের নানাবিধ বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে এবং শয়তানি প্ররোচনা উপেক্ষা করে খোদামুখী জীবনযাপনের মাধ্যমে দুনিয়া ও পরকালে অপরিসীম কল্যাণের অধিকারী হতে পারে। আল কুরআনের ভাষায়,
“হে ঈমানদারগণ! রোযা তোমাদের উপর ফরয করা হয়েছে, যেরূপে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে করে তোমরা তাকওয়াধারী (ও আত্মসংযমী) হতে পার।”সূরা বাকারা ১৮৩’
“হে লোকসকল! তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর। সূরা নিসা ১”
অপর একটি আয়াতে বলা হয়েছে,
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেক ব্যক্তির চিন্তা করে দেখা উচিত যে, সে আগামীকালের জন্য কী প্রেরণ করেছে। আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয় আল্লাহ তোমরা যা কর সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।”সূরা হাসর : ১৮
সুতরাং, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বারংবার মানুষকে তাকওয়া অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই চেষ্টা, সাধনা এবং অনুশীলন ছাড়া আমাদের জীবনে তাকওয়া অর্জন ও বাস্তবায়ন আদৌ সম্ভবপর নয়। কুরআন আমাদেরকে ঈমান, আকিদা ও বুদ্ধি-বিবেচনার পথ দেখিয়েছে এবং এ পথে অটল থাকারও আদেশ দিয়েছে। আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, যদি প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ়তা না থাকে তবে শুধুমাত্র বুদ্ধি-বিবেচনা মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল রাখতে পারে না। কারণ শয়তানি প্ররোচনা ও নাফসের প্রবৃত্তি সর্বদা সক্রিয় রয়েছে এবং তা সব সময় মানুষকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করতে মরিয়া থাকে।
মানুষ যদি প্রবৃত্তির নেতিবাচক তাড়নায় গা ভাসিয়ে দেয় এবং শয়তানি প্ররোচনায় নিজেকে সোপর্দ করে; তবে সে ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। কিন্তু যদি নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে ও শয়তানের প্ররোচনাকে পরোয়া না করে এবং নিজের মধ্যে এমন শপথ নেয়- ‘শয়তানের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রবৃত্তির চাহিদার কাছে গা ভাসিয়ে দেব না, বরং আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত হব।’ এমতাবস্থায় সে শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিজেকে রক্ষার পাশাপাশি দুনিয়া ও পরকালে চূড়ান্ত সফলতা অর্জনে সক্ষম হবে।
ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ়তার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে; যখন আল্লাহ আমাদেরকে কোন আদেশ দেবেন, তখন আমাদেরকে অবশ্যই তা পালন করতে হবে। পক্ষান্তরে, শয়তান যখন আমাদেরকে কোন বিষয়ে প্ররোচিত
করবে, তখন তা অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এখন কিভাবে আমরা নিজেদের ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ়তাকে মজবুত করতে পারি সে উপায়সমূহ জেনে রাখা জরুরী। আর এ উপায়সমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রোযা পালন করা। কেননা রমযান মাসে সিয়াম সাধনা ও আত্মসংযম আমাদেরকে শিক্ষা দেয় কিভাবে প্রবৃত্তির নানামুখী চাহিদাকে দমন করতে হবে। রোযারত অবস্থাতে নাফস যখন আমাদেরকে দৈনন্দিন অভ্যাসসমূহ তথা ক্ষুধার্ত হলে আহার গ্রহণ, তৃষ্ণার্ত হলে পানি পানসহ নানাবিধ ইন্দ্রিয় চাহিদাদি পূরণের ইন্ধন দেয়, তখন আমরা সে ইন্ধনকে প্রত্যাখ্যান করি; যাতে আমাদের রোযা নষ্ট না হয়। অর্থাৎ, রোযা পালন আমাদের মধ্যে আত্মসংযমের অভ্যাস গড়ে তোলে। আর এ আত্মসংযমের অনুশীলন আমাদের মধ্যে ইতিবাচক দৃঢ়তা ও ইচ্ছাশক্তির সঞ্চালন ঘটায়।
কাজেই, রমযান মাসে রোযারত অবস্থাতে দিনের শুরুতে আমাদের নাফস যখন বলবে প্রাতঃরাশ ও গরম চায়ের মাধ্যমে চাঙ্গা হও; তখন আমরা নিজেদের মধ্যে বলতে থাকি যে, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে রোযা পালন করছি, তাই সব ধরনের পানাহার ও ইন্দ্রিয় চাহিদা থেকে বিরত থাকব।’ এমনকি যাতে রোযা ভঙ্গের কারণ না হয়, সেজন্য আমরা অনেক হালাল দ্রব্য থেকেও নিজেদেরকে বিরত রাখি। রোযারত অবস্থাতে নানাবিধ সুস্বাদু ও পছন্দনীয় খাবার থেকেও দূরে থাকি। এভাবে মাহে রমযানে রোযা পালনের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে আত্মসংযম এবং প্রবৃত্তির চাহিদাসমূহের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রামের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে অনুশীলনের যে অভ্যাস গড়ে ওঠে; তা আমাদেরকে তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংশোধনের পথে উদ্বুদ্ধ করে।
