নবুওত রবির শুভাগমন বনাম মূর্তিপূজার অস্তমন

মানব ইতিহাস মূলত সত্য ও মিথ্যা, আলো ও অন্ধকার, তাওহীদ ও শির্ক, জুলুম ও ইনসাফ এবং সর্বোপরি ভালো ও মন্দের সংঘর্ষের ইতিহাস। এই ইতিহাসের প্রত্যেক যুগেই মহান আল্লাহ মানবজাতিকে সঠিক পথের দিশা দিতে পাঠিয়েছেন এক থেকে একাধিক নবী ও রসুল (আ.)। তাঁদের আগমন ছিল অন্ধকারে আলোর দীপশিখা, বিভ্রান্ত মানবতার জন্যে হেদায়েতের সোপান। অন্যদিকে, মূর্তিপূজা ও শির্ক মানব সভ্যতার এক গভীর ভ্রান্তি – যা মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করেছে, যুক্তিকে করেছে বন্দী এবং আত্মাকে করেছে পরাধীন। নবুওতের সূর্যোদয় তাই কেবল একটি ধর্মীয় ঘটনা নয়, বরং তা মূর্তিপূজার মত যাবতীয় ভ্রান্ত বিশ্বাসের অবসানের এক ঐতিহাসিক ঘোষণা।
এই মানবতার মুক্তির সর্বশেষ দূত হলেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর নবুওত লাভের তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে আহলে বাইত (আ.) প্রেমিক ঐতিহাসিকদের মতে ২৭শে রজবে তিনি এই মহান দায়িত্বে নিয়োজিত হন। তাই এই উপলক্ষ্যে আমরা বিশ্বের সকলকে অভিনন্দন জানাই।
নবুওতের ধারণা ও তাৎপর্য
নবুওত বলতে বুঝায় আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত বিশেষ ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে মানবজাতির কাছে ওহি ও দিকনির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া। নবীগণ ছিলেন মানব সমাজের নৈতিক শিক্ষক, আত্মিক সংস্কারক এবং তাওহীদের আহ্বানকারী। তাঁদের মূল দাওয়াত ছিল এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করা এবং সকল প্রকার শির্ক ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা।
নবুওতের রবি যখন উদিত হয় তখন তা মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও জীবন ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটায়। মানুষ বুঝতে শেখে সৃষ্টি কখনও স্রষ্টা হতে পারে না, পাথর, কাঠ বা ধাতু কখনও উপাস্য হতে পারে না, আর মানুষের হাতে গড়া কোনো মূর্তি ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা রাখে না।
মূর্তিপূজা: উৎপত্তি ও মানবীক দুর্বলতা
মূর্তিপূজার উৎপত্তি মূলত মানুষের অজ্ঞতা, ভয় এবং অতিরিক্ত আবেগের ফল। ইতিহাস বলে, প্রথমে সৎ ও নেক্কার মানুষদের স্মরণে প্রতীক হিসেবে তৈরি হয়েছিল কিছু ভাস্কর্য; সময়ের ব্যবধানে সেগুলোই উপাস্যে পরিণত হয়। মানুষ ধীরে ধীরে স্রষ্টার পরিবর্তে সৃষ্টির কাছে মাথা নত করতে শুরু করে।
মূর্তিপূজা মানুষের যুক্তিবোধকে অবদমিত করে। যে মানুষ নিজ হাতে মূর্তি তৈরি করে, সে-ই আবার সেই মূর্তির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে – এ এক চরম আত্মবিরোধিতা। নবীগণ এই অসংগতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন এবং মানুষকে ফিরিয়ে এনেছেন বিশুদ্ধ তাওহীদের পথে।
নবীগণের সংগ্রাম ও মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে অবস্থান
প্রায় সকল নবীর জীবনেই মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সংগ্রাম এক কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল। হযরত নূহ (আ.) তাঁর কওমকে শত শত বছর তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। হযরত ইবরাহীম (আ.) যুক্তি ও সাহসের মাধ্যমে মূর্তিপূজার ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছেন, মূর্তি ভেঙে মানুষের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। হযরত মূসা (আ.) ফেরাউনের মত স্বৈরশাসক ও তার কৃত্রিম দেবত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।
এই ধারাবাহিক সংগ্রামের চূড়ান্ত ও পূর্ণতা লাভ করে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদের (সা.) মাধ্যমে। জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত আরব সমাজে তিনি তাওহীদের এমন এক বিপ্লব ঘটান যার ফলে আরব ভূখণ্ড হতে মূর্তিপূজা চিরতরে অপসারিত হয়।
নবুওত রবি ও মানবমুক্তি
নবুওতের শুভাগমন কেবল মূর্তিপূজারই অবসান ঘটায়নি; বরং মানুষের চিন্তাচেতনা, সমাজ ও সভ্যতাকে মুক্ত করে। মানুষ শিখে যে, ইবাদত মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ন্যায়, ইনসাফ, মানবীকতা ও নৈতিকতার চর্চা। তাওহীদ মানুষকে সকল প্রকার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে একমাত্র আল্লাহর দাসত্বে আবদ্ধ করে যা প্রকৃত স্বাধীনতার নামান্তর।
সমকালীন প্রেক্ষাপটে নবুওতের শিক্ষা
আজকের যুগে মূর্তিপূজা শুধু পাথর কিংবা মাটির মূর্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্ষমতা, সম্পদ, খ্যাতি ও প্রবৃত্তির পূজাও এক ধরনের আধুনিক মূর্তিপূজা। নবুওতের শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় – যে কোনো কিছুকে আল্লাহর স্থানে বসানোই শির্ক। তাই নবুওতের রবি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখানোর জন্যে।
উপসংহার
নবুওত রবির শুভাগমন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহগুলোর একটি। এর আলোতেই মূর্তিপূজার অন্ধকার দূর হয়েছে এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। নবীগণের আহ্বান আজও মানবতার জন্যে মুক্তির বার্তা বহন করে। অতএব, ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে তাওহীদের চেতনাকে ধারণ করাই হচ্ছে নবুওতের আলোকে গ্রহণ করা এবং এটিই সকল প্রকার মূর্তিপূজার অস্তমন ঘটানোর সর্বোত্তম পথ।

ফজর/ হুজ্জাতুল ইসলাম ড. এম. এ. কাইউম

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More