এমন অনেক সমস্যা আছে যা একা কোন ব্যক্তির পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে তার সাথে যদি এক বা একাধিক ব্যক্তির শ্রম ও প্রচেষ্টা জড়িত হয় তাহলে ঐ সব সমস্যার সমাধান সহজসাধ্য হয়ে যায়। মূলত মানব জীবন পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতা ব্যতীত একদম অর্থহীন এবং তা পাশবিক জীবনে পরিণত হতে বাধ্য।
এ কারণেই ইসলাম অত্যন্ত জোরালোভাবে মুসলমানদেরকে তাদের দ্বীনী ভাইদের জরুরী প্রয়োজনাদি মেটানোর জন্য সাহায্য এবং তাদেরকে সমস্যা মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে একা না রাখার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম মানুষকে সর্বোচ্চ মানবিকতা, সহমর্মিতা ও মহানুভবতার শিক্ষা দিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে আল্লাহ দয়া ও সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে তাঁর নবীকে প্রেরণ করেন । আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, ‘‘আর আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য অনুগ্রহস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’’(সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)
অনাহারীর কষ্টে সমব্যথী হতে আল্লাহ তা‘আলা রমযান মাসে সিয়াম ফরয করেছেন। দুঃখীর অভাব মোচনে যাকাত ফরয ও সাদাকুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। দান-সদকা ও অন্যের জন্য খরচে উদ্বুদ্ধ করে বেশকিছু আয়াত নাযিল হয়েছে। যেমন-
‘কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ (কর্জে হাসনা) দেবে,তা হলে তিনি তার জন্য একে বর্ধিত করে দিবেন এবং তার জন্য সম্মানজনক প্রতিদানও রয়েছে’ (সূরা আল-হাদীদ, আয়াত : ১১)
‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ খরচ করে,কিন্তু রটনা করে না (দানের খোঁটা দেয় না),আর না (যাকে দান করেছে তাকে) কষ্ট দেয়, তাদের প্রতিদান (ও সওয়ার) প্রতিপালকের কাছে আছে; আর না (পরকালে) তাদের কোন ভয় থাকবে, আর না তারা দুঃখিত হবে।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ২৬২)
‘যারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের দৃষ্টান্ত সেই বীজের মত যা থেকে সাতটি শীষ উৎপন্ন হল (এবং) প্রত্যেক শীষে একশ করে দানা হল, এবং আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন আরও বৃদ্ধি করে দেন। এবং আল্লাহ অতিশয় প্রাচুর্যদাতা, সর্বজ্ঞানী।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ২৬১)
‘নিশ্চয় দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, যেক্ষেত্রে তারা (বিশুদ্ধ অভিপ্রায়ে) আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করে তাদের প্রতিদান বর্ধিত করা হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান।’ (সূরা আল-হাদীদ, আয়াত : ১৮)
‘ সুতরাং তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর এবং (তাঁর কথা) শ্রবণ কর ও (তাঁর) আনুগত্য কর এবং (তাঁর পথে) ব্যয় কর; এতেই তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। যারা তাদের আত্মার কৃপণতা (স্বার্থপরতা ও লোভ) হতে মুক্ত, তারাই সফলকাম। যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণদান কর তবে তিনি তোমাদের জন্য তা বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন; আর আল্লাহ অতিশয় গুণগ্রাহী, পরম সহনশীল’ (সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত : ১৬-১৭)
‘আর নামায প্রতিষ্ঠা কর এবং যাকাত প্রদান কর, আর আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। তোমরা তোমাদের আত্মার জন্য যা কিছু কল্যাণ পূর্বে প্রেরণ করবে কেবল তা-ই তোমরা আল্লাহর নিকট উৎকৃষ্টতর রূপে এবং (তার) প্রতিদান মহত্তররূপে পাবে।’ (সূরা আল-মুযযাম্মিল, আয়াত : ২০)
প্রখ্যাত সাহাবী জাবির ইবন আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে কখনো কাউকে ‘না’ বলেননি। তাঁর বদান্যতা,পরোপকার, মানবসেবা ও সমাজকল্যাণে অবদানের অসংখ্য দৃষ্টান্ত ইতিহাস ও হাদীস গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ হয়েছে। মানব সেবায় গুরুত্বারোপ এবং এতে উদ্বুদ্ধ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসংখ্য বাণী উচ্চারণ করেছেন,নিম্নে স্বল্প পরিসরে তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হল।
মহানবী (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মুসলমানদের স্বার্থ ও বিষয়াদি নিয়ে মোটেও চিন্তা-ভাবনা করে না সে মুসলমানই নয়। আর ঐ ব্যক্তিও মুসলিম নয় যে এক মুসলমান ভাইয়ের সাহায্যের আবেদনে সাড়া দেয় না এবং তাকে সাহায্য করতে অগ্রসর হয় না।”(উসূলুল কাফী, পৃঃ ৩৯০)
ইমাম জাফর সাদেক (আ.) বলেছেন, যদি কোন ব্যক্তির কাছে তার মুমিন ভাই প্রয়োজন ও অভাব মেটানোর জন্য সাহায্য প্রার্থনা করে আর তার সামর্থ্য ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সে তাকে সাহায্য না করে তাহলে মহান আল্লাহ্ তাকে এমন এক বিপদে জড়িত করবেন যেন সে আমাদের (আহলে বাইতের) কোন শত্রু “কে সাহায্য করেছে বা করছে এবং এ কারণে মহান আল্লাহ্ তার ওপর শাস্তি (আজাব) অবতীর্ণ করবেন।”( উসূলুল কাফী, পৃঃ ৪৭৬)
কোন ব্যক্তি যদি বসত বাড়ীর মালিক হয় এবং তার কোন মুমিন ভাইয়ের এ রকম থাকার জায়গার প্রয়োজন হয় আর সে যদি তাকে তা না দেয় তাহলে মহান আল্লাহ্ তাঁর ফেরেশতাদেরকে সম্বোধন করে বলবেন, “হে আমার ফেরেশতাগণ, আমার এ বান্দাটি তার (অতিরিক্ত) বাড়ী বা স্থান আমারই আরেক জন বান্দার বসবাস করার জন্য তার হাতে সোপর্দ করে নি। আমি আমার সম্মান ও মহিমার কসম করে বলছি, আমিও বেহেশতে বসবাস করার জন্য কোন স্থান তাকে দেব না।”(উসূলুল কাফী, পৃঃ ৪৭৬)
কোন ব্যক্তির কাছে তারই কোন মুমিন ভাই যদি অভাব ও প্রয়োজন পূরণ করার আবেদন জানায় আর তার সামর্থ্য ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সে তা পূরণ না করে তাহলে মহান আল্লাহ্ কিয়ামত দিবসে তাকে ঘাড়ের সাথে তার দু’হাত বাঁধাবস্থায় পুনরুজ্জীবিত করবেন এবং সকল মানুষের হিসাব ও বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থায় রাখবেন।( বিহারুল আনওয়ার, ১৬শ খণ্ড, পৃঃ ৮০ )
অন্যদিকে মহান আল্লাহ্ এ কাজের (পরোপকার করা) জন্য এমন সওয়াব নির্ধারণ করেছেন যা এতটা গুরুত্বপূর্ণ যে, অন্য কোন সৎ কাজ দ্বারা অর্জিত পুণ্যেও এর নজীর খুব কমই পাওয়া যায়।
মহানবী (সাঃ) বলেছেন,“বেহেশতে মহান আল্লাহর এমন সব বান্দা আছে যারা সেখানে কর্তৃত্ব করবে (এবং উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবে)। আর তারা হচ্ছে ঐ সব ব্যক্তি যারা তাদের মুমিন ভাইদের অভাব ও প্রয়োজনাদি দূর করে দেয়।”( বিহারুল আনওয়ার, ১৬শ খণ্ড, পৃঃ ৮০ )
যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের অভাব ও প্রয়োজনাদি পূরণ করে সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে তার সমগ্র জীবনে মহান আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করেছে।
