ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের নাম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক জীবনবিধান। একজন মুমিনের চরিত্র তখনি পূর্ণতা পায়, যখন তার আচার-ব্যবহারে তার চারপাশের মানুষ, বিশেষ করে প্রতিবেশীরা নিরাপদ ও সুখী থাকে। পবিত্র কুরআন এবং আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষায় প্রতিবেশীর অধিকারকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, একে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।
পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা সূরা নিসা-তে তাঁর ইবাদতের নির্দেশের সাথে সাথে যাদের প্রতি সদয় হওয়ার কথা বলেছেন, সেখানে প্রতিবেশীর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন:
“তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না। আর পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো।” (সূরা নিসা: ৩৬)
এখানে ‘নিকট প্রতিবেশী’ ও ‘দূর প্রতিবেশী’—উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে ইসলামের উদারতা প্রকাশ করা হয়েছে, চাই তারা মুসলিম হোক বা অমুসলিম।
আহলে বাইত (আ.)-এর পবিত্র শিক্ষা ও হাদিস
পবিত্র আহলে বাইত (আ.)-এর ইমামগণ প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
১. ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর বাণী: ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন, “যে ব্যক্তির প্রতিবেশী তার অনিষ্ট ও কষ্ট থেকে নিরাপদ নয়, সে প্রকৃত মুমিন নয়।” তিনি আরও বলেন, “প্রতিবেশীর সাথে সুন্দর আচরণ করলে রিজিকে বরকত আসে এবং মানুষের আয়ু বৃদ্ধি পায়।” (আল-কাফি, খণ্ড ২)।
ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর শিক্ষা: ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তাঁর ‘রিসালাতুল হুকুক’-এ প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে বলেছেন:
-
প্রতিবেশী অনুপস্থিত থাকলে তার সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করা।
-
সে উপস্থিত থাকলে তাকে সম্মান করা এবং তার সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করা।
-
সে বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করা।
-
তার কোনো দোষ বা দুর্বলতা জানলে তা গোপন রাখা।
প্রতিবেশীর প্রতি আমাদের করণীয়
১. কষ্ট না দেওয়া: প্রতিবেশীর চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি করা, উচ্চশব্দে গান বাজানো বা ময়লা ফেলে তাদের পরিবেশ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা। ২. খাবারের ভাগ দেওয়া: নিজের ঘরে ভালো খাবার রান্না করলে বা ফলমূল আনলে সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবেশীকে উপহার দেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সেই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট পুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।” ৩. অসুস্থতায় পাশে দাঁড়ানো: প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার খোঁজ নেওয়া। ৪. সুখ-দুঃখে অংশ নেওয়া: তাদের আনন্দ ও বেদনার মুহূর্তে পাশে থাকা এবং কোনো বিবাদ হলে তা মিটিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া।
প্রতিবেশী হলো আমাদের বিপদের প্রথম বন্ধু। বর্তমান আধুনিক ফ্ল্যাট-সংস্কৃতিতে আমরা অনেক সময় পাশের ঘরের মানুষের খবরও রাখি না, যা ইসলামি জীবন দর্শনের পরিপন্থী। আসুন, আমরা আমাদের প্রতিবেশীর প্রতি সচেতন হই, তাদের সাথে হাসিমুখে কথা বলি এবং একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলি। এতেই দুনিয়াতে শান্তি এবং আখিরাতে মুক্তি নিহিত।
