ফার্সি হতে অনূদিত: ড. এম. এ. কাইউম
অনেক সময় কতিপয় ব্যক্তি কিংবা ওহাবি মতাবলম্বি ব্যক্তিদের মাধ্যমে অন্যতম যে প্রশ্ন অথবা আপত্তিটি উত্থাপিত হয় তা হচ্ছে এই যে, কেন আমরা আল্লাহর ওলিগণের শোক তথা দুঃখ-কষ্টে শোকানুষ্ঠান বা আযাদারি পালন করব? তাঁদের শোকে কেনইবা কান্না ও অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত করব? কেন আমরা বুক চাপড়াব ও মারসিয়া তথা শোকগাঁথা গাইব? কেন আমরা মৃত ব্যক্তিগণের স্মৃতি মন্থন করব বা তাদের কথা স্মরণ করব? তারা কি আমাদের আযাদারি তথা শোকানুষ্ঠান পালনের মুখাপেক্ষী কিংবা আমরা কি তাদের জন্যে শোকানুষ্ঠান পালনের মুখাপেক্ষী?
ওহাবি মতাবলম্বি ব্যক্তিরা এই আমল বা কাজকে বিদআত মনে করে বলে: এসব আমল বা কাজের পেছনে কোনোই দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান নেই এবং এ কারণে এগুলো সুন্নতের অংশ গণ্য হয় না, ফলে এগুলো পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।
এখন আমরা বিভিন্ন স্তরে এ বিষয়টির আলোচনা-পর্যালোচনা করব:
১। আশুরা সংস্কৃতির শোকানুষ্ঠান পালন ও পুনর্জীবনদান: সুস্থ বিচারবুদ্ধি বা বুদ্ধিমত্তার নিকট রুজু করলে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, ঐশী ওলিগণ বিশেষত শহিদগণের নেতা হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) শোকানুষ্ঠান পালন করাটা বিচারবুদ্ধির অনুকূল ও এর সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল। কেননা, তাঁদের পুনর্জীবনদান ও তাঁদের প্রতি সম্মানপ্রদর্শন করাটা প্রকৃতপক্ষে তাঁদের বিশাল ব্যক্তিত্ব ও উক্তিসমূহের প্রতি সম্মানপ্রদর্শন করা। আর যে জাতিই তার নিজের সম্মানিত ও মহৎপ্রাণ ব্যক্তিগণকে সম্মানপ্রদর্শন করে না সে জাতি পরাজিত ও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করে। সম্মানিত ও মহৎপ্রাণ ব্যক্তিগণ তারাই যারা স্বীয় জাতিসমূহের ইতিহাস অঙ্কন করে সেটিকে নির্মাণ করেন।
কতক গুরুত্বপূর্ণ হুসাইনি উক্তি:
১। এ রূপ কোনো অবস্থায় আমি মৃত্যুকে সৌভাগ্য ব্যতীত ও অত্যাচারীদের সঙ্গে জীবনযাপন করাকে কষ্ট ও দুর্ভাগ্য ব্যতীত অপর কিছুই জ্ঞান করি না। (তারিখে দামেশ্ক, ১৪তম খন্ড, পৃ. ২১৮।)
২। সম্মানের পথে মৃত্যু চিরন্তন জীবন ব্যতীত এবং লাঞ্ছনার সঙ্গে জীবনযাপন করাটা মৃত্যু ব্যতীত অপর কিছু নয়।
৩। আপনারা জেনে রাখুন যে, ব্যভিচারীর সন্তান ব্যভিচারী (ইবনে যিয়াদ) আমাকে দু’টি বিষয়ের যেকোনো একটি নির্বাচন করতে বাধ্য করেছে: হয় আমি কোষমুক্ত তরবারি নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করব, নতুবা লাঞ্ছনার পোশাক পরিধান করে ইয়াযিদের হাতে বায়আত করব! কিন্তু লাঞ্ছনা মেনে নেয়াটা আমাদের জন্যে অতীব দুরূহ বিষয়।
৪। নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্যে এবং তারই অভিমুখে প্রত্যাবর্তন করব! ইয়াযিদের ন্যায় কোনো নেতা যখন জাতির নেতৃত্বের আসনে বসে তখন দ্বীন ইসলামকে খোদা হাফেযি করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়! (মাক্তালে খারেজমি, ১ম খন্ড, পৃ. ১৮৪)
৫। আমি কোনো সীমালঙ্ঘন, মুসলমানদের মাঝে কোনো বিভেদ সৃষ্টি এবং কোনো পাপাচার ও অত্যাচার করার উদ্দেশ্যে বের হইনি (আন্দোলনের আহবান জানাইনি)। বরং আমার মাতামহের উম্মতের মাঝে সংশোধনের উদ্দেশ্যেই আমি বের হয়েছি। আমি ন্যায়ের প্রতি আদেশ ও অন্যায়ে নিষেধ করতে চাই এবং আমার মাতামহ ও আমার পিতা “আলি ইবনে আবি তালিবের (আ.)” সীরাতের উপর চলতে চাই।
ঐশী ওলিগণের সঙ্গে উম্মাহর সহৃদয়তাপূর্ণ সম্পর্ক: জনগণের আক্বিদা-বিশ্বাসগত, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়াদির ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অন্যতম মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে মানুষের অস্তিত্বের মধ্যকার অনুভূতিকে আন্দোলিত করা। মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক দিক ও অন্যান্য দিকের তুলনায় এই দিক হতে অধিকতর প্রভাবিত হয়ে থাকে। অপর ভাষায়: এই পদ্ধতিটি অন্যান্য পদ্ধতি বা দিকের তুলনায় অধিকতর প্রভাবশালী। যাই হোক, ঐশী ওলিগণ বিশেষতঃ শহিদ নেতার শাহাদতের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিলে এবং সেই ঘটনার প্রতি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করলে তাদের অনুভূতিসমূহ আন্দোলিত হবে। আর এর মাধ্যমে আমরা সেই মহান ব্যক্তিগণকে অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে পরিচয় করতঃ তাঁদের উক্তি ও আদেশ-নিষেধগুলোকে- যা মূলতঃ আল্লাহরই উক্তি ও আদেশ-নিষেধ জনগণের নিকট পৌঁছে দিতে পারব। এ কারণেই, কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর হতে বিশ বছর যাবৎ হযরত ইমাম যয়নুল আবেদিন (আ.) কারবালার শহিদ বিশেষতঃ তদীয় পিতা হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) জন্যে কান্না করতেন।
এ বিষয়টি ইমাম হুসাইন (আ.) সম্পর্কে ইসলামের নবীর (সা.) কৃত প্রশংসাকে দৃষ্টিতে নেয়ার মাধ্যমে আরও নির্ণীত হয়: রসুল (সা.) বলেন: “হুসাইন আমা হতে এবং আমিও হুসাইন হতে। যে কেউ হুসাইনকে ভালবাসে আল্লাহ তাকে ভালবাসেন।” (সুনানে ইবনে মাজা, ১ম খন্ড, পৃ. ৫১, ফাযায়েলে আসহাবে রাসুলিল্লাহ-সা.।)
তিনি (সা.) আরও বলেন: “হাসান ও হুসাইন হচ্ছেন জান্নাতের যুবকদের সর্দার ও নেতা।” (সহিহ তিরমিযি, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৬১৭; মুসনাদে আহমদ, ৩য় খন্ড, পৃ. ৩৬৯।)
৩। অনুষ্ঠানসমূহের আধ্যাত্মিক পরিবেশ হতে উপকৃত হওয়া: যেহেতু হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ও অপর ঐশী ওলিগণের আধ্যাত্মিক আত্মাসমূহ এসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে থাকেন সেহেতু জনসাধারণ এমনকি শিশুরাও এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এর আত্মিক প্রেরণাসমূহ হতে উপকৃত হতে পারে।
জনৈক খ্যাতনামা ব্যক্তি হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “আপনারা আপনাদের নবজাতকদেরকে কয়েক মাস যাবৎ সেসব অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতে থাকেন যেসবে দ্বীনি শিক্ষা-দিক্ষা দেয়া হয় এবং আল্লাহর যিকির-আযকার, আহলে বাইতের (আ.) স্মরণ ও তাঁদের শোক পালন বিশেষতঃ হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) নাম স্মরণ করা হয়! কেননা, শিশুদের আত্মাগুলো চম্বুকের ন্যায় এবং সেগুলো হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) শিক্ষা-দিক্ষা, যিকর-আযকার ও তাঁর আত্মার পবিত্রতাকে আকর্ষণ করে থাকে। শিশুরা কথা বলতে না পারলেও অনুভব করতে পারে। শৈশব অবস্থায় তাদেরকে পাপের অনুষ্ঠানাদিতে নিয়ে যাওয়া হলে তাদের আত্মাগুলো সেইসব পাপের দ্বারা সংক্রামিত হয়ে পড়ে। বিপরীতপক্ষে, তাদেরকে যিকর-আযকার, ইবাদত-বন্দেগি ও শিক্ষা-দিক্ষার অনুষ্ঠানাদিতে নিয়ে যাওয়া হলে সেগুলো এসব গুণে গুণান্বিত হয়।”
তিনি আরও বলেন: আপনারা আপনাদের শিশুদেরকে, যেসব কক্ষে রওজা পাঠ করা (শোকগাঁথা গাওয়া) হয় কিংবা যিকর-আযকার করা হয় সেসবের পাশে রাখবেন! প্রাচীন আলেমগণ এমনটিই করতেন। কেননা, এ বয়সে শিশুরা যেসব প্রভাবে প্রভাবিত হবে তা তাদের জীবনের শেষ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে এবং তাদের প্রাকৃতিক স্বভাবে পরিণত হবে। কারণ, এই বয়সে শিশুদের আত্মাগুলো নিছক গ্রহণ করার অবস্থায় থাকে। তবে হয়তো এই গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য ও গুরুতর রহস্যটি জনসাধারণ উপলব্ধি করতে পারবে না!”
৪। সমাজের সংশোধন ও দিক-নির্দেশনা দান: সাইয়্যেদুশ্ শোহাদা হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) নামে যেসব অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় সেগুলোতে জনগণ যদিও তাঁরই ভালবাসার টানে অংশগ্রহণ করে থাকেন, তথাপি সেসব অনুষ্ঠানে তারা নিজেদের আক্বিদা-বিশ্বাস, আহকাম ও চরিত্রের ন্যায় ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং দ্বীনি বিষয়াদি শেখার পাশাপাশি অপর মহৎ আত্মিক প্রেরণাও লাভ করে থাকেন এবং এর মাধ্যমে পূর্ণতা ও সৌভাগ্যে উপনীত হন। সেই উদ্দেশ্যেই উপনীত হন যে কারণে হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) শাহাদত লাভ করেন।#####
