ভাগ্য ও নিয়তি প্রসঙ্গে আমিরুল মু’মিনিন আলীর (আ.) মুনাযিরা

আরব ভূ-খণ্ড ও মক্কার অধিকাংশ মুশরিকদের মধ্যে জাবর ও এখতিয়ারের ধারণা তথা মানুষ স্বীয় কাজ-কর্মে স্বাধীন নাকি পরাধীন; এমন আকিদার প্রচলন খুব কমই ছিল। কেননা তদানীন্তন আরব সমাজে মানুষের কর্মপন্থার ধারণা এবং জাবর ও এখতিয়ারের ক্ষেত্রে অধিকাংশ লোকের মধ্যে প্রয়োজনীয় বুদ্ধি-বিবেচনা ছিল না।
তাদের মধ্যে একটি শ্রেণী শিরককে আল্লাহর ইচ্ছা হিসেবে ব্যাখ্যা করত। পবিত্র কুরআনে তাদের উক্ত ধারণা সম্পর্কে বলা হয়েছে,
﴿سَيَقُولُ الَّذِينَ أَشْرَكُواْ لَوْ شَاء اللّهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلاَ آبَاؤُنَا﴾
“শিঘ্রই কাফিররা বলবে, ‘যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তবে না আমরা অংশীবাদী হতাম, আর না আমাদের পূর্বপুরুষরা।”
অপর একটি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, মুশরিকদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের গুনাহকে মনগড়া ব্যাখ্যার মাধ্যমে বৈধতা দিবার অপচেষ্টা করত। কুরআনের ভাষায়,
﴿وَإِذَا فَعَلُواْ فَاحِشَةً قَالُواْ وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءنَا وَاللّهُ أَمَرَنَا بِهَا قُلْ إِنَّ اللّهَ لاَ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاء أَتَقُولُونَ عَلَى اللّهِ مَا لاَ تَعْلَمُونَ﴾
“যখন তারা কোন অশ্লীল কাজ করে তখন বলে, ‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষরাও এমন ছিলেন এবং আল্লাহও আমাদের এ নির্দেশ দিয়েছেন।’ (হে রাসূল!) তুমি বল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ কখনও অশ্লীল কাজের আদেশ করেন না; তোমরা কি আল্লাহর সম্পর্কে (মিথ্যা আরোপ করে) এমন কিছু বলছ যে সম্বন্ধে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই।”
অবশ্য এহেন কল্পিত ব্যাখ্যার ব্যাপক প্রচলন ছিল না। বরং মুষ্টিমেয় কিছু মুশরিকরা এমন আকিদা পোষণ করত। কিন্তু রাসূলের (সা.) ওফাতের পর এবং ইহুদী ধর্মযাজকদের মদীনায় আগমনের ফলে ইহুদী মতবাদের দু’টি বিশেষ চিন্তাধারা উত্থাপিত হতে থাকে, তা হচ্ছে:
১. তাশবীহ (সাদৃশ্যতা) ও তানযীহ (অবমুক্তি)
২. জাবর (বাধ্যতা) ও এখতিয়ার (ইচ্ছাধীনতা)
এহেন চিন্তাধারার প্রবক্তা ইহুদী ধর্মযাজক কা’বুল আহবার ও তার ন্যায় ব্যক্তিরা ছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য একশ্রেণীর লোকেরা অতি উৎসাহী হয়ে তাদের বক্র চিন্তাধারাকে মুসলমানদের মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে।
সাধারণত মুসলিম খলিফা ও গভর্নরদের এ বিষয়ে তেমন কোন অভিজ্ঞতা না থাকায় এ প্রসঙ্গে তাদের নিকট প্রশ্ন উত্থাপিত হলে তারা রূঢ় আচরণ করতেন। নি¤েœ এ সম্পর্কে কয়েকটি নমুনা তুলে ধরছি:
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত: জনৈক ব্যক্তি খলিফা আবু বকরের নিকট এসে বলল যে, ব্যভিচার কি আল্লাহ কর্তৃক পূর্ব নির্ধারিত তকদীর? জবাবে তিনি বলেন: হ্যাঁ, কিন্তু প্রশ্নকারী এহেন কর্মকে মানুষের সত্তার সাথে অসামঞ্জস্য হিসেবে বিবেচনা করে এবং পুনরায় প্রশ্ন করে: তবে কী এটা সম্ভব যে, আল্লাহ আমার তকদীরে কোন কিছু পূর্ব নির্ধারিত করার পর, সে জন্য আমাকে শাস্তি প্রদান করবেন?
খলিফা একথা শোনার পর প্রচন্ড ক্ষীপ্ত হয়ে তাকে বলে: হে অসতি নারীর সন্তান! যদি এখানে কেউ থাকত তবে আমি আদেশ দিতাম তোমার নাক চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে।
যতই দিন অতিবাহিত হচ্ছিল ভাগ্য ও নিয়তির বিষয়টি জাবর ও বাধ্যতার বিশ্বাসে রূপান্তরিত হচ্ছিল। এমনকি তা মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় আকিদা-বিশ্বাস হিসেবে গণ্য হচ্ছিল। উমাইয়া শাসকযন্ত্র এ ভ্রান্ত আকিদাকে ব্যবহার করে তাদের অত্যাচার, অবিচার, অপকর্ম ও জুলুমনীতির স্বীকৃতি লাভের অপচেষ্টা চালাত। উদাহরণস্বরূপ: মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান তার নরাধম ইয়াজিদের অবৈধভাবে সিংহাসন আরোহনকে তকদীর হিসেবে প্রচার করত এবং বলত: আল্লাহ খেলাফতকে তার ভাগ্যে রেখেছিল (নাউজুবিল্লাহ)।
এমনকি উমর ইবনে সা’দ বিশিষ্ট সাহাবীরা যখন রাসূলের (সা.) প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইনকে (আ.) হত্যার জন্য তিরস্কার শুরু করল, তখন সে উক্ত তিরস্কারের জবাবে বলত: আমি আমার চাচাত ভাই ইমাম হুসাইনকে (আ.) অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু সে আমার কোন কথায় কর্ণপাত করেনি। পরিণতিতে যা না হবার তাই হল (কারবালার ট্রাজেডীর প্রতি ইঙ্গিত), আর এটা আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারিত ছিল!!!”
যতই সময় অতিবাহিত হচ্ছিল কাযা ও ক্বাদরের (ভাগ্য-তকদীর ও নিয়তির) বিষয়টি বিস্তৃতি লাভ করছিল। ধীরে ধীরে তা ইসলাম ধর্মের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়াবলির অন্তর্ভূক্তি লাভ করে। এমনকি মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বাল ও শেখ তাহাবীর গ্রন্থে তা ইসলামের মৌলিক বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যেমন: মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বালে বর্ণিত হয়েছে: আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি আদেশ জারী করেছেন এবং তা লংঘনের ক্ষমতা কারও নেই। বরং বান্দারা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাকদীরের পথেই কেবল অগ্রসর হতে পরবে। অতঃপর আরও বর্ণিত হয়েছে: চুরি, ব্যভিচার, মদ্যপান, হত্যা, লুন্ঠনসহ যাবতীয় গুনাহবলি তকদীরগত কারণেই মানুষ সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের ক্ষমতা কারও নেই এবং কেউ আল্লাহর সম্মুখে কোন হুজ্জাতও উপস্থাপন করতে পারবে না। বরং এক্ষেত্রে আল্লাহর হুজ্জাতই চুড়ান্ত।

সংগ্রহ : official Facebook page মাসুমগণের আ. মুনাযিরা https://www.facebook.com/profile.php?id=61560698703752

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More