মানুষের অন্তরের পর্দা

খোদা ছাড়া অন্য যেকোনো কিছুর প্রতি মনোযোগ মানুষকে অন্ধকার ও আলোর পর্দা দিয়ে ঢেকে ফেলে। যদি কোনো দুনিয়াবী বিষয় মানুষের মনোযোগকে দুনিয়ার দিকে নিয়ে যায় এবং মহিমান্বিত খোদাকে উপেক্ষা করার কারণ হয় , তবে (অন্তরের উপর) অন্ধকার পর্দা পড়ে যায়। বস্তুজাগতিক দুনিয়ার সবই হলো অন্ধকার পর্দা। অপরপক্ষে , এই দুনিয়া যদি মহাসত্যের দিকে মনোযোগী হবার উপকরণ হয় , উপকরণ হয় পরকালীন বাসস্থান , যা হলো সম্মানজনক আবাস  সেখানে উপস্থিত হবার , তাহলে এই অন্ধকার পর্দাগুলো আলোর পর্দায় রূপান্তরিত হয়। আর সবকিছু থেকে পরিপূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অর্থ হলো সকল অন্ধকার ও আলোর পর্দাকে ছিন্ন করে দূরে ঠেলে দেয়া , যতক্ষণ পর্যন্ত না ঐশী গেস্টহাউজে প্রবেশ করা যাচ্ছে ঐশী গেস্টহাউজ , যা হলো মহত্ত্বের উৎস । তাই (শা ‘বান মাসের) এই মুনাজাতে মহান খোদার নিকট অন্তরের দৃষ্টি এবং ঔজ্জ্বল্যের জন্য নিবেদন করা হয় , যেনো মুনাজাতকারী আলোর পর্দাগুলিকেও ছিন্ন করে মহত্ত্বের উৎসের নিকট পৌঁছে যায়। যতক্ষণ না অন্তরের দৃষ্টি আলোর পর্দাকে এমনভাবে ছিন্ন করে যে , সে মহত্ত্বের উৎসের সাথে মিলিত হয়।

কিন্তু যে ব্যক্তি এখন পর্যন্ত অন্ধকারের পর্দাগুলিই ছিন্ন করতে পারেনি , যে ব্যক্তি তার সকল মনোযোগ প্রাকৃতিক দুনিয়ার দিকে নিবদ্ধ করেছে , এবং আল্লাহ না করুন আল্লাহর থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছে , এবং যে ব্যক্তি এই দুনিয়ার ঊর্ধ্ব অপর জগৎ এবং আধ্যাত্মিক জগতসমূহ সম্পর্কে মূলতঃ বেখবর , এবং নিজেকে এমন এক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে যে , সে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়নি , তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতাগুলিকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি , তার অন্তরকে আবৃত করে ফেলা অন্ধকারের পর্দাগুলিকে দূরে ঠেলার সিদ্ধান্ত নেয়নি সে নিজেকে (জাহান্নামের) অতল গহবরের বাসিন্দা করে ফেলেছে , যা হলো চূড়ান্ত পর্দা : অতঃপর তাকে নামিয়ে দিয়েছি নীচ থেকে নীচে। (সূরা আত-ত্বীন , ৯৫:৫) , অথচ যেখানে রাব্বুল আলামিন মানুষকে সৃষ্টির সর্বোচ্চ সম্মানিত অবস্থায় ও সম্মানজনক অবস্থান দিয়ে তৈরী করেছেন : নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সুন্দরতম অবয়বে সৃষ্টি করেছি। (সূরা আত-ত্বীন , ৯৫:৪)।

কেউ যদি নিজের কামনার দাস হয়ে পড়ে , এবং যখন থেকে সে নিজেকে বুঝতে শুরু করে , তখন যদি নীচ দুনিয়াবি বিষয় ছাড়া অন্য কোনোদিকে মনোযোগ না দেয় , এবং মনে না করে যে এই নোংরা অন্ধকার দুনিয়ার ঊর্ধ্বে অন্য কোনো জায়গা ও অবস্থান রয়েছে , তাহলে সে অন্ধকারের পর্দায় ডুবে যাবে , এবং তাদের মত হয়ে যাবে , যাদের কথা বলা হয়েছে কুরআনে : কিন্তু সে অধঃপতিত ও নিজের রিপুর অনুগামী হয়ে রইলো। (সূরা আল আ ‘রাফ , ৭:১৭৬)।

পাপ দ্বারা দূষিত এমন এক হৃদয় , অন্ধকারের পর্দা যাকে আবৃত করে ফেলেছে , এবং নানান পাপকর্মের দরুণ সেই অন্ধকার হৃদয় মহান খোদার থেকে এতই দূরে সরে গিয়েছে যে , প্রবৃত্তির উপাসনা আর দুনিয়ার পিছনে ছোটা তার বুদ্ধিমত্তা ও অন্তর্দৃষ্টিকে অন্ধ করে দিয়েছে এমন হৃদয়ের ব্যক্তি অন্ধকার পর্দার আবরণ থেকে মুক্ত হতে পারবে না ; আলোর পর্দা ছিন্ন করে আল্লাহ ব্যতীত আর সকল কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা তো দূরের কথা। এমন ব্যক্তির ঈমান সর্বোচ্চ এতটুকু হতে পারে যে সে অন্ততঃ ওলি-আউলিয়াগণের অবস্থানকে অস্বীকার করবে না , এবং আলমে বারযাখ , সিরাত , পুনরুত্থান , বিচার , কিতাব , জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদিকে কল্পকাহিনী মনে করবে না। দুনিয়ার প্রতি অন্তরের আসক্তি এবং নানান পাপের দরুণ মানুষ ধীরে ধীরে এই সত্যগুলিকে অস্বীকার করে , অস্বীকার করে আল্লাহর ওলি-আউলিয়াগণের অবস্থানকে ।

সূত্র :  জিহাদ আল আকবার : নফসের সাথে যুদ্ধ মূল : আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ আল মুসাভি আল খোমেইনী (রহঃ)অনুবাদ : নূরে আলম মাসুদ।

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More