মানুষের জীবনের অপ্রীতিকর ঘটনাবলীর দর্শন

সমালোচকদের এক দল দুর্ঘটনা, সমস্যা, বালা-মুসিবত, ব্যর্থতা যা মানুষের জীবনে ঘটে থাকে এসকল বিষয়কে উল্লেখ করে আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতাকে অস্বীকার করে এবং এমনকি কখনো কখনো আল্লাহর অস্তিত্বকেও অস্বীকার করে বসে।কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হল।

১. মানুষ সমস্যার মধ্যেই বেড়ে ওঠে আবারও বলছি আমরা কখনোই নিজের হাতে নিজের বিপদ ডেকে আনব না। তবে অনেক সময় বিপদাপদ আমাদের ইচ্ছাকে প্রবল করে এবং শক্তিকে বৃদ্ধি করে দেয়। যেভাবে লোহাকে শক্ত ও মজবুত করার জন্য আগুনে পোড়ানো হয়। আমরাও এসকল বালা-মুসিবতের মধ্য থেকে শক্তিশালী হই। যুদ্ধ অত্যন্ত খারাপ একটি জিনিস। তবে কখনো আবার কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ একটি জাতির সক্ষমতাকে ফুটিয়ে তোলে। তাদের বিচ্ছিন্নতাকে ঐক্যে পরিণত করে এবং তাদের ক্ষয়ক্ষতিকে দ্রুত পুষিয়ে নিতে পারে।একজন প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বলেছেন: বিশ্বের যেখানেই কোন সভ্যতা গড়ে উঠেছে তার পিছনের রহস্য হচ্ছে- তারা কোন স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের হামলার শিকার হয়েছিল এবং তারা নিজেদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সেই পরাশক্তিকে পরাস্ত করে সেই সভ্যতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সমস্যার মোকাবেলায় সকল ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া সমান নয়। অনেকেই এই দুর্ঘটনার ফলে হতাশ এবং নিরাশ হয়ে যায়। কিন্তু যাদের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা আছে তারা সেই প্রতিভাকে জাগ্রত করে সমস্যার সমাধান। করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বিজয় অর্জন করে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই এসকল বিষয়কে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে এবং তার ইতিবাচক ও গঠনমূলক বিষয়টিকে উপেক্ষা করে। আমরাও দাবি করছিনা যে, সকল দূর্ঘটনাই মানুষের জীবনে গঠনমূলক প্রভাব রাখে, তবে এর কিছুকিছু ঘটনা নিঃসন্দেহে প্রভাব রাখে। আপনারা যদি বিশ্বের প্রতিভাবান ব্যক্তিদের দিকে তাকান তাহলে দেখবেন তারা সকলেই দুঃখ কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছেন। বিলাসবহুল জীবনের অধিকারীদেরকে সাধারণতঃ প্রতিভাবান এবং প্রতিষ্ঠিত মানুষ হতে দেখা যায় না। তারাই বড় সেনাপতি হন যারা বড় বড় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তারাই বড় অর্থনীতিবিদ হন যারা অনেক অর্থনৈতিক সমস্যাকে পার করে এসেছেন। তারাই বড় রাজনীতিবিদ হন যারা বড় বড় রাজনৈতিক সমস্যা পার করে এসেছেন। মোটকথা হল: বিপদাপদ এবং সমস্যা মানুষকে পাকাপোক্ত করে গড়ে তোলে এবং প্রশিক্ষণ দেয়। পবিত্র কোরআনে এসম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে: কারণ আল্লাহ যাতে ব্যাপক কল্যাণ ও মঙ্গল রেখেছেন তোমরা হয়তো তাই অপছন্দ করছো। (সূরা নিসা : ১৯)

সুতরাং, অনেক কিছুই মানুষের কাছে অপছন্দনীয় মনে হলেও আল্লাহ সেসবের মধ্যে অনেক কল্যাণ ও বরকত রেখেছেন।

৪. সমস্যার কারণে মানুষ আল্লাহর দিকে ফিরে আসে আমরা পূর্বেই জেনেছি যে, আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গের উদ্দেশ্য রয়েছে। চোখ সৃষ্টির একটি উদ্দেশ্য আছে, কান সৃষ্টির বিশেষ উদ্দেশ্য আছে, হৃদয়, মস্তিস্ক, এবং স্নায়ু সৃষ্টির উদ্দেশ্যও ভিন্ন ভিন্ন। এমনকি আমাদের হাত এবং আঙ্গুলের রেখারও বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে। তাহলে কিভাবে সম্ভব যে, আমাদের পুরো অস্তিত্বটাই কোন ধরণের উদ্দেশ্য ও দর্শন ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে। আমরা জানি যে, আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে সার্বিকভাবে পূর্ণতায় পৌঁছানো। অবশ্যই এই পূর্ণতায় পৌঁছানোর জন্য আমাদেরকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিতে হবে। আর এ জন্যই মহান আল্লাহ আমাদের হিদায়াতের জন্য পবিত্র তাওহীদের ফিতরাত দান করেছেন এবং তার পাশাপাশি নবীগণকে কিভাবসহ প্রেরণ করেছেন । এ উদ্দেশ্যকে পরিপূর্ণ করার জন্য মানুষকে তার গোনাহের প্রতিফলন দেখানো আবশ্যক হয়ে পড়ে। আর এ কারণেই মানুষ আল্লাহর অবাধ্যতা করার জন্য জীবনে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়ে। যার ফলে সে তার গোনাহের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সজাগ হতে পারে এবং তাওবা করে আল্লাহর পথে। ফিরে আসতে পারে। সুতরাং এটা থেকে বোঝা যায় যে, কিছুকিছু বালা-মুসিবত ও অপ্রীতিকর ঘটনা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত এবং নেয়ামতস্বরূপ। পবিত্র কোরআনে এসম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে: স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (আল্লাহর দিকে) ফিরে আসে। (সূরা রূম : ৪১)

সমাজে সৃষ্ট সবধরণের সমস্যার মূলে রয়েছে মহান আল্লাহর আদেশ অমান্য করা কিংবা আল্লাহকে ভুলে যাওয়া। অর্থাৎ কুফর ও শিরক হচ্ছে সব বিপর্যয়ের মূল কারণ। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে যদি কেউ কাজ না করে এবং পাপকাজ করতে ভয় না পায় তাহলে সে নিজের পাশাপাশি তার পরিবার ও সমাজকেও পাপকাজের মাধ্যমে নানা ধরণের বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়। এসব কাজের কিছু পরিণতি দুনিয়ায় মানুষ ভোগ করে এবং বাকিটার প্রতিদান পাপাচারী ব্যক্তিকে পরকালে ভোগ করতে হবে। প্রকৃতির ওপর মানুষের পাপ ও অপরাধী কার্যক্রমের প্রভাব পড়ে। মানুষের পাপের কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। বর্তমানে জলবায়ুতে যে অনাকাঙ্খিত পরিবর্তন দেখা দিয়েছে তা মানুষেরই ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের কারণে হয়েছে। উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে অপ্রীতিকর ঘটনাকে কোনক্রমেই বালা-মুসিবত বলা যাবে না এবং এটাকে আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতার পরিপন্থী বলে আখ্যায়িত করা যাবে না। কেননা বিষয়টিকে যতবেশী পর্যবেক্ষণ করা হবে ততবেশী এর দর্শন ও রহস্য সম্পর্কে জানা যাবে ।

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More