মা’সুমিন (আ.)-এর দৃষ্টিতে হযরত আবু তালিব (আ.)

by Syed Tayeem Hossain

সংকলন ও ভাষান্তর: হুজ্জাতুল ইসলাম মো: আনিসুর রহমান

রাসূলুল্লাহর (সা.) দৃষ্টিতে: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু তালিব সম্পর্কে এভাবে বর্ণনা করেছেন: “বিচার দিবসে হযরত আবু তালিবকে রাজার বেশে এবং নবীদের রূপে উত্থিত করা হবে।”

বিচার দিবসে তার সুপারিশ সম্পর্কে তিনি বলেন: আল্লাহ আমাকে চার ব্যক্তির জন্য সুপারিশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন: ১. আমার বাবা; ২. আমার মা; ৩. আমার চাচা; ৪. আর ঐ সব ভাই যাদের সাথে জাহেলিয়াতের যুগে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলাম।

অন্য একটি বর্ণনাতে তিনি বলেছেন: “আমি যদি মাকামে মাহমুদে অধিষ্ঠিত হই, তাহলে আমি আমার পিতা, মা, চাচা এবং ঐ সব ভাইয়ের জন্য সুপারিশ করব যাদেরকে আমি জাহেলিয়াতের সময় ভাই হিসেবে পেয়েছিলাম।”

অন্য হাদিসে তিনি বলেন: “হযরত জিব্রাইল আমার উপর অবতীর্ণ হয়ে বললেন, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ ছয় জনের জন্য আপনার সুপারিশ কবুল করেছেন:

  • ১. যে গর্ভ আপনাকে বহন করেছে: আমেনা বিনতে ওহাব।
  • ২. যে ব্যক্তি আপনাকে জন্ম দিয়েছে: আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব।
  • ৩. যে কোল আপনাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে: আবু তালিব।
  • ৪. যে ঘর আপনাকে আশ্রয় দিয়েছে: আব্দুল মুত্তালিব।
  • ৫. প্রাক-ইসলামী যুগে যে ভাইয়ের সাথে আপনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলেন।
    জিজ্ঞেস করা হল, তাদের বৈশিষ্ট্য কী ছিল? তিনি বলেন, “তিনি একজন উদার মানুষ ছিলেন যিনি খাবার দিতেন এবং দানশীল ছিলেন।”
  • ৬. যে স্তনটি তোমাকে স্তন্যপান করিয়েছে: আবি জুবায়েরের কন্যা, হালিমা।

হযরত আবু তালিব (আ.) চলে গেলে মহানবী (সা.) খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন এবং আমিরুল মো’মিনীন আলীকে (আ.) নির্দেশ দিয়েছিলেন খাটিয়া প্রস্তুত করার জন্য; যখন তাঁর পবিত্র দেহ খাটিয়ার উপরে রাখা হয়েছিল, তিনি তাকে সম্বোধন করেছিলেন যিনি বহনকারীদের কাঁধে ছিলেন এবং বলেছিলেন: “হে চাচা! আত্মীয়তার সম্পর্কে আপনার সাথে আবদ্ধ, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন, আপনি শিশু অবস্থায় আমার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ও লালন-পালন করেছিলেন এবং প্রাপ্তবয়সে আমাকে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছেন; অতঃপর তিনি জানাজা’র পিছনে হাঁটতে লাগলেন এবং যখন দাফনস্থলে পৌঁছলেন, তখন তিনি বললেন: “আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি যে, আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবো এবং আপনার জন্য এমনভাবে সুপারিশ করবো যেন জ্বিন ও মানুষ অবাক হয়ে যায়।”

তিনি হযরত আবু তালিব (আঃ)-এর খাটিয়া সম্পর্কে আমিরুল মো’মিনীন হযরত আলীকে (আ.) বলেনঃ “যাও তাকে গোসল করাও, কাফন পরাও এবং দাফন কর, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন ও তার প্রতি রহম করুন।”

হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! “আবু তালিব সম্পর্কে আপনি কি আশাপোষণ করেন?” তিনি বলেছিলেন: “প্রভুর কাছে তার জন্য সমস্ত কিছুতে কল্যাণ চাই।”
সে সময় তিনি তার মৃত্যুকে এরূপে মূল্যায়ন করেছিলেন: “কুরাইশরা ততক্ষণ পর্যন্ত আমাকে ভয় করত, যতক্ষণ না আবু তালেব মারা যান।”
তারপর তার শূন্যতা সম্পর্কে বলেন: “হে প্রিয় চাচা! কত তাড়াতাড়ি আমি আপনার শূন্যতা অনুভব করলাম?”
এবং এই বিষয়ে তিনি আরও বলেছেন: “আমি যা পছন্দ করতাম না, [আবু তালিব জীবিত থাকা পর্যন্ত], কুরাইশরা আমার বিরুদ্ধে তা করতে পারেনি, তার মৃত্যুর পর তারা শুরু করেছিল।”

হজরত আবু তালিবের মৃত্যুর তিন দিন পর, হযরত খাদিজাও (সা.আ.) নশ্বর পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছিলেন এবং এইভাবে মহানবী (সা.) তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই সমর্থককে হারিয়েছিলেন এবং এতে তিনি এতটাই ভেঙ্গে পড়েছিলেন যে তিনি সেই বছরটিকে “আমুল হুজ্্ন তথা দুঃখের বছর” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম-এর ভালোবাসা এতটাই ছিল যে, তিনি আকীলকে বললেন: “হে আকিল! আমি তোমাকে দুটি কারণে ভালোবাসি: একটি তোমার নিজের কারণে, অন্যটি এ কারণে যে আবু তালিব তোমাকে ভালোবাসতেন।”

উদ্ধৃত বর্ণনাগুলি থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, মহানবী (সা.) আবু তালিবের অটল সমর্থনের কথা সর্বদা স্মরণ করতেন, তাঁর ভাল কাজগুলির কথা কখনই ভুলে যাননি এবং তাই, যখন মদিনায় খরা হয়েছিল এবং নবী (সা.) বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেছিলেন ও আকাশ থেকে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল, তিনি মুচকি হাসলেন এবং বললেন: “আল্লাহ আবি তালিবের দরজায় রহমত বর্ষণ করেছেন। আবু তালিবের যত কল্যাণ সব আল্লাহর পক্ষ থেকে, তিনি বেঁচে থাকলে অত্যন্ত আনন্দিত হতেন। কে আছ আমাদের জন্য তার কবিতা পড়বে?”
আমিরুল মো’মিনীন আলী (আ.) উঠে দাঁড়ালেন ও তার বিখ্যাত কবিতাটি আবৃত্তি করলেনঃ “শুভ্র চেহারার মানুষটি যার উসিলায় মেঘমালা হতে বারি বর্ষণ হয়।”

মহানবী (সা.) মিম্বরে বসে এই কবিতাগুলো শুনলেন এবং হযরত আবু তালিবের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। অতঃপর “কেনানাহ” থেকে আসা এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়ালেন ও হযরত আবু তালিবের প্রশংসায় একটি কবিতা উপস্থাপন করলেন যা নবীর সমর্থন অর্জন করেছিল।

আলী (আ.)-এর দৃষ্টিতে: মোত্তাকীদের অভিভাবক আমিরুল মো’মিনীন হযরত আলী (আ.) তাঁর মহান পিতা সম্পর্কে যথোপযুক্ত এবং স্পষ্টভাবে কিছু বর্ণনা তুলে ধরেছেন যার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি: “কিয়ামতের দিন আবু তালিবের নূর পাঁচজনের নূর ব্যতীত সকল সৃষ্টির নূরের উপর প্রাধান্য পাবে”।

এবং একই হাদীসের শেষে তিনি বলেনঃ “জেনে রাখো যে, আবু তালিবের নূর আমাদের নূর থেকে, আল্লাহ আদমকে সৃষ্টির দুই হাজার বছর আগে তা সৃষ্টি করেছেন।”
এ প্রসঙ্গে, তিনি আসবাগ ইবনে নাবাতাকে বলেন: “আমার পিতা (আবু তালিব) এবং আমার পূর্বপুরুষ: আব্দুল মুত্তালিব, হাশিম এবং আবদে মানাফ, কখনও মূর্তি পূজা করেননি; তারা কাবা’র দিকে নামায পড়তেন, হযরত ইব্রাহিমের (আ.) ধর্মকে মেনে চলতেন এবং সে ধর্মের আইন অনুসরণ করতেন।”

অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন: “আল্লাহর কসম! আবু তালিব (আব্দে মানাফ বিন আব্দুল মুত্তালিব) একজন মো’মিন (বিশ্বাসী) ও মুসলিম ছিলেন। তিনি এই ভয়ে যে, কুরাইশরা বনি হাশিমকে ধ্বংস করবে তার ঈমানকে (বিশ্বাস) লুকিয়ে রেখেছিলেন।”

এবং অন্য হাদিসে, তিনি বলেছেন: “আমার পিতা আমাকে বললেন: হে বৎস! তোমার চাচাতো ভাই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না, যার দ্বারা তুমি (রাসূলের প্রয়োজনীয়তার) দুনিয়া ও আখেরাতের যেকোনো সমস্যা থেকে রক্ষা পাবে।”

এবং তার ঈমান বা বিশ্বাসের অভিব্যক্তি সম্পর্কে তিনি বলেন: “আবু তালিব মারা যাননি, নিজের প্রতি আল্লাহর রাসূলকে সন্তুষ্ট না করে।”
মুয়াবিয়া মওলায়ে মুত্তাকিয়ান আলীকে (আ.) একটি চিঠিতে লিখেছিলেন যে, আমরা সবাই আবদ আল-মানাফের বংশধর, একজন অন্যজনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়।

জবাবে মাওলায়ে মোত্তাকিয়ান হযরত আলী (আ.) তাকে তথ্যপূর্ণ একটি পত্র পাঠিয়েছিলেন যার কিয়দাংশ আমরা এখানে উল্লেখ করব:

  • ১. উমাইয়ারা হাশেমের মত ছিল না।
  • ২. যুদ্ধ আবদুল মুত্তালিবের সময় ছিল না।
  • ৩. আবু সুফিয়ান আবু তালিবের মত ছিল না। মহানবী (সাঃ) সর্বদা হযরত আবু তালিবের অটল সমর্থন ও সহযোগিতাকে স্মরণ করতেন, তাঁর ভাল কাজগুলি কখনই ভুলে যাননি।
  • ৪. অভিবাসী কখনও বিচ্ছিন্ন ছিল না।
  • ৫. তিনি উজ্জ্বল বংশের মালিক ছিলেন অন্যান্য বংশের মতো নয়।
  • ৬. সত্যপন্থী লোক ছিলেন, মিথ্যাপন্থী লোক ছিলেন না।
  • ৭. একজন ঈমানদার বা বিশ্বাসী ছিলেন, একজন প্রতারক ব্যক্তির মতো ছিলেন না।
  • ৮. এত কিছুর পরেও, নবুয়্যতের শ্রেষ্ঠত্ব আমাদেরই, যা দ্বারা আমরা আমাদের প্রিয়জনকে সেই অপমান ও লাঞ্ছনা থেকে বের করে সম্মানজনক স্থানে পৌঁছে দিয়েছিলাম।

মুত্তাকীদের অভিভাবক আমিরুল মো’মিনীন হযরত আলী (আ.) তাঁর মহীয়সী পিতার শোকে কবিতা লিখেছেন, যার মধ্যে নিম্নলিখিত তথ্যসহ একটি কবিতা রয়েছে:

“রাতের শেষে ক্রন্দনরত অবস্থায় জেগে উঠলাম” আর আবু তালিব ও খাদিজার (সা.আ.) শোকে নিম্নোক্ত আরেকটি কবিতা তিনি লিখেছেন:
“ আল্লাহ তোমাদের উভয়ের মঙ্গল করুন।”

আমিরুল মো’মিনীন হযরত আলী (আ.) খুশি হতেন যদি কেউ হযরত আবু তালিব (আ.) সম্পর্কে কবিতা সংকলিত এবং রচনা করত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন: “এটি শিখুন এবং আপনার সন্তানদের শেখান যে তিনি আল্লাহ প্রদত্ত ধর্মে ছিলেন এবং তাঁর কবিতায় প্রচুর জ্ঞান রয়েছে।”
হযরত আলী (আ.) বলেন: “যখন আমার পিতা মূমুর্ষ অবস্থায় ছিলেন, তখন মহানবী (সা.) এসে আমাকে তাঁর সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে, সমস্ত জগৎ ও যা কিছু এই জগতে রয়েছে সবকিছুর চেয়ে তিনি আমার বেশি প্রিয়।”

ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর দৃষ্টিতে: ইমাম যয়নুল আবিদীন (আ.)-কে আবু তালিবের ঈমান তথা বিশ্বাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল এবং তিনি বলেছিলেন: “এটি খুবই অদ্ভুত [তার বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করা হয়]; কেননা আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে (সা.) কোন মুসলিম নারীর সাথে কাফিরের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকার অনুমতি দিতে নিষেধ করেছিলেন। হযরত ফাতেমা বিনতে আসাদ ইসলামের অন্যতম অগ্রদূত মুসলমান ছিলেন এবং আবু তালিবের জীবনের শেষ পর্যন্ত তাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন।”

ইমাম বাকির (আ.)-এর দৃষ্টিতে: ইমাম বাকির (আ.)-কে বানোয়াট হাদীস “বিদ্রুপ” সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল এবং তিনি বলেছিলেন: “যদি আবু তালিবের ঈমান এক পাল্লায় এবং এই সকল লোকদের ঈমানকে অন্য পাল্লায় ওজন করা হয় তাহলে আবু তালিবের ঈমান তাদের সকলের ঈমানের চেয়ে উচ্চতর হবে”।

আর অন্য হাদিসে তিনি বলেন: “আবু তালিব ইসলাম ও ঈমানের সহিত মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তাঁর দেওয়ানে (কাব্যগ্রন্থ) তাঁর কবিতাগুলি তাঁর ঈমানেরই নির্দেশ করে।”
তারপর তিনি তার ঈমান বা বিশ্বাসের জন্য ১০টিরও বেশি দলিল পেশ করেন।

ইমাম বাকির (আ.)-এর এই ব্যাখ্যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইমাম বাকির (আ.)-এর সময়েই তাঁর দিওয়ান তথা কাব্যগ্রন্থ সংকলিত হয়েছিল। ইমাম সাদেক (আ.)-এর দৃষ্টিতে: কাশশফুল হাক্কায়িক গ্রন্থে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) হতে হযরত আবু তালিব (আ.) সম্পর্কে কিছু বর্ণনা তুলে ধরেছেন, যার কিছু উদাহরণ উল্লেখ করছি: আবু তালিবের উপমা সেই গুহার সাথীদের (আসহাবে কাহাফ) মত, যারা তাদের ঈমান লুকিয়ে রেখে র্শ্কি প্রকাশ করেছিল; সুতরাং আল্লাহ তাদেরকে দু’টি পুরস্কার দিয়েছেন।”

“আবু তালিব মারা যাননি যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কাছে জান্নাতের সুসংবাদ না আসে।”
ইমাম সাদিক (আ.) ইউনুস ইবনে নাবাতাকে বললেন: “আবু তালিবের ঈমান বা বিশ্বাস সম্পর্কে লোকেরা কী বলে?” তিনি বললেন যে, তারা বলে: “আগুনের ফুটন্ত অগভীর জলে নিক্ষেপ করা হবে যাতে তার মস্তিষ্ক পর্যন্ত গলে যায়!!” তিনি বলেন: “আল্লাহর শত্রুরা মিথ্যা বলছে। আবু তালিব নবীদের, সত্যবাদীদের, শহীদদের ও সৎকর্মশীলদের অন্যতম সঙ্গী আর তারা কত-ই না ভালো সঙ্গী।”
ইমাম সাদেক (আ.)-কে বলা হয়েছিল: “তারা মনে করে যে, আবু তালিব কাফের অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন!!” তিনি বলেন, ওরা মিথ্যা বলছে, এটা কিভাবে সম্ভব যে, তিনি কাফের হতে পারেন; যখন বলা হয়ে থাকে:
“তারা কি জানে না যে, আমরা মুহাম্মাদকে নবী হিসেবে প্রেরণ করেছি যেমন মুসাকে প্রেরণ করেছিলাম, যে বিষয়ে ঐশী ধর্মগ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে?”
আর অন্য হাদিসে তিনি তাঁর কবিতার দুটি লাইনকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

ইমাম রেজা (আঃ) এর দৃষ্টিতে: হযরত আবদুল আজিম আল-হাসানী হযরত আলী ইবনে মুসা আর-রেজা (আ.)-কে চিঠি লিখেন ‘দ্বাহদ্বাহ বা অগভীর ফুটন্ত পানি’ হাদিস সম্পর্কে জানতে চাইলেন। ইমাম জবাবে লিখেছেন: “আপনি যদি আবু তালিবের বিশ্বাসে সন্দেহ করেন তবে আপনার প্রত্যাবর্তন হবে আগুনের দিকে।” আবান ইবনে মুহাম্মদ অষ্টম ইমামের নিকট লিখেন: “আমার প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক, আমি আবু তালিবের ঈমান তথা বিশ্বাস সম্পর্কে সন্দিহান।” জবাবে ইমাম উপরোল্লেখিত চিঠিটি লেখেন।

ইমাম রেজা (আ.) তাঁর চিঠিতে যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন তা ইঙ্গিত করে যে, আবু তালিবের বিশ্বাসের প্রতি সন্দেহ পোষণ করা শুধুমাত্র নিষ্পাপ ও পবিত্র পরিবারের সাথে শত্রুতার বহিঃপ্রকাশ ব্যতিত কিছু না তাই ইমাম (আ.) এমন দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন।

হযরত বাকিয়াতুল্লাহ (আ. ফা.)-এর দৃষ্টিতে: মরহুম আয়াতুল্লাহ আল্লাহী যিনি “আল্লামা বাম” নামে প্রসিদ্ধ তার কাছ থেকে একটি খুব আকর্ষণীয় এবং শ্রুতিমধুর সফর সম্পর্কে বর্ণনা পেয়েছি, আমি তাকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করিনি; কিন্তু আমি বাম শহরের একজন যাত্রীকে অনুরোধ করেছিলাম যেন এই সভার পাঠ্য সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করে এবং তিনি তা করেছিলেন এবং সেটি রেকর্ডও করেছিলেন। এখানে সেটির শুধুমাত্র একটি অংশ উল্লেখ করব:

১৩৪৩ হিজরির দিকে, মসজিদে নববীতে একজন ওহাবী আলেম হজরত আবু তালিব সম্পর্কে কথা বলছিলেন এবং তাঁর কাফের হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরছিলেন। তিনি (বাম শহরের ব্যক্তি) তাঁর সঙ্গীদেরকে নির্দেশ দিলেন, দিনের বেলা বিশ্রাম করতে ও রাতে ফজর পর্যন্ত জেগে থাকতে এবং ওই ব্যক্তির কথা খন্ডন করার জন্য হযরত বাকিয়াতুল্লাহ (আ.)-এর সাহায্য প্রার্থনা করতে।

পরের দিন সকালে নামাযের পর, একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি আবু লুবাবা স্তম্ভে হেলান দিয়ে আবু তালিবের ঈমান তথা বিশ্বাস প্রমাণ করার বিষয়ে এক ঘন্টা কথা বললেন। কেউ তার কথার বিরুদ্ধাচারণ করলেন না। তার আওয়াজ সর্বত্র সমানভাবে শোনা যাচ্ছিল; এমনকি মসজিদের বাইরেও; কোন প্রকার স্পিকার ছাড়াই। যিনি আরবি জানতেন তিনি আরবীতে শুনতে পাচ্ছিলেন আর যারা ফার্সী জানতেন তারা ফারসিতে শুনতে পাচ্ছিলেন। এই আশ্চর্যজনক দৃশ্য ও অন্যান্য নিদর্শন দেখে মরহুম আয়াতুল্লাহ আল্লাহী নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, বক্তা বাকীয়াতাল্লাহিল আ’যাম (আ.) ছিলেন। বক্তৃতা শেষে লোকটি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

ঐ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি সর্বদা বলছিলেনঃ “আমার প্রপিতামহ আবু তালিব।” তিনি তার বেশ কিছু কবিতা উদ্ধৃত করেন এবং সবশেষে বলেন: “আমার মাতামহ ফাতিমা বিনতে আসাদ ইসলাম গ্রহণে অগ্রণী ছিলেন, নবী করীম (সা.) আদিষ্ট ছিলেন যে কোনো মুসলিম নারী-ই যেন মুশরিকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না থাকে এবং হযরত আবু তালিবের ইন্তেকালের শেষদিন পর্যন্ত হযরত ফাতেমা বিনতে আসাদ তার বিবাহর বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন।

বিভিন্ন গ্রন্থে আবু তালিব: শিয়া এবং সুন্নি পণ্ডিতগণ হজরত আবু তালিব (আ.)-এর ঈমান বা বিশ্বাসের উপর শতাধিক খণ্ডের স্বতন্ত্র বই লিখেছেন, যেগুলির পরিচিতি তুলে ধরা এই স্বল্প পরিসরে সম্ভবপর নয় বরং আমরা শুধুমাত্র একটি উদাহরণ উল্লেখ করব: ১৩৮১ হিজরিতে, কাতিফ শহরের “আব্দুল্লাহ খানিজি” নামে একজন আলেম “আবু তালিব, কুরাইশী মো’মিন” নামে একটি মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশ করেন। আবু তালিবের ঈমান বা বিশ্বাস প্রমাণ করার জন্য কাতিফ আদালত তাকে কাতিফের একটি অন্ধকূপে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয় এবং সাত বছর পর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। নাজাফে আশরাফের মরহুম আয়াতুল্লাহ হাকিম এবং কোম শহরের একজন মহান মার্জা আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করেছিলেন এবং অবশেষে তিনি মুক্তি পান এবং এখন তিনি কাতিফের বিচারক হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন।

খ্রিস্টান বিশ্বের বিখ্যাত কবি বোলস সালামেহ এই বইটি নিয়ে একটি খুব আকর্ষণীয় উপদেশ লিখেছেন।
বোলস সালামেহ, যিনি ১৯৭৯ সালে মারা যান, তিনি তার বিখ্যাত দিওয়ানে (কাব্যগ্রন্থে) হজরত আবু তালিবের গুণাবলীর উপর একটি আলাদা অধ্যায় রচনা করেছেন, আবু তালিব সম্পর্কে বসরার “সারজিস” যিনি “বুহাইরা” নামে প্রসিদ্ধ তার সাথে এক ঐতিহাসিক বৈঠকে ২৭ লাইনের একটি কবিতা উপস্থাপন করেন।

সর্বোপরি আমরা বলতে পারি যে, যারা হযরত আবু তালিবের (আ.) ঈমান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা যদি না জানার বা না বুঝার কারণে তুলে থাকেন সে কথা ভিন্ন কিন্তু যদি কেউ জেনে বুঝে ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁর ঈমান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাহলে নির্ঘাত তিনি আহলে বাইতের (আ.) ঘোরতর শত্রু। তাই হাদিস ও ইতিহাস জেনে হযরত আবু তালিব (আ.) সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করি ও আহলে বাইতের (আ.) শত্রুতা করা থেকে বিরত থাকি এই আহ্বান জানাই। (তথ্যসূত্র: hawzah.net)###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔