রোজার আধ্যাত্মিক ও স্বাস্থ্যগত উপকারীতা

শহীদ আতহার, এম, ডি (ইন্টারনাল মেডিসিন ও এন্ডোক্রাইনোলজীর সহযোগী অধ্যাপক, ইন্ডিয়ানা স্কুল অব মেডিসিন, যুক্তরাষ্ট্র)

অনুবাদঃ মোঃ ইকবাল

পবিত্র রমজান শুরু হলে সারা বিশ্বের মুসলমানরা ৩০ দিন ব্যাপী ভোর হতে রাত অবধি রোজা পালন করেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর যেন তোমরা পরহেজগারী অর্জন করতে পার।”
আরবী ভাষায় “তাকওয়া” শব্দের অর্থ বিভিন্নভাবে করা হয়েছে। যেমন, খোদাভীরুতা, আল্লাহর প্রতি সচেতনতা, আল্লাহ ভক্তি, আত্মসংযমী ইত্যাদি। তাই আল্লাহ কর্তৃক আমাদেরকে ভোর হতে রাত অবধি একমাস রোজা রাখার নির্দেশ তথা এ সময়ে পানাহার, যৌনক্রিয়া ও অশিষ্ট, অশ্লীল আচরণ ও কথাবার্তা পরিহার করতে বলা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের রোজা পালনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় যে, বর্তমান পৃথিবীতে প্রলোভন, কু-কর্মে প্ররোচনা ইত্যাদি আমাদের পবিত্রতা ও সরলতাকে প্রত্যহ ধ্বংস করে চলেছে। তাই আমরা সর্বক্ষণ খাদ্য ভক্ষণে নিমগ্ন থাকি, সারাদিন অল্প অল্প করে হলেও মুখ চলতেই থাকে ফলে দৈহিক স্থুলতা বৃদ্ধি পায়। আমাদের অনেকেই অত্যধিক চা অথবা কফি অথবা কোমল পানীয় পান করে থাকেন। অনেকেই দৈনিক একাধিকবার যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হন এমন যৌন উন্মত্ত ব্যক্তির সংখ্যাও কম নয়। যখন আমরা তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হই; আমরা আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিয়ে অশ্লীল কথাবার্তা বলতে শুরু করি এমনকি হাতাহাতি ও মারামারি শুরু করে দিই। এখন যদি কেউ রোজা রাখে, সে রোজা অবস্থায় এমন ধরনের কর্মে লিপ্ত হতে পারবে না। মুখে পানি আনে এমন খাদ্য বস্তুর প্রতি দৃষ্টি পড়লেও সে তার স্বাদ গ্রহণ করতে পারে না। হালকা ও ঘনঘন খাওয়াও সে ত্যাগ করবে এমনকি ধুমপানে অভ্যস্ত হলে তাও সে ত্যাগ করবে। অবিরত চা-কফি ও কোমল পানীয় পান করা থেকে বিরত থাকবে। যৌন ক্রিয়া ও ভাবাবেগ হ্রাস করবে এবং যখন তাকে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার জন্য উত্তেজিত করা হবে তখন সে বলবে, “আমি যেহেতু রোজা পালন করছি তাই তোমার উত্তেজক কথাবার্তায় সাড়া দিতে পারি না।” আল্লাহর নৈকট্য ও মারেফাত লাভ করতে চাইলে আমাদের প্রতি যে মূল্যবান উপদেশ দান করা হয়েছে তাহলো অধিক এবং অতিরিক্ত (সুন্নাত) নামাজ আদায় এবং কোরআন তেলাওয়াত করা।

রোজার স্বাস্থ্যগত উপকারীতাঃ
মুসলমানরা স্বাস্থ্যগত উপকারীতার কারণে কিন্তু রোজা রাখেন না। যা প্রকৃতিগত দিক থেকে Secondary একটি বিষয়। স্থুলতা কমানোর জন্য অনেক রোগী উপোস করেন, পরিপাকতন্ত্রের বিশ্রাম ও রক্তে চর্বির পরিমাণ কমানোর উদ্দেশ্যেও অনেকেই খাদ্যগ্রহণ করেন না এবং উপোস থাকেন। এ ধরনের উপোস থাকা বা খাদ্য পরিকল্পনায় বিরূপ প্রভাব দেখা যায়। ইসলামের রোজার বিধান এ ধরনের খাদ্য পরিকল্পনা থেকে আলাদা কেননা রমজানের রোজার ক্ষেত্রে কোন প্রকার পুষ্টিহীনতা অথবা অপ্রতুল খাদ্যশক্তি গ্রহণ করা হয় না। রমজান মাসে মুসলমানদের খাদ্যশক্তি গ্রহণের মান পুষ্টি নির্দেশিকায় উল্লেখিত মান অনুযায়ী অথবা তার থেকে সামান্য কম। অধিকন্তু রমজানের রোজা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মুসলমান গ্রহণ করে, কোন ডাক্তার কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া ব্যবস্থাপত্র না।
রমজান মাস আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ও আত্মপ্রশিক্ষণের মাস এ উদ্দেশ্যে যে, এ প্রশিক্ষণের প্রভাব রমজানের পরও অবশিষ্ট থাকে। রমজান মাসে যে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা হয়েছে তা খাদ্য গ্রহণের রূপে হোক অথবা আল্লাহর প্রতি প্রগাঢ় ভক্তির রূপে যদি তা রমজানের পরও অব্যাহত থাকে তাহলে এর প্রভাব হবে সুদূর প্রসারী। রমজানের রোজার সাথে অন্যান্য দিনের খাদ্যগ্রহণের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে মুলতঃ সময়সূচী। রমজান মাসে আমরা দুপুরের আহার ত্যাগ করি এবং অতি ভোরে নাস্তা বা খাবার খাই আর এভাবে সূর্যাস্ত (রাত) পর্যন্ত কোন প্রকার খাদ্য গ্রহণ করি না। আট থেকে দশ ঘন্টা পানি পান না করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক নয় আসলে এর ফলে দেহাভ্যন্তরে সমস্ত তরল পদার্থ ঘনীভূত হয় যার কারণে সামান্য পানিশূন্যতা দেখা দেয়। শরীরের নিজস্ব পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা আছে। আসলে দেখা গেছে স্বল্প মাত্রার পানি শুন্যতা এবং পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা অন্ততঃ উদ্ভিদের ক্ষেত্রে এর আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করে।
রোজার দেহতাত্ত্বিক প্রভাবসমূহের মধ্যে রক্তে শর্করা ও চর্বির মাত্রা হ্রাস, সিস্টোলিক রক্ত চাপ কমানো ইত্যাদি অন্যতম। রমজান মাসের রোজা হালকা অথবা মধ্যম মাত্রার বহুমূত্র রোগ, স্থুলতা এবং essential hypertension এর চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি আদর্শ পরামর্শ হতে পারে। ১৯৯৪ সালে ক্যাসাব্লাঙ্কায় অনুষ্ঠিত “স্বাস্থ্য এবং রমজান” শীর্ষক আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে “Medical ethics of fasting” সম্পর্কিত ৫০টি গবেষণা পত্র উপস্থাপন করা হয়। বলা হয় যে, চিকিৎসা চলাকালীন অনেক রোগীর স্বাস্থ্যগত উন্নতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে দেখা গেছে যে, রোজা কোনভাবেই রোগীর স্বাস্থ্যগত উন্নতি অথবা রোগীর মৌলিক স্বাস্থ্যগত অবস্থাকে ব্যাহত করেনি। অপরদিকে যে সকল রোগী কঠিন রোগে আক্রান্ত যেমন, type1 diabetes অথবা coronary artery disease, কিডনিতে পাথর ইত্যাদি তাদেরকে রোজা রাখার অনুমতি দেয়া উচিৎ না।
রোজার মনোস্তাত্বিক প্রভাবও রয়েছে। রমজান মাসে যারা রোজা পালন করেন তারা অনাবিল প্রশান্তি লাভ করে থাকেন। ব্যক্তিগত শত্রুতা বলতে গেলে ন্যুনতম পর্যায়ে চলে আসে, অপরাধের মাত্রা কমে আসে। হুজুর পাক (সাঃ) এর উপদেশ হলো, “যদি কেউ তোমার কুৎসা রটায় অথবা তোমার বিরুদ্ধে কলহ বা যুদ্ধ আরম্ভ করে, তখন বলো আমি রোজা আছি।”
রমজানের রাত্রে অতিরিক্ত ইবাদত বন্দেগীও উপকারী প্রভাব ফেলে। এই ইবাদত বন্দেগী খাদ্যের উত্তম ব্যবহারে কেবল সহযোগিতা করে না ক্যালোরি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সাহায্য করে। এক রাকাত নামাজে ১০ গুন অতিরিক্ত ক্যালোরি উৎপন্ন হয়। যদিও আমরা ব্যায়ামের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করি না, তথাপি অতিরিক্ত ক্যালোরি ব্যবহারসহ অস্থি সন্ধির হালকা সঞ্চালন উন্নত ধরনের ব্যায়ামের অন্তর্ভূক্ত। একইভাবে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত শুধুমাত্র মন ও হৃদয়ের প্রশান্তি আনে না বরং স্মরণ শক্তি বৃদ্ধি করে।
পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশ দিনের যে কোন বেজোড় এক রাতকে বলা হয় শবে ক্বদর। ফেরেশতারা এ রাতে অবতরণ করেন এবং ইবাদত বন্দেগী গ্রহণ করানোর জন্য আল্লাহর কাছে নিয়ে যান। রোজা একটি বিশেষ ধরনের ইবাদত যা কেবল মানুষ ও স্রষ্টার মাঝে বিদ্যমান। আল্লাহ হাদীসে কুদসিতে ইরশাদ করেন, “রোজা আমার জন্য আর একমাত্র আমি এর প্রতিদান দিব।” অপর একটি হাদিসে হুজুর পাক (সাঃ) এরশাদ করেন, “যদি কেউ কথা ও কর্মে মিথ্যাচার পরিত্যাগ না করে তাহলে তা কোন প্রয়োজন নেই যে, সে খাদ্য ও পানীয় পরিত্যাগ করুক।”
সকল মুসলমান ভাই বোনদেরকে পবিত্র রমজানের শুভেচ্ছা।###

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More