কিছু গুনাহ আছে যেগুলো চোখে পড়ে, যেমন মিথ্যা, গীবত, সুদ, অন্যায় উপার্জন ইত্যাদি। আর কিছু গুনাহ আছে যেগুলো চুপচাপ মানুষকে ধ্বংস করে, কেউ হাতেনাতে ধরে না, কিন্তু আল্লাহর কাছে তার হিসাব অত্যন্ত ভারী। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে মানুষের অন্তরে কষ্ট দেওয়া।
এই গুনাহ কেন “নীরব”? কারণ, এতে রক্ত ঝরে না, আওয়াজ হয় না, সমাজে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয় না, কিন্তু একজন মানুষের হৃদয়ে যে দাগ পড়ে, তা অনেক সময় তার সারাজীবনেও শুকায় না।
কুরআনের সতর্কবার্তা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন: “আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয় তাদের তেমন কোনো অপরাধ ছাড়াই — তারা অবশ্যই অপবাদ ও সুস্পষ্ট গুনাহ বহন করে।” (সূরা: আহযাব, ৫৮তম আয়াত।)
এই আয়াতে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই যে, আল্লাহ এখানে শারীরিক ক্ষতির কথা বলেননি, বরং বলেছেন “কষ্ট দেওয়ার” কথা যা মানসিক এবং এটি কথাবার্তা বা আচরণের মাধ্যমেও হতে পারে।
আহলে বাইত (আ.) মানুষের হৃদয়কে কীভাবে দেখতেন?
হযরত ইমাম আলী (আ.) বলেন: “মানুষের অন্তর ভঙ্গুর কাঁচের মতো; একবার ভেঙে গেলে জোড়া লাগানো কঠিন।” (নাহজুল বালাগা -ভাবার্থ।)
এই হাদিস আমাদের শেখায়: মানুষের অন্তর কোনো শক্ত পাথর নয়, বরং অতি সংবেদনশীল একটি আমানত। আমরা কি সেই আমানতের প্রতি দায়িত্বশীল?
“আমি তো সত্য কথাই বলেছি”, —এই অজুহাত অনেক সময় আমরা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে বলি— “আমি তো মিথ্যা বলিনি”; “আমি তো হক কথাই বলেছি।” – ইত্যাদি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হক কথা বলার সময় কি আখলাক বজায় ছিল?
হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন: “আমাদের শিয়া সে নয় যে শুধু আমাদের কথা বলে, বরং যে আমাদের আখলাক অনুসরণ করে।” (আল-কাফি।)
আহলে বাইত (আ.) কখনও সত্য বলার নামে মানুষের সম্মান ভাঙেননি। তাঁরা সত্য বলেছেন দয়ার সাথে, ধৈর্যের সাথে, ভদ্রতার সাথে। ঘরের মানুষদের কষ্ট দেওয়া সবচেয়ে অবহেলিত অপরাধ। আমরা বাইরে অনেক সংযত, কিন্তু ঘরে গিয়ে মা-বাবার সাথে কড়াভাষী। স্ত্রী বা স্বামীর সাথে অবজ্ঞাকারী। সন্তানের সাথে ধৈর্যহীনতা।
হযরত ইমাম আলী (আ.) বলেন: “তোমাদের মধ্যে উত্তম সে-ই যে তার পরিবারের জন্য উত্তম।” (নাহজুল বালাগা – ভাবার্থ।)
আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে নয় যে বেশি কথা বলে,। বরং সে, যার আচরণ সবচেয়ে নিরাপদ। মানুষের অন্তরের কষ্ট হচ্ছে হক্কুন নাসের অংশ। মানুষের অন্তরে কষ্ট দেওয়া শুধু নৈতিক অপরাধই নয়, বরং এটি হক্কুন নাস নষ্ট করা। আর হক্কুন নাস শুধু তওবা করলেই মাফ হয় না। যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার ক্ষমা দরকার। হযরত ইমাম সাজ্জাদ (আ.) দোয়া শেখাতে গিয়ে বলেন: “হে আল্লাহ! আমি যাদের ওপর জুলুম করেছি তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার তৌফিক দাও।” (সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া – ভাবার্থ।)
এটা প্রমাণ করে, আহলে বাইত (আ.) মানুষের অধিকারকে কতটা গুরুত্ব দিতেন।
