আল জাযীরা সংবাদ মাধ্যমঃ ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধে একমাত্র পাইলট হিসেবে সাইফুল আযম চারটি যুদ্ধ বিমান ধ্বংস করেন।
ফিলিস্তিনী বিক্ষোভকারীরা বাংলাদেশী ফাইটার বৈমানিক সাইফুল আযম (৭৯) এর ইন্তেকালে শোক পালন করেন যিনি গত রবিবার ঢাকায় বার্ধক্যজনিত কারণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সাইফুল আযম তৎকালীন মধ্য উত্তর পাবনা-৩ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন যাঁকে কিংবদন্তীতুল্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে মনে করা হয় পাইলট হিসেবে তাঁর অভাবনীয় রেকর্ডের জন্য।
বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র বৈমানিক যিনি জর্ডান, ইরাক ও পাকিস্তানে ফাইটার পাইলট হিসেবে যুদ্ধ করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে ছয়দিনের যুদ্ধে একমাত্র বৈমানিক হিসেবে চারটি ইসরায়েলের বিমান ভূপাতিত করেছিলেন। ফিলিস্তিনী ইতিহাসবিদ ওসামা আল আসগর তাঁর ফেসবুক পেইজে আযমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তাঁকে একজন অসাধারণ বৈমানিক হিসেবে অভিহিত করেন।
“আল-আকসা মসজিদ রক্ষার প্রতিরোধ যুদ্ধে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ভাইয়েরা আমাদের সহযোগী ও অংশীদার ছিলেন”-তিনি বলেন।
ফিলিস্তিনী অধ্যাপক নাজি শাকুরী তাঁর টুইট বার্তায় আযামের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন, “সাইফুল আযম ফিলিস্তিনকে ভালবাসতেন এবং জেরুজালেমের জন্য যুদ্ধ করেন। তিনি বলেন, আমি তাকে স্যালুট করি এবং আল্লাহর কাছে তার মাগফিরাত কামনা করি।”
বিখ্যাত ফিলিস্তিনী সাংবাদিক তামের আল মিশাল আযমের ভূয়সী প্রশংসা করে তাকে “ঈগল অব দি এয়ার” নামে আখ্যায়িত করেন।
১৯৬৭ সালের ৫ই জুন মিশরের বিমান বাহিনী ধ্বংস করার পরপরই ইসরাইল জর্ডানের ক্ষুদ্র বিমান শক্তিকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে মাফরাক বিমান ঘাঁটির উদ্দেশ্যে ইসরাইলের ৪টি জেট বিমান নেমে আসে। জর্ডানের বিমান বাহিনী কমান্ডারগণ সাইফুল আযমকে এ আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য নিয়োজিত করেন এবং তিনি দু’টি বিমান ভূপাতিত করেন। এর দু’দিন পর বিমান ঘাঁটি রক্ষার জন্য তাকে ইরাকে প্রেরণ করা হয়। সেখানে তিনি ইসরাইলের আরও দু’টি যুদ্ধ বিমান ভূপাতিত করেন।
আযমের এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জর্ডান ও ইরাক সরকার তাকে সামরিক পুরস্কারে ভূষিত করেন। অসাধারন কৃতিত্বের জন্য ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আযমকে “লিভিং ঈগল” বা জীবন্ত ঈগল খেতাবে ভূষিত করে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এ প্রবীণ ও অভিজ্ঞ বৈমানিক বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগদান করেন দেশ মাতৃকার সেবায়। ১৯৮০ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন এবং সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি রাজনীতিতে নিজেকে নিয়োজিত করেন। বর্ডার গার্ড রেজিমেন্টের সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল ফজলুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অংশ হিসেবে তার নাম লিখিত থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “সাইফুল আযম যুদ্ধক্ষেত্রে প্রত্যেক সৈন্যের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন, স্বল্প অস্ত্র নিয়ে কি করে বড় ও শক্তিশালী শত্রুকে পরাজিত করতে হয়। যুদ্ধে সাহস ও সীমিত ক্ষমতা ব্যবহারের এক মাইল ফলক তিনি সৃষ্টি করে গেছেন”- জেনারেল রহমান বলেন।
সাইফুল আযম ১৯৪১ সালে পাবনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার সাথে শৈশবকাল কোলকাতায় কাটান। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) প্রত্যাবর্তন করেন। দক্ষিণ এশিয়া ভিত্তিক বিশ্লেষণধর্মী ওয়েব সাইট রোর মিডিয়া অনুযায়ী আযম মাত্র ১৪ বছর বয়সে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমান পাকিস্তান) যান। ১৯৫৮ সালে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনী ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি পাইলট অফিসার হিসেবে শিক্ষা কোর্স সমাপ্ত করেন। ওয়ার্ল্ড পপুলার ডিফেন্স ব্লগ ফাইটার জেটস উল্লেখ করে যে, পাকিস্তানে বিমান চালনা বিজ্ঞান ও কৌশল রপ্ত করার পর কর্তৃপক্ষ আযমকে উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এ্যারিজোনায় লুক বিমান ঘাঁটিতে প্রেরণ করেন।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি একটি ভারতীয় যুদ্ধ বিমান ভূপাতিত করেছিলেন যা পাকিস্তান বাহিনীকে সীমিত সমরাস্ত্র নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
তার এই অবদান পাকিস্তানের সর্বমহলে প্রশংসিত হয় যার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান সরকার তাঁকে তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পুরস্কার সিতারা-এ-জুরাত (সাহসের নক্ষত্র) মেডেল প্রদান করে।###
