লেখকঃ মাওলানা সৈয়দ রেজা আব্বাস নাক্বাভী, ভাষান্তর : মো: ইকবাল
ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কোন কোন ব্যক্তি একটি শাব্দিক বাহাস ও বিতর্কের সূত্রপাত ঘটিয়ে বলার চেষ্টা করছেন যে, মাসুম (আ.)গণের জন্ম হয় না বরং তাঁদের নুজুল ও জহুর হয়। সোজা ভাষায় বলা যায় তাঁরা জন্মগ্রহণ করেন না, তাঁদের প্রকাশ অথবা আবির্ভাব হয়। তারা বলেন, ‘মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম তো আমাদের মত লোকজনের হয়ে থাকে’। আসুন আমরা একবার পর্যালোচনা করে দেখি যে, এ সকল ব্যক্তিদের অবস্থান সঠিক না ভূল?
সর্বপ্রথম আমরা জানার চেষ্টা করব যে, জহুর বা নুজুল এর সাথে এসকল ব্যক্তিবর্গের সম্পর্ক কি এবং এ ধরণের বিশ্বাসের পিছনে তাদের উদ্দেশ্যই বা কি? এরা বলে থাকেন যে, মাসুম (আ.) গণের জন্ম হতে পারেনা আর না-ই তাঁরা মাতৃগর্ভ এবং পিতৃঔরসে অবস্থান করেন, তাই তাঁরা জন্মগ্রহণ করতে পারেন না।
তাদের আক্বীদা বিশ্বাস হচ্ছে যে, মাসুম (আ.)গণ আকাশ থেকে সরাসরি অবতীর্ণ হন, মাতৃগর্ভে অবস্থান করেন না। তাদের আক্বীদা বিশ্বাসের স্বপক্ষে কোন অকাট্য দলিল নেই বরং কোরআনের একটি আয়াতে যেখানে নুর-এর নাযিল হওয়ার কথা আলোচনা করা হয়েছে সেখানে ঐ নূর বলতে তারা ইমাম (আ.)গণের কথা মনে করে থাকেন। যদিও কোরআনের নির্দেশ মোতাবেক এখানে ‘নূর’ বলতে পবিত্র কোরআনকে বোঝানো হয়েছে যেটি মানুষের হেদায়েতের জন্য নাযিল করা হয়েছে। আমরা যদি মেনেও নিই যে, নুর বলতে এখানে ইমাম (আ.)গণকে বুঝানো হয়েছে তাহলেও সেটা হবে পবিত্র কোরআনের জীবন্ত ব্যাখ্যাকারী হিসেবে, কেননা ইমাম (আ.)গণ হচ্ছেন কোরআনের প্রকৃত ও জীবন্ত ব্যাখ্যাকারী।
হাদীসসমূহের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার পূর্বে আমরা এ ধরনের বিশ্বাস বা আক্বীদার ক্ষতিকর দিকগুলোর প্রতি একটু ইঙ্গিত করতে চাই।
১) জন্মকে অস্বীকার করলে মৃত্যু বা শাহাদাৎকেও অস্বীকার করতে হবে। কেননা জন্মগ্রহণই যখন করেননি তখন শহীদ কিভাবে হবেন, সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে কোন হত্যাকারীও থাকবেনা।
২) কোরআনের আয়াত ও তাফসিরের আলোকে সূরা আহকাফের ১৫নং আয়াতে উদ্দেশ্য হচ্ছেন হযরত ইয়াহইয়া (আ.) এবং হযরত ইমাম হোসাইন (আ.)। এ আয়াতে তাদেরকেই বোঝানো হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে অর্থাৎ “গর্ভধারণ থেকে সন্তান ভূমিষ্ট হওয়া এবং সন্তান ভূমিষ্টের পর থেকে স্তন্য ছাড়াতে লেগেছে ত্রিশ মাস”। যদি কারো এমন বিশ্বাস থাকে যে ইমাম (আ.) মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হননা বরং নাযিল বা অবতীর্ণ হন তাহলে পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে যে বাক্য উদ্ধৃত হয়েছে তা অস্বীকার করতে হবে।
৩) একটি ক্ষতিকর দিক হল যে, জহুর ও নুজুলে বিশ্বাসী ব্যক্তিদেরকে যিয়ারতে ওয়ারিসা অগ্রাহ্য করতে হবে কেননা যিয়ারতে ওয়ারেসায় মাসুম (আ.) ইরশাদ করেন; অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি উচ্চ ও বুলন্দ ঔরসে এবং পবিত্র গর্ভে আল্লাহর নুর হয়ে অবস্থান করেন”, অথবা অনুরূপভাবে অর্থাৎ, “এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনার সন্তানদের ইমাম সকলেই তাকওয়া সম্পন্ন ও পরেহজগার। স্মরণ থাকে যে, ঔরস এবং গর্ভ সন্তানের জন্মের সাথে সম্পর্কিত। জহুর অথবা নুজুলের বিষয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের শব্দ বা বাক্য ব্যবহৃত হয় না। সুতরাং এ ধরনের আক্বীদা পোষণ করতে হলে যিয়ারতে ওয়ারিসা অস্বীকার করা একান্ত জরুরী হবে।
৪) ইমাম (আ.)গণ কর্তৃক বর্ণিত দোয়া-এ-নোদবাহ, রজব মাসের দোয়া এবং যিয়ারতে আলে ইয়াসীন-এ “মওলুদায়ন” অথবা “মওলুদ” ইত্যাদি আরবী শব্দসমূহ ব্যবহার হয়েছে যা প্রমাণ করে যে, ইমাম (আ.)গণ জন্মগ্রহণ করেছেন। সুতরাং ‘জহুর’ বা ‘নজুল’-এ বিশ্বাসীগণকে উপরোক্ত দোয়াসমূহ অগ্রাহ্য বা অস্বীকার করতে হবে।
৫) মাসুম (আ.) থেকে বর্ণিত রজব মাসের দোয়াকেও অস্বীকার করতে হবে কেননা, এ দোয়াতেও মাসুম (আ.) এর জন্য ‘জন্ম’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
বর্ণিত হয়েছে যে, রজব মাসের দিনগুলোতে দোয়া পাঠের জন্য নি¤েœর এ দোয়াটি বিশেষভাবে উল্লেখিত হয়েছে- “আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্আলুকা বিল মওলুদায়নে ফি রাজাবীন মোহাম্মদ ইবনে আলী ইসসানী ওয়াবনিহে আলী ইবনে মোহাম্মাদিল মুনতাজাবি ওয়া আতাকাররাবু বেহিমা ইলাইকা খায়রাল কুরাবে” অর্থাৎ, হে মাবুদ! রজব মাসে জন্মগ্রহণকারী দুজনের ওয়াস্তা দিয়ে তোমার কাছে প্রশ্ন করছি মোহাম্মদ বিন তাক্বী (আ.) ও তাঁর সন্তান আলী বিন মোহাম্মদ ইমাম আলী নাক্বী (আ.) অতি উচ্চ এবং শ্রেষ্ঠ ঔরসের অধিকারী। এ দু’জনের উছিলায় আমি তোমার সর্বোত্তম নৈকট্যলাভের আশা করি।
৬) শা’বান মাসের তিন তারিখের দোয়ায় ইমাম হোসাইন (আ.)এর জন্য “বেহাক্কেল মাওলুদ ফি হাযাল ইয়াওম” অর্থাৎ, ‘এই দিনে জন্মগ্রহণকারী’ এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোকে তাহলে অস্বীকার করতে হবে।
৭) ১৫ শা’বান ইমামে যামান ইমাম মাহদী (আ.) এর জন্য দোয়ায় “বেহাক্কে মওলুদহা” অর্থাৎ, ‘এ দিনে জন্মগ্রহণকারীর উছিলায়’ বাক্যটি ব্যবহার করা হয়েছে একেও অস্বীকার করতে হবে।
৮) ওই সকল যেয়ারত ও দোয়াসমূহ যেগুলো ধর্মীয় মৌল বিশ্বাস (আকায়েদ) ও বুদ্ধি, জ্ঞানে পরিপূর্ণ এবং যেখানে ঘৃণা অভিসম্পাত ইত্যাদি সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে এসকল বিষয়সমূহ অস্বীকার করতে হবে একারণে যে, যখন কেউ শহীদ-ই হয়নি তাহলে সেখানে ঘৃণা, অভিসম্পাত কেন???
৯) ইমাম (আ.)গণ যখন জন্মগ্রহণই করেন না সেখানে সৈয়দ বংশের অস্তিত্ব কিভাবে এলো? তাহলে কি ধরে নেব যে, সৈয়দ বংশের সকল সদস্যদের জহুর হয়েছে? অথবা তা যদি মনগড়া কৃত্রিম, রচিত কোন বিষয় হয়ে থাকে তাহলে এ আক্বীদায় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের সৈয়দ বংশধারাকে অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করতে হবে।
১০) হযরত আলী (আ.), ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) এবং যুগের ইমাম ইমাম মাহদী (আ.ফা.) সম্পর্কে যে বর্ণনা এসেছে, সেখানে দেখা যায় যে, তাঁরা স্বীয় মাতার গর্ভে থেকে মাতার সাথে রীতিমত বাক্যালাপ করতেন,….. এসকল বর্ণনাসমূহ অস্বীকার করতে হবে।
১১) যারা মাসুম (আ.)গণের জহুর বা আবির্ভাবে বিশ্বাসী তাঁদেরকে ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী অস্বীকার করতে হবে। পৃথিবীর সকল মুসলমান চাই শিয়া হোন অথবা সুন্নী সকল ফের্কা নবী করিম (সা.) এর জন্মদিবসকে ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী নামে স্মরণ করে থাকেন। তারা কেউ মহানবী (সা.) এর জন্মকে জহুর বা নজুল বলে আখ্যায়িত করেননি। স্মর্তব্য যে, একমাত্র ওহাবীরা ঈদ-ই-মিলাদুন্নবীর (সা.) বিরোধিতা করে থাকে।
১২) ইমাম আলী (আ.) এমন এক মর্যাদার অধিকারী যা দ্বিতীয় কারোর নেই অর্থাৎ তাঁর অনেকগুলো উপাধির মধ্যে অন্যতম একটি উপাধি হলো মওলুদে কা’বা অর্থাৎ কা’বায় জন্মগ্রহণকারী। সেক্ষেত্রে ইমাম আলী (আ.)এর এ উপাধিও অস্বীকার করতে হবে। অথচ ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত যে, হযরত ফাতেমা বিনতে আসাদ কা’বার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বললেন- অর্থাৎ, ‘আর তোমাকে এই নবজাতকের ওয়াস্তা যে আমার গর্ভে অবস্থান করছে, আমার সাথে কথা বলছে। আমি নিশ্চিত যে আমার গর্ভের সন্তান তোমার দলিল ও চিহ্নসমূহের মধ্যে একটি চিহ্ন ও দলিল। সে জন্মকে আমার জন্য সহজ করে দিয়েছে’। (সূত্র : আল আমালী শেখ তুসী: ৭০৬)
এছাড়াও আরবের সকল কবি ইমাম (আ.) এর আগমনকে জন্মগ্রহণ বলেই স্মরণ করেছেন।
আহলে সুন্নাতের বড় বড় আলেম যেমন, ইবনে সাবাগ মালিকি, গাঞ্জী শাফেয়ী শাবালাঞ্জী এবং মোহাম্মদ বিন আবু তালহা শাফেয়ী বলেন- “হযরত আলী (আ.) এর পূর্বে কেউ কা’বাঘরে জন্মগ্রহণ করেনি। সুতরাং এরা সর্বত্রই ইমাম আলী (আ.) এর ক্ষেত্রে ‘জন্ম’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন”।
১৪) যদি ‘জন্মকে’ ‘আবির্ভাব’ দ্বারা পাল্টে দেয়া যায় তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে এটাই যে, মানুষের চিন্তা চেতনায় ইমাম মাহদী (আ.ফা.) এর আগমন ও আবির্ভাবের যে বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্বসমূহ বিদ্যমান তা শেষ হয়ে যাবে।
এযাবৎ যত আলেম ওলামা গত হয়েছেন তাঁরা প্রায় সকলেই ইমাম মাহদীর (আ.ফা.) জন্মগ্রহণ সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে বাহাস করেছেন যে, ইমাম মাহদী (আ.ফা.) জন্মগ্রহণ করেছেন নাকি করেননি অথবা পরবর্তীতে জন্মগ্রহণ করবেন। অপরদিকে অধিকাংশ আহলে সুন্নাতরা স্বীকার করেন যে, ইমাম মাহদী (আ.ফা) জন্মগ্রহণ করেছেন। যেমন ইবনে ফুলকান (মৃত্যু ৬৮১ হি:) লিখেছেন যে, “আবুল কাশেম মোহাম্মদ ইবনে হাসান আসকারী ইবনে আলী হাদী ইবনে মোহাম্মদ জাওয়াদ শিয়াদের ১২ জন ইমামের মধ্যে ১২তম ইমাম বলে গণ্য যাঁর প্রসিদ্ধ উপাধি হলো ‘হুজ্জাত’। তাঁর জন্ম ২৫৫ হিজরী সনের ১৫ শা’বান, শুক্রবার।
কিন্তু জহুর বা আবির্ভাব সংক্রান্ত অসংখ্য হাদিস এমর্মে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর আবির্ভাব শেষ জমানায় ঘটবে। সুতরাং, যদি কিছুসংখ্যক মানুষ এটা মানেন যে মাসুম (আ.) এর নজুল অথবা জহুর হয়, তাদেরকে স্বীকার করতে হবে যে, ইমামে জামানা (আ.ফা.) এখনো জন্মগ্রহণ করেননি কেননা হাদীসসমূহে তিনি শেষ জামানায় জন্মগ্রহণ করবেন বলে ভবিষদ্বাণী করা হয়েছে। এখন যদি একথাগুলো কেউ না মানে তাহলে ওই সকল হাদীসগুলো সে অস্বীকার করুক অথবা মেনে নিক যে, মাসুম অথবা ইমাম (আ.)গণ জন্মগ্রহণ করেন, তাঁদের জহুর বা নজুল হয় না।
১৫) বিশ্বস্তগ্রন্থসমূহকে অস্বীকার… কেননা শিয়া মাযহাবের সকল গ্রন্থসমূহে মাসুমীন (আ.) এর ক্ষেত্রে বেলাদাত বা জন্মগ্রহণ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কোন কোন আলেম তো স্বীয় গ্রন্থসমূহে রীতিমত ইমাম (আ.)গণের জন্মের অধ্যায় পর্যন্ত নির্দিষ্ট করেছেন। সুতরাং মাসুম (আ.)এর জহুরে বিশ্বাসী ব্যক্তিবর্গকে ঐসকল শিয়া গ্রন্থসমূহকে স্বাভাবিকভাবে অস্বীকার করতে হবে।
আসুন এবার কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করে আমার এই লেখাটি সমাপ্ত করতে চাই।
শেখ কুলাইনী “উসুলে কাফির” দ্বিতীয় খন্ডে রীতিমত একটি অধ্যায় সৃষ্টি করেছেন যার শিরোনাম হচ্ছে বাবে মওয়ালেদিল আ-ইম্মা” অর্থাৎ ইমাম (আ.)গণের জন্মের বর্ণনা। চিরকাল ধরে যে শব্দটি শিয়াদের মাঝে প্রচলিত ও ব্যবহৃত হয়ে আসছে তা হচ্ছে, বেলাদাত বা জন্ম। পরবর্তী প্রজন্ম বলা যায় যে, এত বেশী জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান হয়ে গেলেন যে মারেফাতের এমন কিছু বিষয়সমূহ এত সহজে বুঝে ফেললেন যেগুলো তাঁদের পূর্বে কেউ বোঝেননি।
এ অধ্যায়ে অন্তর্ভূক্ত প্রথম হাদিস যেটি অনেক দীর্ঘ যেখানে আবু বসীর বর্ণনা করেন যে- “তিনি একবছর ইমাম সাদেক (আ.) এর সাথে হজ্ব করেন। যাওয়ার পথে আবওয়া নামক স্থানে ইমাম মূসা কাযিম (আ.) জন্মগ্রহণ করেন”। এ বর্ণনায় আবু বাসীরও বার বার বেলাদাত বা জন্মগ্রহণ শব্দটি ব্যবহার করেছেন এবং ইমাম (আ.)ও করেছেন। ইমাম সাদিক (আ.) হজ্ব থেকে ফিরে এলে তাঁর সাহাবীরা তাঁকে মোবারকবাদ জানান। ইমাম (আ.) তখন বললেন, “এ শিশুটি যাখন জন্মগ্রহণ করলো সে নিজের হস্তদ্বয় মাটির উপর রাখলো এবং আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালো”; অতঃপর ইমাম (আ.) এরশাদ করলেন- “এটি রাসুল (সা.) এবং তাঁর সকল স্থলাভিষিক্তদের আলামত বা চিহ্ন”। এরপর ইমাম (আ.) আবার বলা শুরু করলেন যে, কিভাবে ইমাম (আ.) গণের শুক্র স্থায়ীত্ব লাভ করে।
আমি সম্পুর্ণ হাদিস এখানে উল্লেখ করবো না, কেননা হাদীসটি অনেক দীর্ঘ।
ইমাম (আ.) পুনঃশ্চ এরশাদ করেন: “এবং যখন ইমামের ভ্রুণ মায়ের গর্ভে ৪ মাস অতিক্রান্ত হলে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন একজন ফেরেশতাকে নির্ধারণ করে দেন যার নাম হায়াওন। যিনি ইমাম (আ.)এর দক্ষিণ বাহুতে লেখেন- “ওয়া তাম্মাত কালিমাতু রাব্বিকা সিদকান ওয়াআদলান লা মুবাদ্দিলা লি কালিমাতিহী ওয়া হুয়াস সামিউল আলীম” এবং ইমাম মায়ের গর্ভ থেকে বাইরে আসেন তখন স্বীয় হাত মাটির উপর রাখেন এবং মাথা আকাশের পানে। (উসুলে কাফি, খ: ২, পৃষ্ঠা ২২৫, হাদীস নং-১)
হাসান বিন রাশেদ বলেন যে, আমি ইমাম সাদিক (আ.)কে বলতে শুনেছি- “আল্লাহ যখন ইমামকে সৃষ্টি করতে চান তখন একজন ফেরেস্তাকে নির্দেশ দেন আরশের নীচে থেকে এক গ্লাস শরবত নিয়ে ইমাম (আ.) এর পিতাকে পান করাতে”। সুতরাং ইমাম (আ.) এর (দৈহিক) সৃষ্টি এই শরবত থেকে। অতঃপর ইমাম (আ.) ভুমিষ্ট হলে আল্লাহ ওই ফেরেশতাকেই নির্ধারণ করেন এবং ইমাম (আ.)এর চক্ষুদ্বয়ের মধ্যাংশে এই বাক্যটি লিখতে নিদের্শ দেন “ওয়া তাম্মাত কালেমাতাহু রাব্বিকা সিদকান ওয়া আদলান ওয়া মুবাদিলা লে-কালিমাতেহী ওয়া হুয়াস সামিউল আলীম”।
অতঃপর ইমাম (আ.)কে নুরের একটি মিনার দান করা হয় যার মাধ্যমে তিনি বান্দাদের আমলসমূহ দেখেন এবং যার মাধ্যমে আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের উপর হুজ্জাত সমাপ্ত করেন। (উসূলে কাফি, খ: ২, পৃ: ২২৮, হাদিস নং-২)।
কিন্তু সম্মানিত পাঠক ভাইয়েরা আপনারা নিজেরাই প্রত্যক্ষ করুন যে, এ সকল হাদিসগুলোতে বিভিন্ন স্থানে ‘বেলাদাত’ বা ‘জন্ম’ শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে, নজুল বা জহুর শব্দ কোথাও পরিদৃষ্ট হয়নি বরং একেবারে অনুপস্থিত। এতে স্পষ্ট হয় যে, ইমাম (আ.) গণের বাহ্যিক দৈহিক সৃষ্টি মায়ের গর্ভেই হয়ে থাকে এবং একইভাবে ইমাম (আ.)এর জন্ম পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী জন্ম সৃষ্টির ক্রমধারা অনুযায়ী হয়ে থাকে। অবশ্য তাঁদের আত্মা বা রূহ পূর্বসৃষ্ট এবং বাহ্যিক বর্ণনা দ্বারা এটাই জানা যায় যে, মায়ের গর্ভে চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁদের রূহ দেহে স্থানান্তরিত করা হয়।
এসকল হাদিস ও বর্ণনার মাধ্যমে মাসুম (আ.)গণের জহুর বা নজুল সংক্রান্ত আক্বীদা ও বিশ্বাসের সমাপ্তি ঘটবে আশা করি।###
