সমাজ ও জাতিসমূহের উন্নতি বিধানের ক্ষেত্রে আচার-আচরণ একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। আচার-আচরণ মানবতার অংশ হিসেবে জন্মলাভ করেছে। মানুষের অন্তরের সুখ-শান্তি ও আনন্দ বিধানের ক্ষেত্রে আচার-আচরণের যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে তা কেউ অস্বীকার করে না। এমনকি সামাজিক ও সরকারী পর্যায়ে চারিত্রিক সততার বুনিয়াদ ও চিন্তাকে সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এর উপযোগিতা ও সিদ্ধান্তকারী প্রভাবের ব্যাপারেও কারো কোন সন্দেহ নেই। আপনি কি এমন কাউকে দেখেন যিনি মিথ্যা ও বিশ্বাসঘাতকতার ছায়াতলে থেকেও সুখের অন্বেষণে সততা ও সত্যবাদিতার পথ অনুসরণ করে কষ্ট পাচ্ছেন? উন্নত আচার-আচরণ এতই প্রয়োজনীয় যে, এমনকি ধর্মে বিশ্বাস করে না, এমন সব জাতিও একে সম্মান করে এবং এটা বিশ্বাস করে যে জীবনের এই কঠিন পথে অগ্রগতি সাধন করতে হলে তাদেরকে অবশ্যই কিছু নৈতিকতার বিধি বিধান মেনে চলা দরকার। সর্বত্রই এমন অনেক সমাজ পাওয়া যায় যাদের মধ্যে সর্বাবস্থায় আচরণের কিছু কিছু মিল রয়েছে।
প্রখ্যাত ব্রিটিশ পন্ডিত স্যামুয়েল স্মাইলস বলেন:
“পৃথিবীকে গতিময়তার দিকে পরিচালিত করার মত যত শক্তি রয়েছে তন্মধ্যে উন্নত আচার-আচরণ একটি। সর্বোৎকৃষ্ট অর্থে আদব-কায়দা হচ্ছে মানুষের স্বভাবেরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ, কেননা পারস্পরিক আচার-আচরণ হচ্ছে মানবতার দৃষ্টিতে মানুষের স্বভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। যেসব লোক জীবনের যে কোন ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান অধিকার করেছেন, মর্যাদা ও সম্মানের প্রতিটি ব্যাপারে তাঁরা তাদের প্রতি জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। জনগণ এসব লোকের প্রতি আস্থাশীল এবং তাদের পুর্ণাঙ্গ রূপের অনুকরণ করে থাকে। কেননা, মানুষ বিশ্বাস করে যে, এসব লোক দুনিয়াবী সর্ববিধ গুণের অধিকারী এবং এ ধরনের লোকেরাই তাদের জীবনটাকে বাসোপযোগী করেছে। যদি বংশানুক্রমিক জন্মগত বৈশিষ্ট্য মানুষের মনোযোগ ও প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হয়, তাহলে উত্তম আচার-আচরণও সকল ভদ্র আচরণকারী মানুষের সম্মান ও শ্রদ্ধা অর্জন করবে। এটা এজন্য যে, প্রথমোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ হচ্ছে জন্মগত আর শেষোক্ত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উপার্জিত কর্মফল ও চিন্তা শক্তি প্রসূত। এটা হচ্ছে আমাদের বিচার শক্তি যা আমাদের উপর রাজত্ব করে এবং সমগ্র জীবনব্যাপী আমাদের কাজকর্ম পরিচালনা করে থাকে।”
“যারা জীবনে শ্রেষ্ঠত্ব ও উন্নতির শীর্ষে আরোহন করেছেন, তাঁরা উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে মানবতার পথ সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তারা মানুষকে নৈতিকতা ও ধর্মের পথে সঠিক পথনির্দেশনা প্রদান করেছেন। কোন জাতি যত রাজনৈতিক অধিকার ও সুযোগ সুবিধাই ভোগ করুক না কেন তাদের আচার-আচরণের উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তারা উন্নতি ও অগ্রগতির পথে অগ্রসর হতে পারবে না, কোন জাতিকে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার জন্য বিরাট এলাকার অধিকারী হওয়া অত্যাবশ্যক নয়, কেননা বিপুল জনসংখ্যা ও বিরাট ভূ-খন্ডের অধিকারী হওয়া সত্তে ও অনেক জাতির মধ্যে উন্নতি ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের উপযোগী সমস্ত অত্যাবশ্যকীয় গুণবৈশিষ্ট্যের অভাব থেকে যায়। এভাবে একটি জাতির নৈতিকতা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে তবে সে জাতি শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যাবে।”
এই পন্ডিত যা কিছু বলেছেন তাতে সকলে একমত; তথাপি প্রকৃত সত্যকে জানা এবং তদনুযায়ী কাজ করার মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে এখানে সেটাই হচ্ছে আসল সমস্যা। এমন অনেক লোক রয়েছে যারা তাদের উত্তম আচরণের স্থলে তাদের পশু প্রবৃত্তিকে প্রাধান্য দিয়ে রেখেছে, তারা তাদের উৎকৃষ্ট নৈতিকতার বদলে অগ্রাধিকার দিচ্ছে তাদের লোভকে যা জলদ্বুদ্বুদের মত পানির উপর হঠাৎ একঝলক দিয়ে উঠে তৎক্ষণাৎ মিলিয়ে যায়। মানুষ তার জীবনের কারখানা হতে, নিঃসন্দেহে দু’টো সম্পুর্ণ পরস্পর বিরোধী প্রবণতা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। এখন মানুষ অবিরত তার ভাল ও মন্দ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এক হিংস্র সংগ্রামে নিয়োজিত রয়েছে। মানুষকে তার মন্দ বৈশিষ্ট্য নির্মূল করার জন্য সর্বপ্রথম যে কাজটা করতে হবে তা হচ্ছে এ যুদ্ধের ময়দানে তার লোভ ও ক্রোধকে বন্দী করা, কেননা এরাই হচ্ছে তার মধ্যকার পরশ্রীকাতরতা রূপ পশু শক্তির উৎস। কোন লোক জীবনে উন্নতি করতে চাইলে তার কর্তব্য হবে উভয় প্রবণতার যথেচ্ছাচারীতা রোধ করা এবং এদের ক্ষতিকর প্রবণতাসমূহ হতে নিজেকে মুক্ত রাখা, যা তার মধ্যকার খারাপ বৈশিষ্ট্য হতে উৎপন্ন হয়ে থাকে এবং তার প্রবণতাসমূহকে প্রয়োজনীয় ও সুন্দর অনুভূতিতে পরিবর্তিত করে। এটা এজন্য যে মানুষ তার অনুভূতিসমূহ হতে প্রভূত পরিমাণে উপকৃত হয়ে থাকে, কিন্তু এসব অনুভূতি তখনি ভাল হতে পারে যখন তারা তার যুক্তির নির্দেশের অনুগত হবে।
সামাজিক রীতিনীতি বিনষ্টকারী এই বৈশিষ্ট্যটির প্রসার লাভের একটা কারণ হচ্ছে এমন একটা প্রচলিত কথা:
“গঠনমূলক মিথ্যা কথা কষ্টদায়ক সহজ সত্য কথা অপেক্ষা বেশী ভাল।”
এই প্রবচনটা তার গোপন বৈশিষ্ট্য ঢাকা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, অনেক লোক তাদের প্রতিহিংসামূলক মিথ্যার যথার্থতা প্রমাণ করার জন্য এর আশ্রয় গ্রহন করে, এ বিষয়ে যৌক্তিকতা ও আইন শাস্ত্র কি বলে তা তারা এড়িয়ে যায়। ইসলাম ও যুক্তির এটাই দাবী যে যখন একজন মানুষের জান মাল ও অত্যাবশ্যকীয় সহায়-সম্পদ সঙ্কটাপন্ন হয় তখন তার দায়িত্ব হবে সম্ভাব্য সর্ববিধ উপায়ে এমনকি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে হলেও বিপদ থেকে মুক্ত হওয়া। এটা যথার্থই বলা হয়ে থাকে “নিরূপায় অবস্থা হারামকেও হালালে পরিণত করে।” প্রয়োজনীয় মিথ্যার একটা নির্ধারিত সীমানা রয়েছে, এটাকে অবশ্যই প্রয়োজনের সীমানার মধ্যে সীমিত রাখতে হবে। যদি মানুষ এই “গঠনমূলকতার” সীমানাকে তাদের ব্যক্তিগত লোভ-লালসা চরিতার্থে প্রসারিত করতে শুরু করে তাহলে তাদের তথাকথিত প্রয়োজনের বাহিরে একটা মিথ্যাও থাকবে না।
এ সম্পর্কে জনৈক বিজ্ঞ পন্ডিত বলেন: “প্রতিটি ব্যাপারে একটা যুক্তি আছে। প্রতিটি কাজের পেছনে যুক্তি ও কারণ আবিষ্কার করা সম্ভব। এমনকি পেশাদার অপরাধীরাও তাদের অপরাধের যৌক্তিকতা প্রদর্শন করতে পারে। সুতরাং এ পর্যন্ত যত মিথ্যা বলা হয়েছে তার প্রয়োজনীয়তা ও ভাল দিক রয়েছে। অন্যকথায় বলতে গেলে যখনই কোন্ মিথ্যা বলা হয় তা কোন না কোন উদ্দেশে বলা হয়ে থাকে এবং মিথ্যাবাদী ভাল ঃ মিথ্যা কথার দ্বারা মিথ্যাবাদীর যদি কোন লাভ না হয়ে থাকে তাহলে সত্যকে গোপন করার কোন কারণ থাকতে পারে না। এ সত্য হতে এটাই আসে যে, এটা মানুষের স্বভাব এবং এ স্বভাবই তাকে বলে দিবে যে কোন সব কাজ তার জন্য সুবিধাজনকভাবে ভাল। যদি মানুষের সন্দেহ হয় যে সত্য ভাষণের ফলে তার ব্যক্তিগত সুবিধাসমূহ বিপদাপন্ন হবে অথবা সে কল্পনা করে যে মিথ্যা বলার মধ্যে তার কল্যাণ নিহিত রয়েছে তাহলে নিশ্চিন্তে সে মিথ্যা কথা বলবে, কেননা, সে দেখতে পাচ্ছে সত্যের মধ্যে তার মন্দ এবং মিথ্যার মধ্যে ভাল নিহিত রয়েছে।”
এ সত্যকে আমাদের কখনও উপেক্ষা করা উচিত হবে না যে মিথ্যাচারের মধ্যে বিরাট মন্দ নিহিত রয়েছে এবং যদি মিথ্যা কথার দ্বারা কোন ক্ষতি হতে বাঁচা যায়, (যখন অনুমতি প্রাপ্ত) এটা অপেক্ষাকৃত অধিক ক্ষতিকর মন্দকে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র মন্দ দিয়ে মোকাবিলা করার উদ্দেশে করা হয়।
চিন্তা করার স্বাধীনতা হতে বলার স্বাধীনতা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, কেননা স্বাধীনভাবে চিন্তাশক্তির অনুশীলনের সময় কোন ভুল হলে এ ভুলজনিত ক্ষতি উক্ত ব্যক্তি পর্যন্ত সীমিত থাকে। অপরপক্ষে স্বাধীনভাবে বলতে গিয়ে যদি কোন ভুল হয়ে যায় তবে তদ্বারা সমাজের অগ্রগতি ব্যাহত হবে। স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগজনিত সুবিধা এবং অসুবিধা সমগ্র সমাজকে প্রভাবিত করে থাকে।
গাজ্জালী বলেছেন, “কথা বলার শক্তি হচ্ছে একটা উপকারী নেয়ামত। এটা একটা সূ² সৃষ্টি যা তার ক্ষুদ্রতম আকৃতি সত্তে¡ও অনুগত বা অবাধ্য হয়ে এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে থাকে। ঈমান এবং কুফরী দুটোই জিহ্বা দিয়ে প্রকাশ পায়, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের বন্দেগী বা অবাধ্যতার জীবনে পরিণত হয়। তিনি আরও বলেন, “মন্দকে পরিহার করা তাদের জন্যই সম্ভব যারা তাদের কথাবার্তাকে ধর্মীয় বিধির আওতাভুক্ত রাখতে সক্ষম। এসব লোক ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের মুখ খুলবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তা তাদের জীবন, ঈমান ও পরকালের জীবনের জন্য কল্যাণকর না হয়।” আবু হামিদ আল গাজ্জালী, কিমিয়ায়ে সা’আদৎ।
ছেলেমেয়েদের সম্মুখে মিথ্যা বলা ও সত্যের বিরোধী আচরণ পরিহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেন বদস্বভাব তাদের অন্তরে না ঢুকতে পারে। ছেলেমেয়েরা তাদের পরিবার ও চতুর্দিকের লোকজনদের কাছ থেকে কিভাবে কথা বলতে হবে ও কাজকর্ম করতে হবে তা শিখে। অতএব, যদি সত্য বিরোধী আচরণ পরিবারিক পরিবেশে ঢুকে পড়ে ছেলেমেয়েরা তাতে প্রভাবিত হবে এবং পরবর্তী পর্যায়ে তারাও একই রোগের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়বে।
মরিস টি ইয়াস বলেন:
“সত্যকে খুঁজে বের করার জন্য চিন্তা করা, কথা বলা ও প্রচেষ্টা চালানোর অভ্যাস ও চর্চা একমাত্র তাদের দ্বারাই সম্ভব যারা ছেলে বেলায় একই ধরনের পরিবেশের মধ্যে প্রতিপালিত হয়েছে।”
একজন মনস্তত্ত¡বিদের মতে:
“মানুষের অনুভূতি দুভাগে বিভক্ত একটা ভান্ডের মত। প্রথম ভাগটা হচ্ছে আক্রমণাত্মক আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে প্রতিরক্ষামূলক। মানুষ যদি তার আত্মরক্ষামূলক অনুভূতিগুলোকে পরিচালিত করে তার আক্রমণাত্মক অনুভূতিসমূহের উপর বিজয়ী হতে পারে, তবে সে তার অস্তিত্বের উপর কর্তৃত্ব লাভ করে তার অনুভূতিকে তার ইচ্ছামত পরিচালিত করতে সক্ষম হবে, নতুবা তাকে তার অনুভূতির মর্জিমত চলতে হবে।”
যারা তাদের অভ্যন্তরীণ শক্তিসমূহের সাথে তাদের লোভ-লালসা ও তাদের মনের কামনা-বাসনার একটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে তাদের মনের সাথে তাদের আত্মার একটা শান্তিপূর্ণ মনোভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে, তারাই নিঃসন্দেহে জীবনের সমস্যাসমূহের মধ্যে দুর্বলতা, ব্যর্থতা বা পরাজয়মুক্ত সংকল্পের সাথে একটা সুখের পথ অনুসরণ করছেন। এটা সত্য যে, মানুষের যোগ্যতা প্রতিভা, গতি ও দ্রুততার দিক হতে এক উন্নত পর্যায়ের অনুশীলনের পর্যায়ে উন্নীত হয়ে, চিন্তাশক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে, মানবজাতিকে সমুদ্র ও সাগরের অতল গভীরে পৌঁছার সুযোগ করে দিয়েছে। এতসব সত্তে¡ও আমরা মানুষের মধ্যে বিরামহীন দুঃখ-দুর্দশা লক্ষ্য করছি। সভ্যতার অভ্যন্তরীণ অবস্থার মধ্যে উঠা নামা চলতে চলতে এটা এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, যা দেখে মনে হচ্ছে এটা যেন দুঃখ-দুর্দশা ও সমস্যার হাতের একটা খেলনা মাত্র। আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ ও উন্নত বৈশিষ্ট্যাবলীর পথ হতে পশ্চাদপসরণের এটাই পরিণতি।
ডাঃ সি, রোমান লিখেছেন:
“এ যুগে বিজ্ঞানের অনেক উন্নতি হয়েছে, কিন্তু আদিম আচার-আচরণ ও অনুভূতির অগ্রগতি যদি হতো, তাহলে আমরা সম্ভবতঃ বলতে পারতাম যে মানবজাতি তার মনুষ্যত্বেরও উন্নতি সাধন করেছে।”
ভারসাম্য ও সাম্যের বিধান অনুযায়ী সভ্যতার মধ্যে উন্নত গুণাবলীর যে অভাব রয়েছে তা তার ভবিষ্যৎ ধ্বংস ও বিলুপ্তি বৈ আর কিছু নয়। বিভিন্ন সমাজের অবনতি ও অব্যাহত দুঃখ-দুর্দশার মূলে যে কারণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা হচ্ছে, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তা। মূল্যবোধসমূহ তার মৃতপ্রায় সভ্যতার দেহে, জীবনী শক্তি সঞ্চার করে তাকে প্রয়োজনীয় শক্তির অধিকারী করবে।