আমিরুল মু’মিনিন আলীর (আ.) সাথে বিবাহ অনেক গণ্যমান্য সাহাবীরা মহানবীর (সা.) কাছে হযরত ফাতেমা যাহরার (আ.) প্রস্তাব। নয়ে এসেছেন। কিন্তু তিনি তাদের প্রস্তাবকে নাকচ করে দেন এবং পাশাপাশি এটাও জানিয়ে দেন যে, ফাতেমা যাহরার (আ.) বিবাহের বিষয়টি আল্লাহর উপর ন্যস্ত। কারণ ফাতেমা যাহরা (আ.) রাসূলের (সা.) অন্যান্য কন্যাদের থেকে বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদার আসনে সমাসীন। বস্তুতঃ ফাতেমার (আ.) পবিত্র সত্তায় এমনই এক মহা মূল্যবান রত্ন নিহিত ছিল, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) ব্যতিত অন্য কারও জানা ছিল না। অনুরূপভাবে আলীর (আ.) বিষয়টিও একই সূত্রে গাঁথা। রাসূলুল্লাহর (সা.) ঘনিষ্ঠ সাহাবীবর্গ বহুবার আমিরুল মু’মিনিন আলীকে (আ.) মহানবীর (সা.) নিকট হযরত ফাতেমার (আ.) প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু লজ্জা প্রতিবারই এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিশেষে আলী (আ.) একদিন রাসূলের (সা.) কাছে হযরত ফাতেমার (আ.) প্রস্তাব নিয়ে হাজির হলেন। তাঁর মুখ থেকে এ প্রস্তাব শোনা মাত্রই অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে যান। মনে হচ্ছিল যে, তিনি যেন পূর্ব থেকেই এমন প্রস্তাবের প্রতিক্ষায় ছিলেন। ফলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেনঃ বিবাহের খরচাদি ও দেনমোহর বাবদ তোমার নিকট কি আছে? নিঃসন্দেহে রাসূল (সা.) অন্য যে কারও অপেক্ষা আলীর (আ.) অর্থ-সম্পদ সম্পর্কে অধিকতর জ্ঞাত ছিলেন। কারণ তিনি শিশুকাল হতেই তাঁকে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে প্রতিপালন করেছেন। দিবা-রাত্র, সফর, যুদ্ধ ও সন্ধিসহ সর্বক্ষেত্রে তিনি তাঁকে সাথে নিয়ে চলতেন। শুধু তাই নয় তিনি যেমনভাবে তাঁর পার্থিব সম্পদ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন, তেমনভাবে তাঁর সুগভীর জ্ঞান, বিচক্ষণতা এবং আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পর্কেও জানতেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তিনি জিজ্ঞাসা করেন। হে আলী দুনিয়ার সম্পদ তোমার নিকট কি আছে? উত্তরে আলী (আ.) বলেনঃ একটি তরবারী, একটি ঢাল এবং যে পোষাক পরিধান করে আছি। এমতাবস্থায় রাসূল (সা.) বলেনঃ তোমার তরবারীর সবসময় প্রয়োজন রয়েছে। কারণ এটি দিয়ে ইসলামের প্রতিরক্ষা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুদেরকে দমন করবে। অতএব ঢালটি বিক্রয় করে দাও।’ ইমাম আলী (আ.) উক্ত ঢালটি পাঁচ শত দিরহামে বিক্রয় করে তা হযরত ফাতেমা যাহরার (আ.) বিবাহের দেনমোহর হিসেবে প্রদান করেন। মহীয়সী যাহরা (আ.) আমিরুল মু’মিনিন আলীর (আ.) সাথে পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে এক মহিমান্বিত জীবনের শুভ সূচনা করেন। যদিও তাঁদের উভয়ের বৈবাহিক জীবন ছিল অতুলনীয় বরকত ও সফলতায় অলংকৃত। কিন্তু তথাপি তারা পার্থিব জীবনে নানাবিধ সমস্যাদির মুখোমুখি হয়েছেন।
অলী (আ.) ফাতেমার (আ.) সুযোগ্য সহধর্মী : আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ) ও ফাতেমা বাহরার (আ.) বিবাহ সম্পরে ইমাম জাফর সদীক (আ.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস বিশেষভরে প্রণিধানযোগ্য। তিনি স্বয়ং রাসুলের (সা.) উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেনঃ আল্লাহ যদি অলীকে সৃষ্টি না করতেন, তাহলে এ পৃথিবীতে ফাতেমার উপযুক্ত পত্র খুঁজে পাওয়া যেত না। এমন উত্তম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পাত্রের কি কোন নজীর আছে? অবশ্য এ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তি কেবল আত্মীয়তার বন্ধন নয়। কেননা রাসূলের (সা.) অন্যান্য চাচাত ভাইরাও তো ছিলেন হ্যাঁ, তাঁরা উভয়ে ঈমান, প্রজা ও আধ্যাত্মিকতার পরস্পরের সমকক্ষ ছিলেন ফাতেমা যাহরা (আ.) সুদুঢ় ঈমান, অত্মিক পরিশুদ্ধি, সুগভীর জ্ঞান ও মহানুভবতায় ইমাম আলীর (আ.) উপযুক্ত সমকক্ষ ছিলেন। আর আলীও (আ.) ছিলেন এসব উত্তম গুণাবলীর সর্বোচ্চ শিখরে সমাসীন আল্লাহ তায়ালা রাসুলের (স.) প্রতি আদেশ করেন আলী ও ফাতেমাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে। কারণ তাঁরা উভয়ে পরস্পরের সমকক্ষ ও সম্পূরক। তাঁরা রাসূলের (স.) তত্ত্ববধানে প্রতিপালিত এবং তাঁরই জান, মিষ্টাচার ও আধ্যাত্মিকতার উৎসধারায় সিক্ত হয়েছেন। তাঁরা তাঁর একান্ত সাহচর্যে বেড়ে উঠেছেন, যে সৌভাগ্য অন্য কোন সাহাবীর ভাগ্যে জুটেনি। তাঁরা দিবারাত্র রাসূলের (সা.) সাহচর্যে থাকতেন এবং তিনিও সর্বদা তাঁদেরকে সর্বোত্তম প্রশিক্ষণ দান করেছেন। মহান আল্লাহ বিশ্বনবীকে (সা.) তাঁর নিকটাত্মীয়দের প্রতি দাওয়াত দানের আদেশ দেন। তিনিও এ আদেশ আলী (আ.) ও ফাতেমার (আ.) মধ্যে বাস্ত বায়িত করেন। এমনকি যখন রাসূলের (সা.) স্বজনবর্গ তাঁকে বর্জন করেছিল, তখন তাঁরা দু’জনই ছিলেন তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠতম সহযোগী। অনুরূপভাবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলী (আ.) ও ফাতেমার (আ.) সহাবস্থান এবং সমকক্ষতার চমকপ্রদ সাক্ষ্য দান করে। তাঁদের উভয়ের গৌরবান্বিত জীবনও আল্লাহর নৈকট্য ও মা’রেফাতের ক্ষেত্রে পরস্পরের সমমর্যাদা এবং আধ্যাত্মিকতায় উভয়ের সমকক্ষতার অত্যুজ্জ্বল প্রমাণ বহন করে। হ্যাঁ, আলী (আ.) ও ফাতেমার (আ.) সমকক্ষতার রহস্য এবং রাসূল (সা.) কর্তৃক কতিপয় বিশিষ্ট্য সাহাবীর প্রস্তাবের প্রতি অসম্মতি জানানোর নেপথ্য রহস্য উপরোক্ত বিষয়াবলীর মধ্যে নিহিত। শেইখ সাদৃক (রহ.) ধারাবাহিক সনদে ইমাম রেযা (আ.) থেকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেছেন। যে হাদীসটি ইমাম রেযা (আ.) তাঁর পিতা ইমাম মূসা কাজেম (আ.) তিনি তাঁর পিতা জাফর সাদীক (আ.) এভাবে পর্যায়ক্রমে আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.) এবং তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। যে হাদীসটির ধারাবাহিক সনদ সম্পর্কে আহমাদ বিন হাম্বাল (রহ.) উল্লেখ করেছেনঃ এ প্রসিদ্ধ হাদীসটি যদি কোন নির্বোধের নিকটও পাঠ করা হয়, তাহলে তার চেতনা ফিরে আসবে। কেননা এ হাদীসটি ধারাবাহিকভাবে স্বয়ং রাসূল (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেনঃ হে আলী! কোরাইশ গোত্রের অনেকে আমার প্রতি আপত্তি করে বলেছে যে, আমরা আপনার কাছে ফাতেমার প্রস্তাব নিয়ে আসলাম। কিন্তু আপনি অসম্মতি জানিয়েছেন। অথচ আলী ইবনে আবু তালিবের প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। আমি তাদেরকে জানিয়েছিঃ আল্লাহর শপথ! না আমি তোমাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি, না আলীকে ফাতেমার সহধর্মী করেছি। বরং স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এবং ফাতেমার স্বামী হিসেবে আলীকে নির্বাচন করেছেন। জিবরাঈল (আ.) আল্লাহর পক্ষ হতে আমার প্রতি এ আদেশ নিয়ে নাযিল হয়ঃ যদি আলীকে সৃষ্টি না করতাম, তাহলে আদমের সময় হতে কেয়ামত পর্যন্ত তোমার কন্যা ফাতেমার সমকক্ষ পাত্র খুজে পওয়া যেত না।
সূএ : নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.)