“সাহাবা “
আরবী এই শব্দটি নিয়ে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে বেশ কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে।
সেটা হচ্ছে যে, কে সাহাবা এবং কে সাহাবা নয় ইত্যাদি।
সুপ্রিয় পাঠক,
আসুন বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা কিছু আলোচনা করা যাক।
কেননা এই বিষয়টা একটু পরিস্কার হওয়া দরকার কারন আমার বন্ধুদের মধ্যেও এই বিষয়ে কনফিউশন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সুতারং, খুব সংক্ষেপে বিষয়টা পরিস্কার করতে চাই।
প্রথমেই দেখা যাক –
আহলে সুন্নাত ভাইদের মতানুযায়ী –
‘সাহাবী’ এর একটা সংজ্ঞা আছে, তাতে বলা হচ্ছে যে, রাসুল (সাঃ) কে যে ব্যক্তি স্বচক্ষে দেখেছেন এবং নবীজী (সাঃ) এর উপর পরিপূর্ণ ঈমান এনেছেন ও ঈমানদার অবস্থায় ঐ ব্যক্তি মারা গিয়েছেন, তাহলে ঐ ব্যক্তিটি হচ্ছেন সাহাবা।
আহলে সুন্নাত ভাইদের বহুল প্রচারিত এই ডেফিনিশনকে প্রচার প্রপাগন্ডার মাধ্যমে এমন করে দিয়েছে যে, সাধারণ মুসলমান জনগণ এটাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।
খুবই বিনয়ের সাথে বলতে চাই যে, “সাহাবা” এর এই সংজ্ঞার সাথে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বর্নিত “সাহাবা” এর সংজ্ঞার সাথে কোন মিল নেই।
অবাক করা বিষয় এটাই যে, সাহাবা – কাকে বলা হবে –
এ সম্পর্কিত সংজ্ঞা স্বয়ং রাসুল (সাঃ) হাদিসে কোথাও বলেন নি।
পবিত্র কোরআনে “সাহাবা” কাকে বলা হয় –
এই সম্পর্কে কোন বিস্তারিত বর্ননা বা সংজ্ঞা দেওয়া হয় নি।
বরং পবিত্র কোরআনে “সাহাবী” শব্দটি যে অর্থে ব্যবহার হয়েছে তার সাথে এই সমাজে প্রচলিত “সাহাবা” বিষয়ক সংজ্ঞার কোন মিল নেই।
সুতারং, প্রচলিত ইসলামে “সাহাবা” শব্দের যে ব্যাখ্যা বা ডেফিনেশন দেয়া হয়, এটা একটা মনগড়া বেদআতি ডেফিনিশন।
পাঠক,
খুব অবাক হচ্ছেন এবং বেশ রেগে যাচ্ছেন, নিশ্চয়ই !
এবারে আসুন, বিষয়টি এখন পরিস্কার করি।
একজন ব্যক্তি অন্যজনের সাহাবি বা সাথী-
এই বিষয়টি পবিত্র কোরআনে যে ভাবে বলা হয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছে যে, একজন ব্যক্তির সাথে অন্য একজন ব্যক্তির সামাজিক যে কোন সম্পর্ক থাকলেই ঐ ব্যক্তিদ্বয় পরস্পরের সাহাবী বা সাথী হয়।
এই দুইজন ব্যক্তির মধ্যে একজন মুসলিম ও অন্যজন ননমুসলিম হতেই পারে। ঠিক যেরকম আমাদের বন্ধু বা ঋৎরবহফ সার্কেলে বিভিন্ন ধর্মালম্বী থাকে।
এখানে একজন মুসলিম এবং অপরজন ননমুসলিম হতে পারে। এমনকি একজন মুসলিম এবং অপরজন কাফের মুশরিক হতে পারে। আবার দুজন ব্যক্তি মুসলিম হতে পারে।
এমনকি জীবন্ত কিছু না হলেও সাহাবা বলা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ পবিত্র কোরআনের সুরা ইউসুফে মহান আল্লাহ, ইউসুফ (আঃ) এর কথাকে উল্লেখ করছেন,
যেখান ইউসুফ (আঃ) এর স্বপ্নদেখা দুই কয়েদীকে বলছেন এ ভাবে-
‘ হে আমার কারাগারের সাহাবি……..’
আয়াত নং- ৩৯ ও ৪১।
এখানে উল্লেখ্য যে, ঐ দুইজন কয়েদী কিন্তু কাফের ছিল।
অনুরূপভাবে এক মুমিন ব্যক্তি এবং অপর এক কাফের ব্যক্তির কথাপকথন আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এভাবে উল্লেখ করেছেন-
” সে তার সাহাবীকে বিতর্কের সময় বলল……… ”
সুরা – কাহফ / ৩৭।
এখানে মহান আল্লাহ নিজেই একজন কাফের ব্যক্তিকে অন্য একজন মুমিন ব্যক্তির সাহাবী বলে উল্লেখ করেছেন।
এমনকি পবিত্র কোরআনে নবী (সাঃ) কেও কাফেরদের সাহাবী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ কাফেরদেরকে উল্লেখ করে বলেছেন –
” তোমাদের সাহাবী ভুলের মধ্যে নেই……..”।
সুরা – নাজম / ২।
খেয়াল করুন, এখানে মুহাম্মাদ (সাঃ) কে কাফেরদের সাহাবী বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।
পবিত্র কোরআনের সুরা সাবা এর ৪৬ নং আয়াতেও নবী (সাঃ) কে কাফেরদের সাহাবী বলা হচ্ছে।
আল্লাহ কাফেরদের উদ্দেশ্য করে বলছেন ” তোমাদের সাহাবী……”.।
পবিত্র কোরআনের আরও অন্যত্র কাফের ও মুমিনদেরকে পরস্পরের সাহাবী বলা হচ্ছে।
পবিত্র কোরআনের স্পষ্ট আয়াত থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, “সাহাবী” এই শব্দটি কোন বিশেষ মর্যাদা বা বিশেষ কোন আলাদা সম্মানের বিষয় নয়। বরং দুজন মানুষ সামাজিক কোন কারনে অস্থায়ী কোন সহাবস্থান বা সামাজিক যোগসুত্রের ফলে পরস্পরের বন্ধু বা সহযাত্রী বা যে কোন পরিস্থিতিতে একযোগে সহাবস্থান করতেই পারে।
এক্ষেত্রে ঐ দুজন ব্যক্তি পরস্পর পরস্পরের সাহাবী হয়ে পড়ে।
তা সে কোন বাসের যাত্রী হিসেবে ঘন্টা খানেক সফর সংজ্ঞী হোক না কেন। আর বাজারের গল্পের সংগীই হোক না কেন।
এক্ষেত্রে দু’জন মুসলিম অথবা একজন মুসলিম অন্যজন ননমুসলিম অথবা দুজনেই ননমুসলিম হতে পারে।
এক্ষেত্রে একজন মুসলিম ও অন্যজন কাফের অথবা দুজনেই কাফের হতে পারে।
সুতারং সুন্নি ভাইদের ঐ “সাহাবী” সংজ্ঞা নিয়ে এতটা উতলা না হওয়াটাই শ্রেয়।
কারন পবিত্র কোরআন চ্যালেজ্ঞ দিয়ে বলছে যে, মহানবী (সাঃ) এর চারপাশে প্রকৃত ঈমানদার মুমিন সহযাত্রী, বন্ধু, সাথী বা সাহাবী যেরকম ছিলেন ঠিক সেরকম নবীজী (সাঃ) এর চারপাশে বহু মুনাফিক সাথী বা সাহাবা বিদ্যমান ছিল।
পবিত্র কোরআনের সুরা মুনাফেকুন এই কথার পক্ষে স্পষ্ট দলীল –
‘ — যখন মুনাফিকরা তোমার কাছে আসে তারা বলে, ” আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসুল “। আল্লাহ জানেন যে, নিশ্চয়ই তুমি তাঁর রাসুল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। তারা তাদের সাক্ষ্যগুলোকে ঢাল বানায় এবং আল্লাহর পথে বাধা দেয়। নিশ্চয়ই তা খুবই খারাপ যা তারা করত। তা এ কারনে যে, তারা বিশ্বাস করেছিল এরপর অবিশ্বাস করেছিল —- “। সুরা – মুনাফেকুন-১, ২, ৩।
মনযোগ দিন, প্লীজ।
তারা শপথ করে বলছে যে, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসুল”।
অর্থাৎ তারা সকলেই নবীজীর (সাঃ) সামনেই কলেমা পড়েছিল।
সাহাবার প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী তারা প্রথমে নবীজীর (সাঃ) সাহাবা হল।
এবারে দেখুন আল্লাহ পুনরায় কি বলছেন–
আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। তারা তাদের সাক্ষ্যগুলোকে ঢাল বানায় এবং আল্লাহর পথে বাধা দেয়। নিশ্চয়ই তা খুবই খারাপ যা তারা করত। তা এ কারনে যে, তারা বিশ্বাস করেছিল এরপর অবিশ্বাস করেছিল —- “।
প্রথমে এরা কলেমা পড়ে বিশ্বাসী হয়েছিল। কিন্ত এরপরে তারা অবিশ্বাসী হয়ে গেল।
সুর মুনাফেকুনে এই বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাবে প্রমানিত যে,
পবিত্র কোরআন সুস্পষ্ট ভাষায় বলে যে –
মোটা দাগে সাহাবা দুই প্রকার –
১) – ঈমানদার মুমিন সাহাবা,
২) – বেঈমান মুনাফিক সাহাবা।
আমাদের বন্ধু মহলে যেরকম ভাল ঈমানদার বন্ধু আছে ঠিক সেরকম মন্দ বা মুনাফিক বন্ধু আছে।
পবিত্র কোরআন এটাই প্রমাণ করে যে, নবীজী (সাঃ) এর সাহাবাগণ দুই প্রকার।
এক প্রকার – প্রকৃত ঈমানদার মুমিন সাথী বা সাহাবা,
আরেক প্রকার – বেঈমান মুখোশধরী মুনাফিক সাথী বা সাহাবা।
অতএব “সাহাবা” অর্থই যে, শতকরা একশত ভাগ নির্ভেজাল ঈমানদার মুমিন – এটা ভেবে নেওয়ার চেয়ে বড় মূর্খতা আর কিছুই হতে পারে না।
পাঠক,
পরিশেষে মহানবীর (সাঃ) প্রকৃত ঈমানদার মুমিন সাহাবীর সংজ্ঞা হচ্ছে যাঁরা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) (তাঁর জন্য আমার দু’চোখ কুরবান হোক)
এর জীবদ্দশাতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
মনে বিন্দুমাত্র মুনাফিকি পোষণ করেননি, কক্ষণই আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) সাথে বেয়াদবী, অসদাচরণ, বিশ্বাসঘাতকতা, নির্দেশ অমান্য করেননি, একে অপরের প্রতি অত্যন্ত রহম দিল ছিলেন।
কিন্তু কাফেরদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর সংগ্রামী ছিলেন।
একে অপরের বিরুদ্ধে কখনই অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেননি, ক্ষমতার লোভ পোষন করেননি, ভোগ বিলাস অপচয়ে মত্ত হননি, স্বজনপ্রীতি লালন করেননি, মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করেননি, চুক্তি ও ওয়াদা ভঙ্গ করেননি, পাপাচার ও অপকর্মে লিপ্ত হননি, নবীজী (সাঃ) এর সুন্নাহর পরিবর্তন সাধন করেননি, বিদআত চালু করেননি, সত্য সঠিক হাদীস প্রচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি, নবীজীর (সাঃ) পবিত্র আহলে বাইতের (আঃ) বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র শত্রুতায় লিপ্ত হননি, এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঈমানের উপর দৃঢ়ভাবে অটল ছিলেন —
একমাত্র তাঁরাই ছিলেন নবীজীর (সাঃ) প্রকৃৃত ঈমানদার মুমিন সাহাবী (রাঃ)।
নবীজীর (সাঃ) কতিপয় প্রকৃত ঈমানদার মুমিন সাহাবীগণ —-
আশা করি সাহাবা বিষয়ক নতুন একটি ধারনা পেলেন।
লেখাটির সাথে অবশ্যই আপনার দ্বিমত থাকতেই পারে।
সেক্ষেত্রে আপনার মূল্যবান পাল্টা যুক্তিগুলো শালীন ভাষায় অবশ্যই মন খুলে লিখুন।
আসুন আমরা পরস্পর বন্ধুত্বপূর্ন পরিবেশে খোলামেলা আলোচনা করি।
সকলকে ধন্যবাদ।###
সংকলনেঃ Nazim Khan Rafedi