জিহাদ; পারলৌকিক অনিষ্ট ও ক্ষতি থেকে রক্ষার মাধ্যম
এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের সাথে অত্যন্ত চমকপ্রদ ভাষায় কথা বলেছেন। তিনি প্রশ্নবোধক স্বরে উল্লেখ করেছেন- হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদের এমন এক ব্যবসায়ের সংবাদ দিব যা তোমাদের বেদনাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করবে? বস্তুত প্রশ্নবোধক স্বরে কোন কিছু উত্থাপনের উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা; কথোপকথনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত একটি কার্যকরী পন্থা হচ্ছে এটি, যাতে শ্রোতা কিংবা যাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলা হচ্ছে তাদের মন ও মস্তিস্ককে সহজেই নিজের দিকে আকৃষ্ট করা যায়। অবশ্য অনুরূপ বিষয়বস্তুর আয়াত কুরআনের আরও একটি সূরাতে বর্ণিত হয়েছে,
“নিশ্চয় আল্লাহ মু’মিনদের নিকট হতে তাদের জীবন ও তাদের ধন-সম্পদ ক্রয় করেছেন এর বিনিময়ে যে, বেহেশত তাদের জন্য হবে। সূরা তওবা : ১১১
অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের সাথে লেনদেন করেন; আর তা হচ্ছে তিনি বেহেশতের বিনিময়ে তাদের জান ও মালকে ক্রয় করে নেন। এখানেও ব্যবসা ও লেনদেনের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু সূরা সাফ্ফের এ আয়াতের বাচনভঙ্গি ও বর্ণনাশৈলী অধিক আকর্ষণীয় এবং তা শ্রোতাদের মনোনিবেশকে তুলনামূলক বেশি আকৃষ্ট করে। এখন আমরা অত্র আয়াতের বঙ্গানুবাদ এবং তাতে নিহিত গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরব-
বর্ণিত হয়েছে, اহে মু’মিনগণ!’। এ সূরার শুরুতেও মু’মিনদের সম্বোধন করে আরম্ভ করা হয়েছে। আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, যদিও সূরা সাফ্ফের কোন কোন আয়াতে মু’মিনদের সম্বোধন করে তিরস্কার কিংবা তাদের দোষ-ত্রুটি তুলে ধরা হয়েছে; কিন্তু তাতে কোন দূষণীয় কিছু নেই। কেননা এমন কোন বিধিমালা নেই যে, কুরআন শুধুমাত্র মু’মিনদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকবে; বরং ক্ষেত্রবিশেষে তাদের দোষ-ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেওয়ারও প্রয়োজন রয়েছে যাতে তারা নিজেদের সংশোধন করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। অতঃপর আল্লাহ মু’মিনদের সম্বোধন করে বলছেন, ‘ আমি কি তোমাদের এমন এক ব্যবসায়ের খবর দিব।’ আর এ ব্যবসায়ের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হচ্ছে- ‘যা তোমাদের বেদনাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করবে।’ অবশ্য এ আয়াতে বর্ণিত ‘বেদনাদায়ক শাস্তির’ সুনির্দিষ্ট কোন বিবরণ তুলে ধরা হয় নি। কাজেই এ শাস্তির ধরণ ও প্রকৃতি কিরূপ হবে সে সম্পর্কে কোন কিছু সুস্পষ্ট করা হয় নি এবং সে সম্পর্কে সম্যক কোন ধারণাও কারও নেই। কিন্তু এখানে যে ‘বেদনাদায়ক শাস্তির’ কথা বলা হয়েছে এবং যা একটি ব্যবসার মাধ্যমে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব; সেটা থেকে যে বিষয়টি অনুমান করা যায় তা হচ্ছে- এ শাস্তি হচ্ছে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। আর এমন ক্ষতি যা হতে মানুষ একটি ব্যবসায়ের মাধ্যমে রক্ষা পেতে পারে; কিন্তু সে ব্যবসাকে অবশ্যই লাভজনক হওয়া বাঞ্ছণীয়। মানুষ যদি ব্যবসা না করে তবে পুঁজি বা সম্পদের যথাযথ ব্যবহার হবে না। মনে করুন, আমাদের নিকট যে অর্থ রয়েছে তা যদি পুঁজি হিসেবে কোন ব্যবসা বা বাণিজ্যিক কার্যে বিনিয়োগ করা হয়, তবে সে অর্থ ও পুঁজির ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু যে অর্থ ও পুঁজি আপনার আয়ত্তাধীন রয়েছে তা যদি যথাযথভাবে ব্যবহার না হয়; তাহলে কিভাবে সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে? ক্ষতি অর্থাৎ পুঁজি অলাভজনক হওয়া অথবা কখনও কখনও পুঁজি নষ্ট হয়ে যাওয়া। এমতাবস্থায় কিসের মাধ্যমে এ ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব? উত্তর হচ্ছে- লাভজনক কোন ব্যবসায়ের মাধ্যমে। যদি আপনি নিজস্ব সঞ্চিত পুঁজির মাধ্যমে ব্যবসা করেন -কিংবা উদাহরণস্বরূপ মানুষ নিজের বাহুশক্তির মাধমে কোন ব্যবসা করে অথবা শারীরিক কোন সক্ষমতার মাধ্যমে ব্যবসা করে অথবা এমন কোন পুঁজি কিংবা সক্ষমতার মাধ্যমে ব্যবসা করে- তাহলে সে পুঁজি (যা ক্ষয়িঞ্চু) দিয়ে ব্যবসা লাভজনক হওয়ার সমূহ সম্ভবনা রয়েছে। কিন্তু যদি উক্ত পুঁজি দিয়ে আপনি ব্যবসা না করেন, তাহলে শুধু লাভ থেকে বঞ্চিত হবেন না; বরং গোটা পুঁজিই ক্রমান্বয়ে বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর এটাই এক ধরনের ক্ষতি হিসেবে গণ্য।
যাইহোক, পার্থিব পুঁজি দিয়ে সাধারণত পার্থিব ব্যবসাই হয়ে থাকে। যখন আপনি কিছু টাকা এমন ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করবেন, তখন আপনি কিভাবে ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে পারেন? অবশ্যই পার্থিব ব্যবসায়ে আপনাকে কিছু বেচাকেনা কিংবা কোন বস্তু ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময়ের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে এবং এ উপায়ে সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু যদি কখনও এ পুঁজি দিয়ে ব্যবসা করে অপার্থিব তথা আধ্যাত্মিক লাভের বিষয় থাকে, তাহলে সে ব্যবসা হচ্ছে আধ্যাত্মিক যা মানুষকে উক্ত পুঁজি বিনষ্ট হওয়ার ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। আর এখানে সে আধ্যাত্মিক ব্যবসা ও লাভের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। এখন আমরা দেখব যে, সে ব্যবসা কেমন এবং কিভাবে সম্ভব? আয়াতে পুঁজির যথাযথ ব্যবহার না করার কারণে যে বড় ধরনের ক্ষতির আশংকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে ক্ষতি হচ্ছে সূরা আসরে বর্ণিত ক্ষতির অনুরূপ।