‘হাওয়ারী’ নামকরণের কারণ
হযরত ঈসার (আ.) ঘনিষ্ট সহচরগণ ‘হাওয়ারী’ নামে প্রসিদ্ধ; ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী তাদের সংখ্যা ছিল ১২ জন| তারা প্রত্যেকে হযরত ঈসার (আ.) প্রতি পূর্ণ ঈমান পোষণ করতেন| তারা সব সময় হযরত ঈসার (আ.) সাথে সাথে থাকতেন, তাঁর কথাগুলো শ্রবণ করতেন, তাঁর থেকে জ্ঞানার্জন করতেন এবং তাদের অন্তরসমূহ পবিত্র শিক্ষার আলোয় আলোকিত ছিল| কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- কেন তারা ‘হাওয়ারী’ নামে প্রসিদ্ধ হলেন? বর্ণিত হয়েছে যে, ‘হাওয়ারী’ শব্দের মূল হচ্ছে ‘হাওয়ার’ যার অর্থ হল সাদা| বস্তুত তারা প্রত্যেকে ছিলেন সাদা বা ¯^চ্ছ অন্তরের অধিকারী; সেদিনের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজের মধ্য থেকে হযরত ঈসার (আ.) আহ্বানে তাদের স্বচ্ছ অন্তরসমূহ শুনতে সক্ষম হয়েছিল এবং তারা সে ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন| কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন: তারা ছিলেন সাদা পোষাকধারী, সব সময় সাদা পোষাক পরিধান করতেন কিংবা নিজেদের পরিচ্ছদসমূহকে শ্বেত বর্ণের রাখতেন অর্থাৎ তারা নিজেদেরকে সব ধরনের অপবিত্রতা, নোংরা ও পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত রাখতেন| আবার কেউ কেউ বর্ণনা করেছেন: তারা অন্যদের পরিচ্ছদসমূহকে স্বচ্ছ করতেন এবং সেগুলোকে নোংরা ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করতেন|
অবশ্য এক্ষেত্রে গবেষণার ভিত্তিতে অপর একটি মত হচ্ছে- ‘হাওয়ারী’ শব্দটি আরবী ‘হেওয়ার’ শব্দমূল থেকে এসেছে; যার অর্থ হচ্ছে সংলাপ ও কথোপকথন| আমি নিজেও এ সম্পর্কে পর্যাপ্ত বই-পুস্তক অধ্যায়ন করে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি তা হচ্ছে ‘হাওয়ারী’ শব্দটি ‘হেওয়ার’ অথবা‘মুহাওয়ারাহ’ শব্দমূল থেকে গৃহীত হয়েছে; যা সাধারণত সংলাপ, কথাবার্তা বা কথোপকথন অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে| পবিত্র কুরআনে এ অর্থের প্রতি ইশারা করে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের উভয়ের কথোপকথন শ্রবণ করেন’| এখানে উল্লেখ্য বিষয় হচ্ছে কথোপকথ সাধারণত পারস্পরিক সাহচর্য ও ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে| আর হযরত ঈসার (আ.) ঐ সাথীরা সর্বদা তাঁর সান্নিধ্যে ও সাহচর্যে থাকতেন, তাঁর সাথে কথোপকথন করতেন এবং তাঁর কথাবার্তা শ্রবণ করতেন| তারা হযরত ঈসার (আ.) নিকট নিজেদের ও সাধারণ মানুষের যাবতীয় প্রশ্নাবলি তুলে ধরতেন এবং সেগুলোর যথাযথ ও জ্ঞানগর্ভ জবাব গ্রহণ করতেন; অতঃপর সে সব জবাব মানুষের নিকট পৌঁছে দিতেন এবং তাদের সমস্যাদির উপযুক্ত সমাধানের পথ দেখাতেন| এ সব জ্ঞানগর্ভ জবাব এবং দিকনির্দেশনাবলি ইঞ্জিল শরীফ ও বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে| এছাড়া আল কুরআনের কিছু কিছু আয়াতে হযরত ঈসার (আ.) কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ও জ্ঞানগর্ভ দিকনির্দেশনার প্রতি ইশারা করা হয়েছে| হাদীসেও এ ধরনের অনেক নমুনা উত্থাপিত হয়েছে| সেগুলো একদিকে যেমন গভীর তাৎপর্যবহ, শিক্ষামূলক ও হিকমতপূর্ণ অপরদিকে তেমন রূপক, রহস্যময় ও হৃদয়গ্রাহী; এ থেকে বুঝা যায় যে, হযরত ঈসা (আ.)স্বীয় হিকমতপূর্ণ ও হৃদয়গ্রাহী কথোপকথনের মাধ্যমে মানুষের মন ও অন্তরকে আকৃষ্ট করতেন| তিনি যে বছরগুলো মানুষের মাঝে -যেহেতু আমরা বিশ্বাস করি তিনি আল্লাহর ইচ্ছায় জীবিত আছেন এবং পুনরায় এ ভূপৃষ্ঠে আগমন করবেন- ছিলেন, সে সময়গুলোতে তিনি স্বীয় মনোমুগ্ধকর ও হৃদয়গ্রাহী বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষের নিকট আল্লাহর বাণীসমূহ তুলে ধরেছেন| সুতরাং হযরত ঈসার (আ.) সাথীরা এ কারণে ‘হাওয়ারী’ নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন যে, তারা সর্বক্ষণ হযরত ঈসার (আ.) সাহচর্যে ও সান্নিধ্যে কাটাতেন এবং প্রতিনিয়ত তাঁর সাথে কথোপকথনে মশগুল থাকতেন| এছাড়া হযরত ঈসা (আ.) তাদেরকে সাথে নিয়ে এবং তাদের সহযোগিতায় মানুষকে হেদায়েত ও দিকনির্দেশনা দান করতেন| এক কথায় বলা যায় যে, তারা ছিলেন হযরত ঈসার (আ.) ঘনিষ্ট সহচর ও একনিষ্ঠ সাথী|