ধর্মীয় বিধানাবলির উপর আমল না করা অন্তরের বক্রতার কারণ
মানুষ যখন ধর্মীয় বিধানাবলি অমান্য করবে এবং সেগুলোর উপর আমল করবে না, তখন তার আত্মা বক্রতার শিকার হবে। অর্থাৎ সে তার অনুধাবন ক্ষমতা হারিয়ে যাবে। আজ আমরা প্রায়ই আমাদের সমাজে লক্ষ্য করি যখন কোন হক কথা বলা হয় তখন একজন সাধারণ লোক সে কথায় প্রভাবিত হয়, বাস্তবতা অনুধাবনে সক্ষম হয় এবং তার বিবেকও সে কথার সত্যায়ন করে। কিন্তু একই হক কথা যখন অন্য একজন -অন্তরের বক্রতার শিকার- ব্যক্তির নিকট তুলে ধরা হয়, তখন তার মধ্যে কোনরূপ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটে না, বরং নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগেও এমন লোকের উপস্থিতি ছিল। এ কারণে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, এ আসমানি কিতাব কাউকে হেদায়েত আবার কাউকে পথভ্রষ্ট করে।
কুরআনের পথভ্রষ্ট করার অর্থ হচ্ছে- কুরআন পাঠ করে কিন্তু তা অনুধবন করে না; বরং এ কিতাবের আয়াত নিয়ে উপহাস করে। আর এমন অবস্থাই হচ্ছে কুরআনের পথভ্রষ্টতা। কুরআনের হেদায়েতের আলোকে অস্বীকার করার নামই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা। যদি কুরআনের বাণী তার নিকট তুলে ধরা না হত এবং সেও তা প্রত্যাখ্যান না করত, তাহলে হয়তো এ বিষয়টি তার জন্য এত ক্ষতিকারক হত না। কিন্তু পবিত্র কুরআন যেহেতু সত্য ও ন্যায়কে তার সম্মুখে উত্থাপন করেছে, অথচ সে তা অনুধাবন করে না কিংবা অনুধাবন করলেও তা প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকার করে; সেহেতু এ অবস্থাই হচ্ছে তার জন্য বিচ্যুতি ও পথভ্রষ্টতার শামিল এবং আল কুরআন -যা হেদায়েতের কিতাব- তার জন্য হয়ে উঠে গোমরাহের কারণ।
আমাদের বর্তমান সমাজও অনুরূপ; এমনটি কিভাবে সম্ভব যে, এ সত্য ও ন্যায়সঙ্গত বাণীসমূহ, আধ্যাত্মিক ও খোদায়ী দীক্ষাসমূহ, ধর্মীয় পথপ্রদর্শকদের মুখনিঃসৃত কথনসমূহ এবং সমাজ সংস্কারকদের দিকনির্দেশনাগুলো; একশ্রেণীর মানুষের অন্তরসমূহকে আন্দোলিত ও উজ্জ্বীবিত করে, তাদেরকে আল্লাহর পথে উদ্বুদ্ধ করে এবং তারা অধীর আগ্রহে সেদিকে ছুটে যায়। সৌভাগ্যক্রমে আজ আমাদের সমাজের অধিকাংশই এমন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, এ সমাজে যখন বলা হয় মিতব্যয়ী হোন! অপচয় পরিহার করুন! তখন তারা মেনে চলে, যখন বলা হয় শত্রুর মোকাবেলায় জিহাদের ময়দানে হাজির হোন! তখন সর্বশক্তি নিয়ে উপস্থিত হয়, যখন বলা হয় ইসলামি সরকারের পাশে দাঁড়ান! তখন এ বিষয়কে দায়িত্ব মনে করে, যখন বলা হয় অমুক জাতীয় বিষয়ে সবাই এগিয়ে আসুন! অমুক ক্ষেত্রে পরস্পরের পাশে দাঁড়ান! তখন সবাই অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। কিন্তু যখন একই উপদেশাবলি, দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ অপরশ্রেণীকে দেয়া হয়, তখন না সেগুলো তাদেরকে কোন রকম আকৃষ্ট করে, না তাদেরকে হেদায়েত দান করে; উপরন্তু তারা আরও একগুঁয়ে মনোভাবাপন্ন ও বিদ্বেষ পরায়ণ হয়ে উঠে। এরা এমনই বক্র মানসিকতাসম্পন্ন। কিন্তু এমনটির কারণ কি? এর নেপথ্য কারণ হচ্ছে তাদের অন্তরসমূহ বক্রতার শিকার হয়েছে। যেমনভাবে পবিত্র কুরআনে ইশারা করা হয়েছে,
অতঃপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করল তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন। ( সূরা সাফ্ফ : ৫)
অবশ্য এ বিষয়টি মনে রাখা প্রয়োজন যে, আল্লাহ শুরুতে কখনও কারও অন্তরকে রুদ্ধ করে দেন না। আল্লাহ কখনও সত্য অনুধাবন ও হিদায়েত গ্রহণের ক্ষেত্রে কারও অন্তরকে অকেজো ও অনুভূতি শুন্য করেন না। যদি এমনটি হত তাহলে সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে বন্দাদের জন্য এক ধরনের জুলুম বা অবিচার হিসেবে গণ্য হত। বরং একশ্রেণীর মানুষ নিজেরাই গুনাহ, একগুঁয়ে মনোভাব, ব্যক্তি কিংবা সমষ্টিগত স্বার্থ, সত্য ও ন্যায়কে বিবেচনা না করা, মিথ্যা অজুহাত এবং সত্যকে অস্বীকারের মনোভাব তাদের অন্তরগুলোকে কঠিন ও পাষণ্ড করে তুলে। এ কারণে সত্য তাদের অন্তরকে স্পর্শ ও প্রভাবিত করে না।