বনি ইসরাইল; আমলহীন দাবিদারের উপমা
পবিত্র কুরআনে আমলহীন তথা আমল সম্পন্ন না করে অমূলক দাবিকারীদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার পর (অর্থাৎ সূরা সাফ্ফের প্রথম দু’তিন আয়াতে কথা ও কাজের মধ্যে সমন্বয় না থাকা লোকদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করার পর) এ পর্যায়ে তাদের ঐতিহাসিক নমুনার প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। আমরা ইতোপূর্বে ইশারা করেছি যে, এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক উপমাটি হযরত মূসার (আ.) প্রতি ঈমান আনয়নকারী সম্প্রদায়ের সাথে। অর্থাৎ ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী তারা ছিল ঐ সব লোক যাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন সমন্বয় ছিল না (সাধারণত তারা যা দাবি করত তা সম্পন্ন করত না)। অবশ্য এ আয়াতে ঐ সম্প্রদায় সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ করা হয় নি, যদিও কুরআনের অন্যান্য আয়াতে বনি ইসরাইল গোত্রের লোকদের সম্পর্কে অনেক কিছুই তুলে ধরা হয়েছে। যেমন- কুরআনের সূরা আহযাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত মূসা (আ.) তার সম্প্রদায়ের লোকদের মাধ্যমে অনেক পীড়া ও যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। কুরআনে মু’মিনদের সতর্ক করে বলা হয়েছে,
“হে মু’মিনগণ! তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা মূসাকে কষ্ট দিয়েছিল; তারা যা বলেছিল আল্লাহ তা (মিথ্যা অভিযোগ) থেকে তাকে মুক্ত করেছিলেন।” এ আয়াতের আলোকে অত্র বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, বনি ইসরাইলের লোকেরা তাদের নবী হযরত মূসাকে (আ.) কষ্ট ও যন্ত্রণা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ কষ্টের ধরণ কিরূপ ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর শতভাগ নিশ্চিত করে বলা না গেলেও সামগ্রিকভাবে ধারণা করা যায় যে, তারা এমন কোন কার্যাদি সম্পন্ন করত কিংবা এমন কোন অসংলগ্ন কথাবার্তা বলত; যেগুলো তাদের ঈমানের সাথে কোনরূপ সামঞ্জস্যতা রাখত না। প্রকৃতপক্ষে মানুষ যখন মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করে তখন কিছু দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয়; যেমন- ব্যবহারিক দায়বদ্ধতা, মানসিক দায়বদ্ধতা এবং কথোপকথনের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা। যদি কেউ এ সব দায়বদ্ধতা যথাযথভাবে মেনে না চলে, তাহলে সে স্বীয় যুগের নবী কিংবা রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে। অনুরূপভাবে পবিত্র কুরআনের ক’য়েকটি আয়াতে হযরত মুহাম্মাদকে (সা.) কষ্ট দেয়া প্রসঙ্গে ইশারা করা হয়েছে; সেগুলোর মধ্যে একটিতে তিনি ছাড়াও হযরত মূসার (আ.) কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
যাইহোক, এখন আমরা এ প্রসঙ্গে বর্ণিত মূল আয়াত ও সেটির অর্থের প্রতি আলোকপাত করব- কুরআনের ভাষায়, ‘(স্মরণ কর,) মূসা যখন তার সম্প্রদায়কে বলেছিল’, ‘হে আমার সম্প্রদায়!’ অর্থাৎ হে বনি ইসরাইল গোত্র!, ‘তোমরা কেন আমাকে কষ্ট দিচ্ছ।’ অতঃপর তিনি গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘(অথচ) যখন তোমরা নিশ্চিতভাবে অবহিত আছ যে, আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল।’ অর্থাৎ এখানে যাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে তারা ছিল ঈমানদার তথা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান পোষণ করত। যেমনভাবে সূরার শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে,
“হে মু’মিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল যা তোমরা কর না?” এখানে সরাসরি মু’মিনদের প্রতি সম্বোধন করে প্রশ্ন করা হয়েছে। সুতরাং কষ্ট দেয়া, যন্ত্রনা দান কিংবা পীড়িত করার বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান পোষণকারীদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, কোন মুনাফিক বা কাফিরের মাধ্যমে নয়। আর এ কারণেই তো হযরত মূসা (আ.) স্বীয় সম্প্রদায়ের প্রতি উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কেন আমাকে কষ্ট দিচ্ছ যখন তোমরা নিশ্চিত জান যে, আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল।”