ইসলামের মৌলিক নীতিগুলোর মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা (আদল) হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোর একটি। ন্যায় কেবল ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের প্রতিটি স্তরে সুবিচার নিশ্চিত করে। ন্যায়পরায়ণতা হলো এই মর্মে বিশ্বাস করা যে, প্রতিটি মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার এবং সমান সম্মান পাওয়ার দাবিদার, তা সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম, ধনী হোক বা গরীব।
আহলে বাইত (আঃ)-এর ইমামগণ ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন, আর এর সর্বশ্রেষ্ঠ ও করুণাময় দৃষ্টান্ত হলেন ইমাম আল-হুসাইন ইবনে আলী (আঃ)। কারবালার ঘটনা ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের এক অমর ইতিহাস।
কুরআন শরীফে ন্যায়ের নির্দেশ
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে কঠোরভাবে ন্যায়ের আদেশ দিয়েছেন:
“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা, সদ্ব্যবহার এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন..”— সূরা আন-নাহল (১৬:৯০)
অন্যত্র, আল্লাহ মুমিনদেরকে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সাহসিকতার সাথে সাক্ষ্য দিতে বলেছেন, এমনকি তা নিজেদের বা পরিবারের বিরুদ্ধে গেলেও:
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়বিচারের সাক্ষ্যদানে দৃঢ় থাকবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতামাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে যায়..”— সূরা নিসা (৪:১৩৫)
ইমাম আল-হুসাইন (আঃ)-এর ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম
ইমাম আল-হুসাইন (আঃ)-এর সংগ্রাম ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক বিপ্লবী আন্দোলন। তিনি অত্যাচারী শাসকের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কারণ সেই শাসক সমাজের মৌলিক মানবিক অধিকার ও ইসলামী নীতিকে পদদলিত করছিল।
ইমাম (আঃ) তাঁর এই সংগ্রামের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন:
“আমি কেবল আমার নানা রাসূল (সাঃ)-এর উম্মতের সংশোধনের জন্য বেরিয়েছি। আমি চাই ভালো কাজের আদেশ দিতে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতে, এবং আমার নানা ও আমার বাবা আলীর পথ অনুসরণ করতে।” [উৎস: মাকতাল আল-হুসাইন]
এই বাণীটি দেখায় যে, ন্যায় কেবল ব্যক্তিগত ধার্মিকতা নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ব। যখন সমাজে অন্যায় ও অবিচার ছড়িয়ে পড়ে, তখন মুমিনের কর্তব্য হলো সর্বশক্তি দিয়ে তার প্রতিবাদ করা।
আহলে বাইত (আঃ)-এর শিক্ষায় আদল
আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আঃ) ন্যায়পরায়ণতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কাছে, ন্যায়বিচার ছিল জীবনের মূল কেন্দ্র।
তিনি বলেছেন: “ন্যায় হলো সেই ভিত্তি, যা দ্বারা দুনিয়ার ইমারত দাঁড়িয়ে থাকে।” [উৎস: নাহজুল বালাগা (সংক্ষেপিত)]
অর্থাৎ, কোনো সমাজই টিকে থাকতে পারে না যদি সেখানে ন্যায় না থাকে। ন্যায়পরায়ণতা মুমিনকে শেখায় যে, সকল মানুষের প্রতি সমান আচরণ করা, তাদের অধিকার দেওয়া এবং দুর্বলদের পক্ষে দাঁড়ানো—এটাই হলো আল্লাহর কাছে প্রিয় কাজ।
ইমাম আল-হুসাইন (আঃ)-এর জীবন ও আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে যে, একজন মুমিন কখনোই অন্যায় ও জুলুমের সাথে আপোষ করতে পারে না। ন্যায়পরায়ণতা (আদল) হলো আল্লাহর দেওয়া একটি পবিত্র আমানত, যা সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা এনে দেয়। আহলে বাইত (আঃ)-এর আদর্শ অনুসরণ করে, আমাদের উচিত সর্বদা নিজের জীবনে, পরিবারে এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট থাকা।
সংকলন : ইয়াসিন/ ফজর