মানসিক ব্যাধি ও অসার দাবিসমূহের কিছু উপমা
মানুষ ও সমাজ উভয়ই এমন ব্যাধিতে আক্রান্ত। যদিও নিজেরা মানসিক রোগ-ব্যাধিতে নিমজ্জিত কিন্তু তবুও সেদিকে মোটেও মনোযোগ নেই। বরং এ সব রোগ-ব্যাধি নিয়ে নিন্দা ও সমালোচনা করে থাকে। যেমনভাবে আমরা পূর্বের আলোচনায় কপটতার উদাহরণ তুলে ধরেছি; যা একটি বিশাল ও বিস্তীর্ণ উপমা। এখন খুবই সাধারণ কিছু উপমা যা সচরাচর আমাদের চারপাশে ঘটে থাকে; সেগুলোর মধ্য থেকে কিছু এখানে তুলে ধরব। যেমন- কখনও কখনও আমাদের কোন বন্ধু যদি আমাদের নিকট এমন প্রশ্ন করে- আপনি কি অমুক কথা বলেছেন? তখন সে যাতে অসন্তুষ্ট না হয় সে জন্য আমরা বলি- না ভাই আমি এমন কিছু বলি নি। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে আপনি কি ঐ কাজটি করবেন? অমুক স্থানে যাবেন? এমতাবস্থায় যদি আমরা চাই বিষয়টি তাকে বুঝতে দিব না; তাহলে বলি- না, যাব না। কিন্তু বাস্তবে সেখানে যাব। অথচ তাকে বলছি যে, যাব না! কিংবা আলাপচারিতার ক্ষেত্রে কোন বিশেষ ঘটনা বর্ণনার সময়, উদাহরণস্বরূপ- আমরা বৈঠক অথবা কোন অনুষ্ঠানে বসে আছি, অনুষ্ঠানে উষ্ণতা ছড়াতে ও অন্যদের মনোযোগ আকৃষ্টের নিমিত্তে উক্ত ঘটনাকে রংচং লাগিয়ে এবং সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরছি। মনে করুন, আমি কিছু ইচ্ছা করেছি এবং কোন কাজ সম্পাদনের জন্য মনঃস্থ করেছি; কেউ আমাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে উত্তরে বলছি- না আমি সে কাজটি করছি না। অথচ আমি সে কাজটি সম্পন্ন করছি এবং এক্ষেত্রে আমার একটুও অন্তর কাঁপছে না যে, ইসলাম ধর্মে যে মিথ্যাকে এতই গর্হিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে আমি সে মিথ্যাটিই বলছি। যেহেতু পবিত্র কুরআনের আয়াত ও রেওয়ায়েতসমূহে যে মিথ্যাকে এতো কঠোর ভাষায় তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করা হয়েছে, আমিও তো একই পদ্ধতিতে ও একই ভঙ্গিতে সে মিথ্যারই পুনরাবৃত্তি করেছি; সেহেতু সে মিথ্যা বলার অপরাধে তো অনুরূপ তিরস্কার ও ভর্ৎসনা আমার উপরও বর্তাবে। মনে করুন, আমাদের বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতিতে মানুষ যখন পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার তীব্র প্রয়োজন অনুভব করে, তখন কয়েক বস্তা চাল, কিছু পরিমাণ তেল ও খাদ্যদ্রব্য এবং অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি -বাজারে যেগুলোর তীব্র সংকট রয়েছে, ঘটনাক্রমে বর্তমানে সে সব দ্রব্যাদির তেমন কোন প্রয়োজন আমার নেই, কিন্তু অন্যান্য মানুষের তীব্র প্রয়োজন রয়েছে- এনে আমি আমার বাড়ীতে গুদামজাত করে রাখছি। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে তবে বলছি যে, আমার প্রয়োজন রয়েছে (যা আদৌ সত্য নয়)। অথচ বর্তমানে সেগুলোর কোন প্রয়োজন আমার নেই। হয়তো ৬ মাস কিংবা তারও পরে ঐ সব দ্রব্যাদির প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এখনই সেগুলো গুদামজাত করে রাখছি। সমাজের মানুষের তীব্র প্রয়োজনের কথা বিবেচনা না করেই আমি স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের মাধ্যমে এভাবে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছি। ‘অন্যের জন্য তাই পছন্দ কর যা নিজের জন্যেও পছন্দ কর’ এমনটি হচ্ছে মু’মিনের অন্যতম পরিচয়। কিন্তু আমি সমাজের মানুষের তীব্র চাহিদার কথা বিবেচনা না করে প্রকৃত মু’মিন হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছি। হয়তো সমাজের মানুষ আমার আসল পরিচয় বুঝতে না পেরে আমাকে মু’মিন ব্যক্তি মনে করবে, আমার সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করবে, আমাকে বিপ্লবী ভাবতে পারে কিংবা আল্লাহর পথে নিবেদিতপ্রাণ একজন মুজাহিদও মনে করতে পারে। অথচ প্রকৃত অবস্থা ভিন্ন রকম।
মনে করুন, কেউ বেচাকেনার সময় ওজনে কম দিচ্ছে কিংবা বেশি দামে বিক্রি করছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সে উদাসীন; অর্থাৎ এ কাজটি যে একটি অন্যায় ও অপরাধ হিসেবে গণ্য, সেদিকে তার কোন মনোযোগ নেই। ইসলাম ধর্মে এ ধরনের কাজকে কতই জঘন্য ও নিন্দনীয় কাজ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে এবং এ সম্পর্কে প্রচুর হাদীস ও রেওয়ায়েতও বর্ণিত হয়েছে। একজন পরনিন্দা ও পরচর্চায় লিপ্ত রয়েছে, কিন্তু এদিকে তার কোন মনোযোগ নেই যে, এ কাজটি হচ্ছে ‘গীবত’; ইসলামে যে কাজকে ব্যভিচারের চেয়েও জঘন্যতম গুনাহ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কিংবা একজন পরশ্রীকাতর ও অন্যের অমঙ্গল কামনা করে, অন্যদের সম্পর্কে কুধারণা পোষণ করে, মনে মনে অন্যদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। কিন্তু এদিকে তার কোন মনোযোগ নেই যে, এমন মানসিকতা হচ্ছে আত্মঅহমিকার অন্তর্ভুক্ত; ইসলামে যা বিশেষভাবে পরিত্যাজ্য। এ ধরনের মানসিকতার কারণে মানুষের ঈমান বিনষ্ট হয় এবং ঈমানের স্তর থেকে তার বিচ্যুতি ঘটে। অর্থাৎ তারা এ ধরনের নানাবিধ মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত; কিন্তু এ সেদিকে তাদের কোন মনোযোগ নেই।
সমাজের এমন কিছু লোক রয়েছে যারা তাদের সমাজের অনেক গোপন কথা কিংবা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি অন্যদের নিকট ফাঁস করে দেয়। কিন্তু এদিকে তাদের কোন দৃষ্টি নেই যে, এভাবে নিজেদের গোপন রহস্য অন্যদের নিকট ফাঁস করা হচ্ছে এক ধরনের গুপ্তচরবৃত্তি। যখন তাদেরকে বলা হয় কেন এভাবে গুপ্তচরবৃত্তি করছেন? তখন তারা বিস্ময়বোধ করে বলে কোথায় গুপ্তচরবৃত্তি করছি? কিন্তু তাদের হয়তো জানা নেই যে, মুসলিম সমাজের কোন গোপন তথ্য কিংবা নিজেদের সম্প্রদায়, কর্মস্থল, দেশ ও জাতির কোন গোপন বিষয়াদি যদি যার-তার কাছে প্রকাশ করা হয়, তাহলে তা পর্যায়ক্রমে শত্রুদের কাছে পৌঁছে যেতে পারে এবং এর মাধ্যমে সবাই সমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। আর এ কাজটি এক ধরনের গুপ্তচরবৃত্তির পর্যায়ে পড়ে। অবশ্য পরিণতিতে বড় ধরনের গুপ্তচরবৃত্তিও এমন লোকদের মাধ্যমেই ঘটে থাকে। তারা মুসলিম সমাজ ও সরকারের অনেক স্পর্শকাতর ও গোপন তথ্য দু’তিন হাত বদলের মাধ্যমের শত্রুদের কাছে পৌঁছে দেয়। কিন্তু হয়তো এক্ষেত্রে তাদের মনোযোগ নেই যে, তাদের এহেন কাজগুলোই হচ্ছে গুপ্তচরবৃত্তি।
সুতরাং মানুষ কখনও কখনও বিশেষ কোন ক্ষেত্রে দূর্যোগ ও ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে কিন্তু সে তা বুঝতে পারে না। যে ব্যাধি ও মুসিবাত সম্পর্কে সে বই-পুস্তকে পড়েছে কিংবা ওয়াজ-নসিহতে শুনেছে। এমনকি এমন ব্যাধির কারণে বহুবার অন্যদেরকে তিরস্কারও করেছে। এমন অবস্থায় এক উদ্বেগের দীর্ঘশ্বাস নেয়া উচিত; যে দীর্ঘশ্বাস সম্পর্কে আলোচ্য সূরাতে ইশারা করা হয়েছে। মনে করুন, যদি কাউকে বলা হয় চল জিহাদের ময়দানে যাই; তাহলে সে হয়তো বলবে এখন সম্ভব না আমার কাজ আছে। যদি তাগিদ করে বলা হয়- কেন যাবে না? কেন অবহেলা করছ? কেন উদাসীনতা প্রদর্শন করছ? চল, তোমার যাবার প্রয়োজন। হয়তো এমন তাগিদের কারণে সে যাবে, কিন্তু মাত্র ক’দিন পরেই আবার ফিরে আসবে কিংবা সেখানে মারা যাবে। যুদ্ধের উত্তেজনাকর মুহুর্তে হয়তো পালিয়ে আসবে কিংবা শত্রুর মোকাবেলায় কোন ভূমিকা না নিয়েই যুদ্ধক্ষেত্র হতে দূরে সরে যাবে। কিন্তু তার জানা নেই যে, শত্রæর মোকাবেলা না করে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য কিংবা মুনাফেকী (নিফাক) ও কপটতার পরিচয়; যা বড় ধরনের মানসিক ব্যাধি হিসেবে বিবেচিত। অথচ সেই আবার এক সময় বলে বেড়াতো যে, আমি জিহাদের ময়দানে যাব, শত্রুদের ছিন্নভিন্ন করে ফেলব। আর বাস্তবে যখন শত্রুর মোকাবেলায় যুদ্ধক্ষেত্রে গমণ করেছে, তখন কিছু অস্ত্রশস্ত্রের ঝনঝনানির শব্দ শুনে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে এসেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে তার কোন খেয়াল নেই যে, এমন কাজ যদি অন্য কেউ করত এবং সে যদি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে অবস্থান করত, তাহলে তাকে কতইনা তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করত। আর আজ সে নিজেই একই অপরাধে অপরাধী। অনেকে আছে অনবরতভাবে বলতে থাকে- যুদ্ধে যাও শত্রুর বিরুদ্ধে মোকাবেলা কর, তোমাদের স্বজনদের ও পরিচিতদেরকেও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ কর। একই কথা তার আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদেরকেও বলতে থাকে। যারা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রæদের মোকাবেলায় নিয়োজিত তাদের প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে। কর্মস্থল কিংবা যেখানে-সেখানে তাদের বীরত্ব নিয়ে আলোচনায় মত্ত থাকে। কিন্তু এতদসত্তে¡ও তারা নিজেরা যুদ্ধক্ষেত্রে শরিক হয় না। যখন জিজ্ঞাসা করা হয় কেন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হন না? জবাবে বলে আমার অনেক কর্মব্যস্ততা রয়েছে। তাদের সন্তানদেরকেও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করে না। এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে উত্তরে বলে- আমার সন্তান এখনো পড়াশুনায় ব্যস্ত। অথচ তাদের এক্ষেত্রে কোন খেয়াল নেই যে, এমন আচরণ হচ্ছে কুরআনের সেই আয়াতেরই বাস্তব নমুনা- ‘কেন তোমরা এমন কথা বল যা তোমরা সম্পন্ন কর না?’ এটা কিভাবে সম্ভব যে, জিহাদ কিংবা মৃত্যু শুধু অন্যদের জন্যই কাম্য হবে? শুধু অন্যদেরকে বলা হবে আপনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যান এবং যখন তারা সেখানে শত্রুদের মোকাবেলায় বীরত্ব প্রদর্শন করবে, তাদের প্রশংসা করা হবে কিন্তু নিজেরা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে। এ অবস্থা কি আদৌ যুক্তিসঙ্গত? বরং আপনি সেখানে যান, উপস্থিত হয়ে শত্রুদের মোকাবেলা করেন। এখন যদি ধরে নিই যে, আপনি এক্ষেত্রে অপরাগ কিংবা অনিবার্য কোন কারণে উপস্থিত হতে পারছেন না; তবে কেন নিজের সন্তানাদি, ভাই-ভাতিজা কিংবা নিকটাত্মীয়দের সেখানে যেতে উৎসাহিত করছেন না? অর্থাৎ মানুষ সাধারণত নিজেরা কোন বিষম দুর্দৈবে নিমজ্জিত থাকা সত্তে ও সেদিকে কোন খেয়াল থাকে না। অথচ একই দুর্দৈব বা মন্দ অবস্থার জন্য সে অন্যদের প্রতি তিরস্কার করেছে অথবা কেউ তার নিকট বর্ণনা করলে সে তা সত্যায়ন করেছে। কাজেই এমন দ্বিমুখী অবস্থান এক ধরনের মানসিক ব্যাধি হিসেবে গণ্য। এ কারণে সূরা সাফ্ফের আলোচ্য দু’টি আয়াতে অত্যন্ত কড়া ভাষাতে এমন দ্বিমুখী অবস্থানের তিরস্কার করা হয়েছে। সুতরাং ‘বলা কিন্তু না করা’ যে এক ধরনের জটিল মানসিক ব্যাধি সে বিষয়ে মানুষের উচিত মনোনিবেশ করা ও সজাগ থাকা।