ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মহান ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের ত্যাগ ও অবদান ছাড়া সত্যের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যেত। হযরত যায়নাব বিনতে আলী (সালামুল্লাহি আলাইহা) তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন হযরত আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর কন্যা, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্রী এবং ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বোন। কারবালার ময়দানে তিনি তরবারি হাতে যুদ্ধ করেননি; কিন্তু তাঁর ঈমান, ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ঐতিহাসিক ভাষণ ইয়াজিদের বিজয়কে পরাজয়ে পরিণত করে। তাই বলা হয়, কারবালার বিপ্লব আশুরায় শুরু হলেও তার বার্তা বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছেন হযরত যায়নাব (সা.আ.)।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন- “তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হও, তবে তোমরাই বিজয়ী হবে।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৯)
এই আয়াতের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ছিলেন হযরত যায়নাব (সা.আ.)। কারবালায় নিজের ভাই, ভাতিজা, স্বজন ও সঙ্গীদের শাহাদাত প্রত্যক্ষ করার পরও তিনি সত্যের পথ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বিচ্যূত হননি। বন্দিত্বের শৃঙ্খলেও তাঁর কণ্ঠ ছিল দৃঢ়, হৃদয় ছিল আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আস্থায় উজ্জ্বল।
আশুরার পর যখন বন্দিদের কুফা ও দামেস্কে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন হযরত যায়নাব (সা.) এমন সব ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন, যা ইসলামের প্রকৃত চেহারা মানুষের সামনে তুলে ধরে। কুফাবাসীর উদ্দেশে তিনি তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও ইমাম হুসাইন (আ.)-কে একা ফেলে দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করেন। পরে ইয়াজিদের দরবারে তিনি নির্ভীক ভাষায় ঘোষণা করেন যে, ক্ষমতার জোরে সত্যকে কখনো মুছে ফেলা যায় না। তাঁর সেই অমর ঘোষণা আজও ইতিহাসে প্রতিধ্বনিত হয় “তুমি তোমার সব চেষ্টা করো; আল্লাহর শপথ! আমাদের স্মৃতি ও আমাদের ওহির বার্তা কখনো মুছে ফেলতে পারবে না।” সূত্র: আল-ইরশাদ, শাইখ আল-মুফিদ; বিহারুল আনওয়ার, খ- ৪৫ (কারবালা ও বন্দিত্ব-সংক্রান্ত অধ্যায়সমূহ)।
হযরত যায়নাব (সা.)-এর ধৈর্যের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে সেই বিখ্যাত উক্তিতে, যখন ইবনু জিয়াদ তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আল্লাহ তোমার পরিবারের সঙ্গে কী করেছেন?” তিনি উত্তরে বলেন: “আমি তো সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছুই দেখিনি।” সূত্র:আল-ইরশাদ; বিহারুল আনওয়ার, খ- ৪৫।
এই সংক্ষিপ্ত উত্তর শুধু ধৈর্যের নয়; বরং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি পূর্ণ সন্তুষ্টি, শাহাদাতের মর্যাদা এবং সত্যের বিজয়ের প্রতি অবিচল বিশ্বাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
পবিত্র কুরআনে আরও বলা হয়েছে “নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের প্রতিদান অগণিতভাবে প্রদান করা হবে।” সূরা আয-যুমার, আয়াত ১০
হযরত যায়নাব (সা.আ.)-এর সমগ্র জীবন এই আয়াতের বাস্তব ব্যাখ্যা। তিনি শুধু নিজের শোক বহন করেননি; বরং অসুস্থ ইমাম সাজ্জাদ (আ.), নারী ও শিশুদের রক্ষা করেছেন, তাদের সাহস যুগিয়েছেন এবং ইমামতের ধারাবাহিকতা সংরক্ষণে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। যদি তাঁর দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা ও সাহসী অবস্থান না থাকত, তবে কারবালার প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে যেত।
আজকের সমাজে সত্য কথা বলতে অনেকেই ভয় পান, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকাকে নিরাপদ মনে করেন। হযরত যায়নাব (সা.আ.) আমাদের শিক্ষা দেন ঈমানদার কখনো জুলুমের সামনে মাথা নত করে না। ধৈর্য মানে অন্যায় মেনে নেওয়া নয়; বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো। তাঁর জীবন মুসলিম নারীদের জন্য যেমন আদর্শ, তেমনি প্রতিটি ঈমানদার নারী-পুরুষের জন্য সাহস, প্রজ্ঞা, মর্যাদা ও দায়িত্ববোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কারবালার শহীদদের রক্ত ইসলামের প্রাণকে রক্ষা করেছে, আর হযরত যায়নাব (সা.)-এর ভাষণ সেই রক্তের বার্তা যুগে যুগে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। তাই তাঁকে যথার্থই ‘কারবালার বার্তাবাহক’ বলা হয়। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখি সত্যের পথে অবিচল থাকা, বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে জ্ঞান ও সাহসের সঙ্গে কথা বলাই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হযরত যায়নাব (সা.আ.)-এর ঈমান, ধৈর্য ও সত্যনিষ্ঠা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন।
19
