হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল মূল আযানের অংশ

হুজ্জাতুল ইসলাম মো. আলী মোর্ত্তজা

আযান ও ইকামতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, حَىَّ عَلى خَیْرِالْعَمَلِ (হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল) আযানের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। মহানবী হযরত মুহাম্মাদের (সা.) যুগে এবং তাঁর ওফাতের পরও এই আযান অব্যহত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিশেষ কিছু কারণে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল বাক্যটি আযান থেকে বাদ পড়ে যায়। নিম্নে কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হল:

  • ক) সাইয়্যেদ মুর্তাযা বলেন: আহলে সুন্নতের আলেমগণ বর্ণনা করেছেন যে, মহানবীর রেসালাতের যুগে আযানে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল বলা হত কিন্তু পরবর্তীতে তা বাদ দেয়া হয়। (আল ইন্তেসার পৃ: ১৩৭)
  • খ) ইবনে আরাবি তার ফুতুহাত গ্রন্থে বলেছেন: খন্দকের যুদ্ধের পূর্বে যখন খন্দক খনন করা হচ্ছিল তখন এক সাহাবা আযানের সময় আযানে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল বাক্যটি ব্যবহার করেন। এরপর থেকে সেটা আযানের অংশ হিসাবেই পরিগণিত হত। (ফুতুহাতে মাক্কিয়াহ ১ম খণ্ড, পৃ: ৪০০)
  • গ) শারাফুদ্দিন, যিনি সিয়াগি নামে পরিচিত তিনি তার রাওযাতুন নাযির গ্রন্থে বলেন: এটাই সত্য এবং সঠিক যে, শুরু থেকেই আযানে حَىَّ عَلى خَیْرِالْعَمَلِ বাক্যটি ছিল। এছাড়াও সকলেই এই বিষয়ে একমত পোষণ করেন যে, খন্দকের যুদ্ধের সময়ে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল আযানের অংশ ছিল। (রাওযাতুন নাযার ১ম খণ্ড, পৃ: ৫৪২)
  • ঘ) আহলে বাইত মতাদর্শে বিশ্বাসী ইমামিয়া, যাইদি এবং ইসমাইলি শিয়াদের সকলেই হাইয়্যা আলা খাইরিল আমালকে আযানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবেই বিশ্বাস করে। (হাফেয আলাভীর আযান গ্রন্থ)
  • ঙ) হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল যে আযানের অংশ এই সম্পর্কে আহলে সুন্নত মতাদর্শ থেকে দু’টি হাদিস:

১। মুত্তাকি হিন্দি তার কাঞ্জুল উম্মাল গ্রন্থে মো’জামে তাবারানি থেকে বর্ণনা করেছেন:
کان بلال یوذن بالصبح فیقول: حَىَّ عَلى خَیْرِالْعَمَلِ
বেলাল (রা.) সর্বদা ফজরের নামাজের আযানে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল বলতেন। (কাঞ্জুল উম্মাল পৃ: ৩৪২)

২। হাফেয আলাভী যাইদি তার আযান গ্রন্থে সাহাবী আবি মাহযুরার সূত্রে মহানবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তাকে আযান শিক্ষা দেন এবং তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল। (আযানে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল, পৃ: ২৭)

সিরাত গ্রন্থ লেখকদের সকলেই ঐকমত্য পোষণ করে বলেছেন যে, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) হুনাইন যুদ্ধের পর আবি মাহযুরা নামক এক সাহাবাকে আযান শিক্ষা দেন যার মধ্যে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল বাক্যটি ছিল। (মুসনাদে আহমাদ ৩য় খণ্ড, পৃ: ৪০৮)

এটা থেকে বোঝা যায় যে, যেদিন থেকে আযান শুরু হয় সেদিন থেকেই আযানে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল বাক্যটি আযানের অংশ হিসাবেই ছিল।

এই সকল বর্ণনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মহানবীর যুগে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল বাক্যটি আযানের অংশ ছিল।
দু’টি অত্যন্ত গবেষণামূলক গ্রন্থ যার প্রথমটি হচ্ছে আল আযান বেহাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল লেখক, হাফেয আলাভী যাইদ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে আল এতেসাম বেহাবলিল্লাহ লেখক, কাসিম বিন মুহাম্মাদ যাইদী। এই দুই গ্রন্থের লেখকগণ সাহাবা এবং তাবেঈনদের থেকে বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন যারা সকলেই আযান ও ইকামতে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল বলতেন। এখানে তাদের সবার নাম উল্লেখ করা সম্ভব নয়, তাই যারা বিস্তারিত জানতে চান তারা উপরোক্ত দুটি গ্রন্থ অধ্যায়ন করতে পারেন।

সুতরাং হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল যে আযানের অংশ তাতে বিন্দুমাত্র কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। বরং যারা এটাকে আযান থেকে বাদ দিয়েছেন তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করতে হবে যে, কেন তারা এই কাজটি করেছেন? পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, কিছু ব্যক্তি তাদের অবৈধ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য হাইয়্যা আলা খাইরিল আমালকে আযান থেকে বাদ দিয়েছে।

হাফেয আলাভী তার আল আযান বেহাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল গ্রন্থে হাসান বিন ইয়াহিয়া বিন হাসান বিন যাইদ বিন আলী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, মহানবীর (সা.) আহলে বাইতের সকলেই হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল যে আযানের অংশ সে বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। এবং আবু বকরের (রা.) যুগেও মুয়াযযিনগণ হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল সহকারে আযান দিতেন।

আর এর স্থানটি ছিল হাইয়্যা আলাল ফালাহর পর। কিন্তু যখন ওমর (রা.) খেলাফত গ্রহণ করেন তখন তিনি বলেন:
دعوا حَىَّ عَلى خَیْرِالْعَمَلِ لئلا يشتغل الناس عن الجهاد فكان أوّل من تركها
হাইয়্যা আলা খাইরিল আমালকে আযান থেকে বাদ দাও। কেননা নামায সর্বোত্তম আমল এই অজুহাতে জনগণ জিহাদকে পরিত্যাগ করবে। আর ওমরই (রা.) সর্বপ্রথম ব্যক্তি ছিলেন যিনি, আযান থেকে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমালকে বাদ দিয়েছিলেন। (আযানে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল পৃ: ২৯)

প্রসিদ্ধ ও প্রখ্যাত গবেষক সাদ উদ্দিন তাফতাযানি তার শারহে মাকাসেদ গ্রন্থে এবং প্রখ্যাত কালামশাস্ত্রবিদ আলাউদ্দিন কুশজি বলেন:
ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) তিনটি জিনিস সম্পর্কে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন: এই তিনটি জিনিস হযরত মুহাম্মাদের (সা.) সময়ে প্রতিষ্ঠিত হালাল ও বৈধ কাজ ছিল আমি এ তিনিটি জিনিসকে হারাম ও অবৈধ ঘোষণা করছি। যদি কেউ তা করে তাকে কঠিন শাস্তি দেব, আর তা হল: ১। মুতাহ বিবাহ, ২। তামাত্তু হজ এবং ৩। আযানে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল (حَىَّ عَلى خَیْرِالْعَمَلِ) বলা। (কুশজি প্রণিত শারহে মাকাসেদ এবং শারহে তাজরিদ গ্রন্থ)

হযরত ওমর (রা.) প্রবর্তিত এই বিদয়াতকে প্রতিষ্ঠত করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না তাই সব সময়ই এর বিরোধীতা হত এবং এখনও হচ্ছে। আর এজন্যই অনেক সাহাবা ওমরের (রা.) নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আযানে হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল বলতেন।

বোরহানুদ্দিন হালাবি তার সিরাত গ্রন্থে লিখেছেন: আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর এবং হযরত হুসাইন ইবনে আলী (ইমাম যাইনুল আবেদীন) তাদের আযানে হাইয়্যা আলাল ফালাহর (حَيّ على الفلاح) পর হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল (حَىَّ عَلى خَیْرِالْعَمَلِ) বলতেন। (সিরাতুল হালাবি ২য় খণ্ড, পৃ: ৩০৫)

আলাভিদের আন্দোলনে ইমাম হাসানের বংশের হুসাইন ইবনে আলী ইবনে হাসান (সাহেবে ফাখ) যখন মদিনা বিজয় করেন তখন আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান আফতাস মসজিদে নববীর মিনারে উঠে আযান দেন এবং সেখানে হাইয়্যা আলাল ফালাহর (حَيّ على الفلاح) পর হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল (حَىَّ عَلى خَیْرِالْعَمَلِ) বলেন। (আবুল ফারাজ ইস্পাহানি প্রণিত, মাকাতেলুত তালেবিন গ্রন্থ পৃ: ৪৪৬)####

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More