পিতা মাতার অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে আল কোরআন ও মাসুম (আঃ)গণের দৃষ্টিভঙ্গি

অনুবাদঃ মোঃ কবির হোসাইন

মানবাধিকার সংরক্ষণ করা বা তাদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা একটি ধর্মীয় দায়িত্বের আওতাভূক্ত। যাকে পবিত্র ইসলামও ফরজ কাজ বলে উল্লেখ করেছে। তন্মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পিতা মাতার প্রকৃত অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের সাথে উত্তম আচরণ বা ব্যবহার করা। চাই পিতা-মাতা জীবিত থাকুক বা মৃত, ভাল হোক বা মন্দ সর্বক্ষেত্রে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ও তাদের দৈনন্দিন চাহিদা, প্রয়োজন মিটানোর বিষয়টি পবিত্র ইসলাম ধর্মে এতই তাৎপর্যবহন করে যে, আল্লাহ রাববুল আলামীন পবিত্র ও শাশ্বত কিতাব কোরআনে এ প্রসঙ্গে দু’টি স্থানে তা উল্লেখ করেছেন। এমনকি তাঁর ইবাদত করার পরক্ষণে পিতা মাতার সাথে নেক আচরণ করার প্রতি তাকিদ দিয়েছেন।

আল্লাহ রাববুল আলামীন তাঁর শাশ্বত অলৌকিক ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআনে বলেন, “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত কর না এবং পিতা মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর। তাদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয় তখন তাদেরকে “উফ” (বিরক্তি, উপেক্ষা, অবজ্ঞা, ক্রোধ ও ঘৃণাসূচক কোন কথা বলিও না) পর্যন্ত বল না। এবং তাদেরকে ধমক দিও না। তাদের সাথে সম্মানসূচক নম্র কথা বল। মমতাবশে তাদের প্রতি নম্রতার অবনমিত করো এবং বল, “হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিল।” (সুরা বানী ইসরাঈলঃ ২৩-২৪)

আমাদের মজলুম ইমাম হযরত জয়নুল আবেদীন (আঃ) এ প্রসঙ্গে একটি দিক নির্দেশনা দিয়েছেন । তিনি (আঃ) বলেন, “মাতার প্রতি তোমাদের যে হক্ক রয়েছে তা জানা জরুরী। তিনি তোমাকে এমন স্থানে রেখেছেন এবং তোমাকে এমনভাবে বহন করে চলেছেন যেখানে অন্য কেউ তা করতে পারে না। তিনি তোমাকে তার আত্মার ফল থেকে এমন জিনিস ভক্ষণ করিয়েছেন যা অন্যকে কেউ খাওয়ায় না। তিনি তার হাত, পা, চক্ষু, কান এমনকি সমস্ত বদন দ্বারা তোমার হেফাজত করেছেন এবং গর্ভকালীন সময়ে তিক্ত কথা, সীমাহীন ব্যথা যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। আর এক পর্যায়ে তোমার প্রতিপালক তোমাকে তার থেকে পৃথক করে এ ধারায় পাঠালেন। আর তোমরা জেনে রাখ যে, তোমাদের পিতার উপরও তোমাদের হক্ক রয়েছে। কেননা, তিনিই হলেন মূল শিকড় আর তোমরা তার শাখা প্রশাখা। যদি তিনি না হতেন তাহলে তোমরাও হতে না বা তোমাদের অস্তিত্ব থাকত না। তোমরা তোমাদের ভিতর যে নেয়ামত লক্ষ্য করছো তা একমাত্র পিতার বদৌলতে। তাই মহামহীম আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া জ্ঞাপনের সাথে সাথে তাঁর (পিতার) শুকরিয়াও আদায় কর এবং তাকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন কর।” (সূত্রঃ তুহ্ফুল উকুল, পৃঃ ১৮৯)

উক্ত কথাগুলোর মাধ্যমে ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) পিতামাতার প্রতি গুরুত্ব দেয়া ও তাদের মূল্যায়ন করার বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। পাশাপাশি তাদের শুকরিয়া আদায় করার নির্দেশও দিয়েছেন। এতদ্ব্যতীত উক্ত বক্তব্যে আরেকটি বিষয় সুস্পষ্ট হয় যে, আমরা যদি সারা জীবনও পিতা মাতার খেদমত করতে থাকি তবুও তাদের অবদান ও অনুগ্রহের বিন্দুমাত্র আদায় করতে সক্ষম হব না।

পিতামাতার অধিকার সম্পর্কে মাসুম (আঃ)গণের বক্তব্যঃ

পুনরায় আমরা মাসুম (আঃ)গণের বক্তব্য তুলে ধরব যাতে এ মহান দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাদের বক্তব্য উপদেশবাণী আমাদের জন্য পথের দিশারী হতে পারে । জনৈক ব্যক্তি হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে কিছু উপদেশ নসিহত করতে বলেন। তিনি (সাঃ) বলেন, “তুমি তোমার পিতামাতার আনুগত্য করে চলো এবং তাদের সাথে সর্বোত্তম ব্যবহার কর চাই তারা জীবিত হোক বা মৃত।” (সূত্রঃ উসুলে কাফি, খঃ ১২৬, পৃঃ ২)

মানসুর বিন জাযাম বলেন, আমি ইমাম সাদিক (আঃ) এর কাছে উপস্থিত হয়ে আরজ করলাম, মাওলা বলুন, কোন আমলটির অধিক বেশি কদর ও মর্যাদা রয়েছে? তিনি (আঃ) প্রত্ত্যুতরে বলেন, প্রথম ওয়াক্তে নামাজ আদায় করা, পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (সূত্রঃ আল ফাইয়া, পৃঃ ১২৭)

এক ব্যক্তি পয়গাম্বর (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করতে এসে বলেন, “হে আল্লাহর নবী (সাঃ)! আমি মুসলমান হওয়ার জন্য আমার প্রিয় জন্মভূমি, পিতা-মাতা সকলকে ত্যাগ করে এসেছি; কিন্তু যখন আমি সফরের মালামাল বেঁধে তৈরী হচ্ছিলাম তখন আমার পিতা-মাতা সন্তানের বিয়োগ বেদনায় কান্নাকাটি করছিলেন। এ কথা শ্রবণ করা মাত্র মহানবী (সাঃ) বলেন, তুমি ফিরে যাও এবং পিতামাতাকে রাজি খুশি করে আমার কাছে আস। লোকটি মহানবী (সাঃ) এর নির্দেশের উপর পুঙ্খানুপুঙ্খ আমল করেন।” (সূত্রঃ মুসতাদরুকুল ওয়াসায়েল, খঃ ২, পৃঃ ৬২৭)

মহানবী (সাঃ) ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি পিতা মাতার সন্তুষ্টির মাঝে নিহিত এবং আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টি পিতা মাতার অসন্তুষ্টি হওয়ার মাঝে। (মুসতাদরুকুল ওয়াসায়েল, খঃ ২, পৃঃ ৬২৭)

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) থেকে বর্ণিত যে, একদিন হযরত মুসা (আঃ) নিজের এক শহীদ বন্ধুর পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ রাবক্ষুল আলামীনের কাছে জানতে চাইলেন। আল্লাহ রাবক্ষুল আলামীন তাঁকে অবগত করলেন যে, তাঁর (আঃ) বন্ধু জাহান্নামে রয়েছে। তিনি (আঃ) সৃষ্টিকর্তার নিকট আকুতি জানালেন, “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি এ প্রতিশ্র“তি দেননি যে, শহীদদেরকে জান্নাত দান করবেন?

অবশ্যই তা সত্য কিন্তু এ লোকটি নিজের পিতা মাতাকে সব সময় দুঃখ দিত। তাই তার পরিণতি ভয়াবহ। আর পিতা মাতার সাথে নাফরমানিকারী ব্যক্তির কোন আমল আমি কবুল করি না।” (সূত্রঃ মুসতাদরুকুল ওয়াসায়েল, খঃ ২, পৃঃ ২৩০)

ইমাম বাকের (আঃ) বলেন, “কখনো কখনো এমন হয় যে, কোন বান্দা পিতা মাতার জীবদ্দশায় তাদের সাথে অত্যন্ত কোমল ব্যবহার করে কিন্তু যখন তারা মারা যান তখন না তাদের ঋণ পরিশোধ করে আর না তাদের জন্য মহান প্রতিপালকের নিকট মাগফিরাত কামনা করে। আর যখন অবস্থা এমন হয় তখন আল্লাহ তায়ালা ঐ সন্তানকে পিতা মাতার নাফরমান সন্তান হিসেবে গণ্য করেন।” (সূত্রঃ উসুলে কাফি, খঃ ২, পৃঃ ১৩০)

হযরত ওয়াইশ কুরানীর (রহঃ) জীবনী থেকে একটি শিক্ষাঃ

নির্দিধায় বলা যায় হযরত ওয়াইশ মহানবী (সাঃ) এর প্রিয় আশেকিনদের মধ্যে অন্যতম। তার পেশা ছিল উষ্ট্র চালনা। আর এ থেকে যা আয় হত তা দ্বারা নিজের ও মায়ের খরচ বহন করতেন। মহানবী (সাঃ) এর প্রতি তাঁর অগাধ ভালবাসা ও আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও সরাসরি কোনদিন পয়গাম্বার (সাঃ) এর অবয়ব মোবারক যিয়ারত করতে পারেননি। একদিন তিনি মায়ের অনুমতি চাইলেন যেন তাঁকে মহানবী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করতে মদিনায় যেতে দেয়া হয়। প্রিয় গর্ভধারিনী তাঁকে অনুমতি দিলেন শর্তসাপেক্ষে যে মদিনায় যেন অর্ধদিনের বেশি অবস্থান না করে। তিনি মদিনার পথে পাড়ি জমালেন। অনেক বাধা বিঘ্নতা পেরিয়ে অবশেষে মদিনায় প্রবেশ করেন। তাঁর হৃদয় প্রিয় মানুষটির দীদারের জন্য ছটফট করছিল আর অশ্র“র বারিধারাগুলো কপোল বেয়ে বেয়ে ঝরছিল। হঠাৎ করে তাঁকে সংবাদ দেয়া হলো যে, মহানবী (সাঃ) মদিনায় নেই কোথাও সফরে গিয়েছেন। তিনি মায়ের প্রতিশ্র“তিমত অর্ধদিন অপেক্ষা করেন কিন্তু মহানবী (সাঃ) ফিরে না আসায় তাঁর (সাঃ) যিয়ারতের স্বাদ আস্বাদন না করেই মদিনা ত্যাগ করেন। কিছুদিন পর মহানবী (সাঃ) মদিনায় প্রত্যাগমন করলে ওয়াইশের আগমন সংবাদ তাঁকে দেয়া হয়। তিনি একথা শুনে বলেন, “ওয়াইশ কুরানী আমার গৃহে নূরের বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে গেছেন।” তৎপর বলেন, “জান্নাতের সুবাতাস কুরোন থেকে প্রবাহিত হচ্ছে। হে ওয়াইশ কুরানী! আমি তোমার সাক্ষাতের কতই না প্রত্যাশী।”

পিতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন সংক্রান্ত ব্যাপারে ইমাম জামান (আঃ) এর নির্দেশঃ

সৈয়দ মাহমুদ মুসাভী নাজাফী প্রসিদ্ধ সৈয়দ মাহমুদ হিন্দি তিনি নিজের সমসাময়িককালে একজন তাকওয়া সম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হতেন। তিনি হযরত আলী (আঃ) এর হেরেমে নামাজের দায়িত্ব পালন করতেন। মাহমুদ হিন্দি একজন বড় আলেমে দ্বীনের বক্তব্য বর্ণনা করেন। আলেমে দ্বীনের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল যে হাম্মামে কাজ করত। তিনি বলেন, আমার পিতা বয়সের কারণে অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। আমি তাকে যথাযথ সম্মান করতাম এবং তার সমস্ত কাজগুলো করে দিতাম। শুধুমাত্র বুধবার রাত ব্যতীত। কারণ ঐ রাতে আমি ইমামে জামানার যিয়ারতের ব্যাকুলতায় মসজিদে সাহলাতে গমন করতাম। যখন চল্লিশ বুধবারের রাত্র অতিক্রান্ত হচ্ছিল সে রাত্রে আমি অত্যন্ত আশায় বুক বেঁধে মসজিদে উপস্থিত হই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল আজ রাতেই ইমামের যিয়ারত নসিব হবে। কিন্তু যখন আমি নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছিলাম হঠাৎ রাস্তায় একজন নুুরানী ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাত হয়। তিনি অর্শ্বের উপর সওয়ার ছিলেন। আমার পাশে এসে তিনি আমার নাম ধরে ডাকলেন এবং তিন বার বলেন, তুমি নিজের পিতার প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রেখো এবং তার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করো। এ বলে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি দীর্ঘক্ষণ ভেবে দেখলাম এ লোকটি কে হতে পারেন? পরোক্ষণে চিন্তার ঘোর কেটে গেলে বুঝলাম উনিই তো ঐ মহামানব যার দীদারের প্রত্যাশায় আমি চল্লিশ বুধবার মসজিদে সাহলাতে অতিবাহিত করেছি। আমি মাওলার উপদেশকে সঠিকভাবে পালনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম এবং পিতার খেদমত করার জন্য অমি উঠে পড়ে লেগে গেলাম যেভাবে এক কর্মচারী নিজের কাজের বা দায়িত্বের প্রতি খেয়াল রাখে। (সূত্র ঃ সুলতাহাল আমাল, খঃ ৩, পৃঃ ৩২৪)

সন্তানের উচিত হলো পিতা মাতার প্রয়োজন মিটানো, কোন জিনিস দেওয়ার সময় নিজেদের হাতকে তাদের হাতের উপর রাখা অনুচিত। তাদের অগ্রে না চলা এবং বসার সময় তাদে সাহায্যে না বসা।

কথিত যে, ইমা জয়নুল আবেদীন (আঃ) একদিন লক্ষ্য করলেন যে, এক ব্যক্তি তার পিতার পাশ ঘেঁষে শরীরের কিছু ভার তার উপর রেখে বসে রয়েছে। তার এ বেয়াদবির কারণে ইমাম (আঃ) আমরণ তার সঙ্গে কথা বলেননি। (সূত্র ঃ উসুলে কাফি, খঃ ২, পৃঃ ২৬১)

পরিশেষে, বলতে চাই যে, আসুন পিতা মাতার অধিকারকে রক্ষার চেষ্টা করি নচেৎ পরিনাম খুবই ভয়াবহ। তাদের অবদানের শুকরিয়া আদায় করা উচিত এবং সর্বদা আল্লাহর নিকট দোয়া করা উচিত এ বলে যে, হে আল্লাহ! আমার ক্ষমতা নেই তাদের প্রতিদান দেয়ার। তুমি তাদের উপর অবারিত রহমত বর্ষণ কর।###########

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More