হুজ্জাতুল ইসলাম মো. আলী মোর্ত্তজা
নামাজের শেষ সালাম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব এবং সামান্য ব্যাখ্যা উপস্থাপন করব। সাধারণত নামাজের শেষে নামাজী ব্যক্তি তিনটি সালাম দিয়ে থাকে। প্রথম সালামটি স্পষ্ট যে, মহানবী হযরত মুহাম্মাদকে (সা.) দেয়া হয়। তবে কিছু হাদিসে বলা হয়েছে প্রথম সালামে মহানবীর সাথে সাথে তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের উপরও সালাম দেয়া হয়।
ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন: আস সালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবী ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু বলতে আমরা বুঝি আস সালামু আলা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ খাতামিন নাবিইন আস সালামু আলা আইম্মাতির রাশিদিনাল মাহদিইন। (মানলা ইয়াহযারুহুল ফাকিহ, শেখ সাদুক ১ম খণ্ড, পৃ: ৩২০)
দ্বিতীয় সালামে আমরা বলি: আস সালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহিন। এখানে নামাজি ব্যক্তি তার নিজের উপর এবং অন্য সকল নামাজিদের উপর সালাম প্রেরণ করে। এর পাশাপাশি আল্লাহর সকল সালেহ তথা নেক বান্দাদের উপরও সালাম প্রেরণ করে। তবে নেক তথা সৎকর্মশীল বান্দা কারা? মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন শ্রেণীর বান্দাদেরকে সালেহ তথা সৎকর্মশীল হিসাবে উল্লেখ করেছেন। যেমন: নবীগণ, আওলিয়া এবং মু’মিনগণ।
সুতরাং এখানে নামাজি ব্যক্তি সকল প্রকার সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের উপর সালাম প্রেরণ করে থাকে। সুতরাং মানুষ এবং জিনদের মধ্যে থেকে আল্লাহর যত মু’মিন ও সৎকর্মশীল বান্দা রয়েছে নামাজি ব্যক্তি তাদের সবার উপর সালাম প্রেরণ করে। আর নামাজের তৃতীয় সালামের ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।
তৃতীয় সালামে আমরা বলি: আস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। এই বাক্যের দৃষ্টান্ত কারা সে বিষয়টি কিছুটা অস্পষ্ট। তবে হাদিসে এর দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু হাদিসে বলা হয়েছে তৃতীয় সালামে ফেরেশতাদেরকে সালাম প্রেরণ করা হয়।
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে: তৃতীয় সালামটি হচ্ছে মানুষের দুই কাঁধে অবস্থিত ফেরেশতাদের জন্য। (বিহারুল আনওয়ার, ৮২তম খণ্ড, পৃ: ৩০৫)
তবে কিছু হাদিসে বলা হয়েছে তৃতীয় সালামে সকল ফেরেশতাগণের উপর সালাম প্রেরণ করা হয়। আবার অন্য কিছু হাদিসে বলা হয়েছে, নবীগণের উপর সালাম প্রেরণ করা হয়। তাহলে বলা যায় যে, প্রথম সালামে নামাজি ব্যক্তি যেহেতু বিশেষভাবে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের উপর সলাম প্রেরণ করে আর দ্বিতীয় সালামে সকল নামাজি, সৎকর্মশীল বান্দা, নবীগণ এবং সকল ঈমানদার জিন ও ইনসানের উপর সালাম প্রেরণ করা হয়। তাই তৃতীয় সালামে সকলকে একত্রে সালাম প্রেরণ করা হয়।
মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেন, মিরাজের রাতে যখন নামাজ শেষে আমার নিজের উপর এবং আমার আহলে বাইতের উপর সালাম প্রেরণ করলাম তখন দেখলাম ফেরেশতাগণ আমার পিছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এমতাবস্থায় আমাকে নির্দেশ দেয়া হল, হে মুহাম্মাদ! তাদের উপরও সালাম প্রেরণ কর। তখন আমি বললাম: আস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। এবার আমার উপর ওহী আসল: আমার দরুদ ও সালাম গ্রহণ কর। আমি এবং তুমি ও তোমার আহলে বাইত হলাম রহমত ও বরকত। (সিররুস সালাত, ইমাম খোমিনি পৃ: ১০৮)
নামাজের শেষ সালাম সম্পর্কে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: সকল নামাজের শেষে সালামের অর্থ হচ্ছে নিরাপত্তা। অর্থাৎ যে আল্লাহর নির্দেশ পালন করে এবং নমনিয়তার সাথে রাসূলের সুন্নত পালন করে তার জন্য রয়েছে দুনিয়ার বালামুসিবত এবং আখিরাতের আযাব থেকে নিরাপত্তা ও মুক্তি। (মিসবাহুশ শারিয়াহ পৃ: ১২৬)
মোটকথা বলা যেতে পারে যে, নামাজের শেষ সালামে আমরা মহানবী ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের উপর, আল্লাহর নেক বান্দাদের উপর, ফেরেশতাগণের উপর এবং নামাজিদের উপর সালাম প্রেরণ করি। যেভাবে তাকবিরাতুল ইহরাম বলার মাধ্যমে আমরা মিরাজে গমন করি ঠিক সেভাবেই আমরা সালাম দেয়ার মাধ্যমে আবার দুনিয়াতে নেমে আসি। আর আল্লাহর নেক বান্দাদের উপর সালাম প্রেরণ করি এবং এভাবে আমরা নামাজ থেকে বের হয়ে আসি।
সব শেষে বলতে হয়, সালাম হচ্ছে মাহন ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আর সেই সম্মানিত ব্যক্তি যত বেশী মর্যাদাবান হবে সালাম প্রেরণের অর্থ ততটাই সঠিক হবে এবং তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হবে।
তবে নামাজের শেষে সালাম সম্পর্কে বলা যেতে পারে যে, নামাজি ব্যক্তি নামাজ শেষে মহানবীর উপর এবং সৎকর্মশীল বান্দাদের উপর সবিনয় নিবেদন করে। আর শেষ সালাম হচ্ছে নামাজি ব্যক্তির চূড়ান্ত আত্মসমর্পন।####