পবিত্র রমজান মাসের রোজা ইসলামের অন্যতম ওয়াজিব কর্মসমূহের মধ্যে একটি। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন:
যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোন কারণ ছাড়াই ইফতার করে, তাহলে তার দেহ থেকে ঈমানের রুহ চলে যায়।
মাসআলা ১২০ : যেসব ব্যক্তির উপর (পবিত্র রমজান মাসের ) রোজা ফরজ:
১-বালেগ অথবা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া : নাবালক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উপর রোজা ফরজ নয়, কিন্তু শিশুদের উপর রোজার অনুশীলনের জন্য অর্ধ দিবস অথবা তার থেকে বেশি পর্যন্ত রোজা রাখা বা অভ্যাস সৃষ্টির জন্য চেষ্টা চালানো মুস্তাহাব।
২ ও ৩-বুদ্ধিমান হওয়া (পাগল না হওয়া) এবং বেহুশ না হওয়া।
৪-কোন নারীর মাসিক বা সন্তান প্রসবকালীন রক্ত বা নিফাস না থাকা, এমতাবস্থায় কেউ যদি রোজা রাখে তার রোজা সহি হবে না।
৫-প্রচন্ড অসুস্থ না হওয়া: যদি কোন ব্যক্তির রোজা রাখার মাধ্যমে তার অসুস্থতা বেড়ে যায় অথবা তার আরোগ্য হতে সময় লাগে অথবা তার ব্যথা বৃদ্ধি পেতে পাওে এবং সেটা সহ্য করতে পারে না, এমতাবস্থায় তার উপর রোজা ওয়াজিব নয়।
৬-সফরে না থাকা: রোজাদার ব্যক্তিকে অবশ্যই তার জন্মভূমি অথবা নিজ কর্মস্থলে থাকতে হবে। যদি সে মুসাফির হয়, সেক্ষেত্রে তার উপর রোজা ফরজ হবে না। সফলকালীন সময়ে সে যদি রোজা রাখে তার রোজা গ্রহণযোগ্য নয়, কিন্তু নি¤েœাক্ত ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম:
ক. যদি কোন ব্যক্তি না জেনে থাকে যে, সফলকালীন সময়ে রোজা হয় না, এমতাবস্থায় সে যদি রোজা রাখে এবং পরবর্তীতে সে জানতে পারে, এক্ষেত্রে তার রোজা সঠিক হবে, কাযা (রোজার) আদায়ের প্রয়োজন নেই।
খ. যে ব্যক্তি দুপুরের পর (সুর্য যখন মাথা বরাবর থাকে তারপর থেকে) সফরে বের হয়, তাকে রোজা রাখতে হবে এবং ইহতিয়াতে ওয়াজিবের ভিত্তিতে এই রোজাই যথেষ্ট।
গ. যে ব্যক্তি দুপুরের আগেই তার নিজ এলাকায় পৌঁছায় এবং ইতিপূর্বে যদি রোজা ভঙ্গের কারণ না ঘটে থাকে (যার মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ হয়), তাহলে অবশ্যই সেদিন রোজা রাখতে হবে।
কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে রোজাদার ব্যক্তি দুপুরের আগে সফর করতে চাইলে অবশ্যই তাকে হাদদে তারাখুম (যেখান থেকে নিজ এলাকার বাড়ি এবং গাছপালা দেখা যাবে না) পার হতে হবে; কোনক্রমেই তারবাড়িতে এর আগে খাওয়া যাবে না।
মাসআলা ১২১: পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ যেভাবে নি¤েœাক্ত উপায়ে প্রমাণিত হবে;
১-স্বচক্ষে দেখা।
২-দু’জন ন্যায়পরায়ণ পুরুষ ব্যক্তির সাক্ষ্য দেওয়া এবং তাদের দু’জনের মধ্যে এই সাক্ষ্যদানে কোন বৈপরীত্য না থাকা, অর্থাৎ তাদের দু’জনের স্বাক্ষরের সাথে অন্যান্য চাঁদ দেখা কমিটি বা সাধারণ জনগণ এর মধ্যে যেন এমনটি না হয় যে, ঐ দু’জন ছাড়া আর কেউ চাঁদ দেখেনি এমনটি না ঘটা।
৩-শাবান মাসের ৩০ দিন অতিবাহিত হওয়া।
৪-জনগণের মধ্যে চাঁদ দেখা নিয়ে যথাযথ প্রচার এবং প্রসার থাকা, যাতে নিশ্চিত হয় যে চাঁদ উঠেছে। কোন মিডিয়া বা কয়েক ব্যক্তির কাছ থেকে শোনা যথেষ্ট নয়।
তবে রমজান মাসের প্রথম রোজা নিয়ে সন্দেহ করলে যদি নিয়ত থাকে যে, এটাই প্রথম রোজা; তাহলে রোজা হবে না। কিন্তু যদি শাবান মাস অথবা অন্যান্য কাযা রোজার জন্য ঐদিন রোজা রাখে এবং পরবর্তীতে প্রকাশ পায় যে আজ রমজান মাস, এক্ষেত্রে জায়েজ আছে। ঠিক এমনভাবে কেউ যদি শাওয়াল মাসের চাঁদ নিয়ে সন্দেহ করে তাহলে কোনক্রমেই সেদিন ইফতার করা যাবে না। তবে পূর্ব রাতে চাঁদ দেখা গেলে করা যাবে ঠিক উপরোক্ত নিয়মে।
মাসআলা ১২২: রোজা আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টির জন্য। প্রথম ফজর (সুবহে সাদিক) থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত, নি¤েœাক্ত জিনিসগুলো থেকে সংযম বা বিরত থাকা।
১-ইচ্ছাকৃতভাবে খাওয়অ বা পান করা, সেটা কম অথবা বেশি হোক। কিন্তু অনিচ্ছাকৃতভাবে কিম্বা ভুলক্রমে কেউ খেলে বা পান করলে তার রোজা নষ্ট হবে না।
২-ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাস, সেটা লজ্জাস্থানের সামনের অথবা পিছনে হোক না কেন। নিজে করুক বা অন্য দ্বারা কৃত হোক, রোজা বাতিল হবে।
৩-হস্তমৈথুন অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত করা এবং সেই নিয়্যত বের করা। যদিও এটা স্ত্রী’র মাধ্যমে করা বৈধ তবে এক্ষেত্রে বীর্ষ বের হলে রোযা বাতিল হবে। তবে রমজান মাসের দিনের বেলায় স্বপ্নদোষের মাধ্যমে বীর্য বের হলে, এমনকি এই অবস্থায় সারা দিন পার হয়ে গেলেও রোজা সঠিক।
৪-ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা।
৫-মহান আল্লাহ তা’য়ালা এবং মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এবং কোন মাসুম (আ.)এর নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা কথা বলা (ইহতিয়াতে ওয়াজিবের ভিত্তিতে)
৬-ইচ্ছাকৃতভাবে গলার মধ্যে ভারী ধূলিকণা অথবা ধোঁয়া প্রবেশ করালে (ইহতিয়াতে ওয়াজিবের ভিত্তিতে)।
মাসআলা ১২৩: যদি কোন ব্যক্তি পবিত্র রমজান মাসে রাতের বেলায় জানাবত হয়, অবশ্যই তাকে ফজর হওয়ার পূর্বে গোসল করতে হবে। যদি তার পক্ষে গোসল করা সম্ভব না হয়, যেমন অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে, তার উপর ওয়াজিব তায়াম্মুম করা। তদ্রæপ কোন নারী যদি মাসিক অথবা নেফাসের রক্ত থেকে পাক হয়, অবশ্যই তাকে ফজর হওয়ার পূর্বে গোসল করতে হবে। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে জানাবাত, হায়েজ অথবা নেফাসের এই গোসলসমূহ না করে থাকে, এমনকি এর পরিবর্তে তহায়াম্মুমও করেনি, এমতাবস্থায় সুর্য উদয় হয়েছে, অবশ্যই তার জন্য কাযা রোজা করতে হবে এবং ঐদিনে অবশ্যই রোজা রাখতে হবে, কিন্তু নিয়ত থাকবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
মাসআলা ১২৪: যদি কারো পবিত্র রমজান মাসের রাতের বেলায় জানাবাত হয়, অতঃপর ঘুমায় এবং তার বিশ্বাস থাকে সে জাগ্রত হয়ে গোসল করবে কিন্তু সে ঘুম থেকে জাগ্রত হতে পারেনি, ফজরের পর জাগ্রত হয়েছে, এক্ষেত্রে তার রোজা সঠিক থাকবে। কিন্তু যদি সে প্রথমবার জাগ্রত হওয়ার পর পুনরায় ঘুমায় এবং আবার জাগ্রত হয়, পুনরায় ঘুমায় এবং ফজরের সময় হয়ে যায় (দু’বার জাগ্রত হওয়ার পর) তার উপর ওয়াজিব সেই দিন রোজা রাখা এবং শাস্তিস্বরূপ পরবর্তীতে কাযা রোজা করা।
মাসআলা ১২৫: রমজান মাসে কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা না রাখলে তার উপর কাফফারা ওয়াজিব। পানাহার, সহবাস, হস্তমৈথুন করার পর বা জানাবাতের পর ফজর পর্যন্ত থাকা, এ সমস্ত কারণেও কাফফারা ওয়াজিব হয়। এগুলো শুধুমাত্র ইচ্ছাকৃতভাবে করলে। কিন্তু কেউ যদি অন্যের মাধ্যমে অথবা কোন পরিস্থিতিতে বাধ্যবাধকতার কারণে হয়ে থাকে তাহলে তার উপর কাফফারা ওয়াজিব নয়।####
