লেখকঃ আলী নওয়াজ খান
সৃষ্টিতত্ত্বের রহস্য বা আত্মপরিচিতিমুলক জ্ঞান প্রতিটি ব্যক্তির জন্য একটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী বিষয়। কেননা প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজের অবস্থান, ক্ষমতা, সূচনা এবং শেষ পরিণতি বা গন্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান না রাখলে সে নিজের কল্যাণ ও অকল্যাণ সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্তই নিতে পারবে না। অপরিচিত বস্তুর ব্যবহার প্রণালীও তার কাছে অপরিচিত থেকে যাবে। তাই ঐ অপরিচিত বস্তু সম্পর্কে কোন ধরণের সিদ্ধান্ত নিতে হলে আমাদের প্রথম দায়িত্ব হল তার সম্বন্ধে যথাযথ জ্ঞান লাভ করা। একইভাবে আমরা এই বিশাল সৃষ্টিজগতের একটি সৃষ্টজীব যে নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করিনি বরং তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। যে সত্তা আপন অস্তিত্ব লাভে অন্যের মুখাপেক্ষী সে কিভাবে তার মত অন্য একটি অস্তিত্বকে সৃষ্টি করবে ? বস্তুবাদীদের মতে মানুষ প্রকৃতির সৃষ্টি। অথচ মানুষের মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যগুলো আছে তার অধিকাংশই প্রকৃতির মধ্যে নেই। প্রকৃতি হল সম্পূর্ণরূপে বস্তুসত্তা আর মানব প্রকৃতিতে বস্তুসত্তা বর্হিভূত বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। প্রকৃতি বা বস্তু অর্থ আধাঁর বা আড়াল তাই বস্তুর বৈশিষ্ট্য হল সে তার নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত নয়। আর এক্ষেত্রে মানুষকে বলা হয় স্বজ্ঞেয় সত্তা যে তার নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত আছে বা জ্ঞান রাখে। মহান স্রষ্টা অতি সুন্দর পরিকল্পনায় এ বিশ্বকে সাজিয়েছেন। আর এই বিশ্বের রাজমুকুট স্বরূপ সৃষ্টি করেছেন মানুষকে। এজন্য আল্লাহ বলেছেন আমি ভূ-পৃষ্ঠে আমার প্রতিনিধি পাঠাতে চাই। অতএব, এই মানুষের প্রকৃত অবস্থান হল ‘মাকামে খালিফাতুল্লাহ্’; সে সৃষ্টিজগতে মহান স্রষ্টার প্রতিনিধিত্ব করবে। এখন মানুষ যদি পাশবিক স্তর অর্জনের জন্য দিনরাত চেষ্টা করে তাহলে সে নিজকেই অবমুল্যায়ণ করলো। কেননা পাশবিক স্তর হল তার স্তর থেকে নিু পর্যায়ের সৃষ্টি। আর এজন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে ব্যক্তি তার যথার্থ অবস্থান সম্পর্কে অবগত আছে সে মুক্তি পাবে। মহান আল্লাহ বলেন, “আমি ভূ পৃষ্ঠে আমার প্রতিনিধি পাঠাতে চাই।”
সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠজীব মানুষকে মহান আল্লাহ্ তায়ালা অত্যন্ত সম্মান এবং ভালবাসার পরশে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেনঃ নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে অতি মর্যাদা দান করেছি। (বনি ইসরাইলঃ ৭০)
তিনি আরো বলেনঃ আমি স্বহস্তে তোমাকে সৃষ্টি করেছি (সুরা সোয়াদঃ ৭৫) এই মানুষকে পৃথিবীতে চলার সকল উপযুক্ত উপকরণ তিনি দান করেছেন। তাকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তর। যাতে সে একসাথে যথাযথভাবে বসবাস করতে পারে এবং ন্যায়-অন্যায় সত্য মিথ্যাকে পৃথক করে তার উন্নতির পথে যাত্রা করতে পারে। একটি হাদীসে কুদসীতে এভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ ‘হে মানব সন্তান আমি যাকিছু সৃষ্টি করেছি সবই তোমার জন্য, আর তোমাকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার জন্য।’ আবার এই মানব জাতিকেই তার উন্নতির পথে চরম পূর্ণত্ব লাভের জন্যই মহান আল্লাহ যুগে যুগে অসংখ্য মহাপুরুষ পাঠিয়েছেন। এই মহাপুরুষগণ সকল প্রতিকুল পরিবেশের মধ্যে অসহনীয় কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে নিজ জীবনকে উৎস্বর্গ করে দিয়েছেন একমাত্র মানব জাতির জীবনে কল্যাণকামী ও উন্নয়নমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে।
পবিত্র কোরআনে মানুষ সৃষ্টির মৌলিক ও চুড়ান্ত উদ্দেশ্য সম্পর্কে মহান স্রষ্টা বলেনঃ আমি জ্বীন ও মানবকে একমাত্র আমার বান্দেগী করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। (সুরা যারিয়াতঃ ৫৬)
ইবাদত শব্দটি আবদ্ শব্দ থেকে উৎপত্তি ঘটেছে আর আব্দ শব্দের অর্থ হলো দাসত্ব করা। ঐ ব্যক্তিকে আবদ্ বলা হয় যে তার সমগ্র অস্তিত্বকে আপাদমস্তক তার প্রভুর আদেশ পালনে সদাপ্রস্তুত রাখে এবং সে তার মালিকের ইচ্ছার বাইরে নিজ ইচ্ছায় কোন কিছু করে না। অতএব মহান স্রষ্টা জ্বীন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এজন্যই যে তারা সকলক্ষেত্রে তাদের প্রভুর ইচ্ছার প্রকাশ ঘটাবে। আর এই দাসত্ব বা নিজ ইচ্ছাকে স্রষ্টার ইচ্ছায় রূপান্তর করার মাধ্যমে জ্বীন ও মানব তাদের চুড়ান্ত লক্ষ্যে (কামালে) উপনীত হয়ে থাকে। ইমাম হাসান (আঃ) বলেনঃ কেউ যদি আল্লাহর ইচ্ছার সম্মুখে অবনত হয় তাহলে আল্লাহ সমগ্র অস্তিত্বকে তার ইচ্ছাধীন করে দেন। (একসাদ ওয়া পাঞ্জ মৌজু আজ কুরআনে কারীম ওয়া হাদীসে আহলে বাইত, পৃঃ ১৬১)
যখন বান্দা তার প্রভু ইচ্ছার সম্মুখে নিজ ইচ্ছাকে বিলীন করে দেয় তখন এই বান্দা তার প্রভুর প্রভুত্ব প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত হয়ে যায়। আর এভাবে বান্দা তার প্রভুর ইচ্ছানুযায়ী সমগ্রসৃষ্টিজগতে প্রতিনিধিত্বের মাকামে অধিষ্ঠ হতে পারে। ইমাম সাদিক (আঃ) বলেন ঃ বান্দেগী এমন এক সত্তা যার হক্বীকত হল প্রভুত্ব তাই বান্দেগীতে যা বিলীন করা হয় প্রভুত্বে তা অর্জিত হয় আর প্রভুত্বে যাকিছু গোপন থাকে তা ইবাদতের মাধ্যমে হাতে আসে । (‘মিসবাহুশ শারীয়াহ্’ অনুবাদক ১০০ নম্বর অধ্যায়, মিযান আল হিকমাহ্ ১১৬১৭ নম্বর হাদীস)
আর এজন্যই বান্দার সিজদাবনত অবস্থাকে বান্দেগী প্রকাশের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম স্বরূপ পরিচয় দেয়া হয়েছে। ইমাম সাদিক (আঃ) বলেনঃ ইবাদতের চুড়ান্ত রূপ হল সিজদা। (মিজানুল হিকমাহ্, খঃ ৫ম, পৃঃ ২৩৮০)
ইমাম রেজা (আঃ) বলেনঃ বান্দার সাথে তার প্রভুর সর্বাধিক নিকটতম সময় হল যখন সে বান্দা সিজদাবনত থাকে। ইমাম আলী (আঃ) প্রকৃত সিজদার ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন; তিনি বলেনঃ দৈহিক সিজদার অর্থ হল বিশুদ্ধ নিয়াতে বিনয় ও বিনম্র অন্তরে কপালের একাংশ মাটিতে রাখা এবং হস্তদ্বয়ের তালু ও পা দ্বয়ের আংগুলের অগ্রভাগ ভুপৃষ্ঠে রাখা। আর আধ্যাত্মিক সিজদা হল; নিজের মনকে নশ্বর বিষয়াবলী থেকে মুক্ত করে যা কিছু অবিনশ্বর তার প্রতি নিজের সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে ধাবিত হওয়া এবং অহংকার ও আমিত্বের পরিচ্ছদ খুলে সকল আসক্তি ও পার্থিব টান ছিন্ন করে মহানবীর আত্মিক ও নৈতিক বৈশিষ্ট্যে নিজকে গড়ে তোলা। (গুরারুল হিকাম; ২২১০ থেকে ২২১১ পৃঃ)
তিনি সিজদার অর্থের ব্যাখ্যায় আরো বলেনঃ সিজদার অর্থ হলো আমাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে আর সিজদা থেকে মাথা উঠানোর অর্থ হলো আমাকে মাটি থেকে অস্তিত্ব দান করা হয়েছে। দ্বিতীয় সিজদার অর্থ হলো আমাকে পুনরায় মাটিতে পরিণত করা হবে আর দ্বিতীয় সিজদা থেকে মাথা উঠানোর অর্থ হলো পুনরবার আমাকে মাটি হতেই আর্বিভূত করা হবে। (মিযানুল হিকমাহ্ ৮২৭৭ নম্বর হাদীস)
এমন কি সিজদার অবস্থায় মানুষের চক্ষুদ্বয় পৃথিবীর বস্তুসামগ্রীকে পশ্চাতে রেখে আল্লাহর সান্নিধ্যে সে অবনত হয়। (মিসবাহু শারিয়া, পৃঃ ১০৮)
অতএব মানব সৃষ্টির লক্ষ্য হল মহান স্রষ্টার দাসত্ব করা আর এই দাসত্বের মাধ্যমেই সে তার স্রষ্টার অনুমতিক্রমে প্রতিনিধি স্বরূপ সৃষ্টি জগতে প্রভুত্ব করতে শেখে। ‘কামালে মুতলাক’-এর ইবাদত করার অর্থ হল নিজকে সেদিকে ধাবিত করা বা কামালে মুতলাকের দিকে নিজের যাত্রাকে নিবদ্ধ করা। প্রভুর নৈকট্য লাভের অর্থ এই নয় যে মানুষ তার প্রভুর সাথে স্থানগত বা দৈহিক নৈকট্য লাভ করবে? না, আদৌ এটা লক্ষ্য নয় বরং প্রভুর বৈশিষ্ট্যসমূহ অর্জন করে নিজকে (হাদীস অনুযায়ী খোদায়ী বৈশিষ্ট্যে নিজকে সুশোভিত কর) ঐশী গুণে গুণাম্বিত করার মাধ্যমে আমরা প্রভুর প্রকৃত নৈকট্য লাভ করতে পারবো। আর ইবাদতের ফলে অর্জিত হয় ‘ইয়াকীন’। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে সুরা হির্জ এর ৯৯ নম্বর আয়াতে তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো ফলে তিনি তোমাকে ইয়াক্বীন দান করবেন। আর এই ইয়াক্বীন অর্জিত হলে বান্দা আসমান এবং জমীনের ‘মালাকুত’ দর্শন করতে সক্ষম হবে। মহান আল্লাহ পবিত্র সুরা তাকাসুরে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
