মুলঃ আল্লামা সাঈয়্যেদ মুরতাজা আসকারী
অনুবাদ : মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ
খতিব বাগদাদির বর্ণনা অনুযায়ী, আব্বাসীয় খলিফা মনসুরের সঙ্গে আবু হানিফার দুই ভিন্ন আচরণ দেখতে পাওয়া যায়:
প্রথম: তিনি প্রথম দিকে মনসুরের সমীপে ছিলেন। যেমনটি তারিখে বাগদাদির লেখক বলেন: প্রায় ১৪২ হিজরীর দিকে বাগদাদ নগরীর সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণকালে আবু হানিফা ইট বসানোর কাজ তদারকি ও তা গণনা করতেন। ইটের সংখ্যাটি তিনি আঁখের (ইক্ষু) মাধ্যমে চিহ্নিত করতেন। অর্থাৎ প্রতি একশ’ কিংবা এক হাজার ইটের পর তিনি একখন্ড আঁখ (ইক্ষু) স্থাপন করতেন এবং তারপর আঁখগুলো গণনা করতেন। আর এভাবে মোট ইটের সংখ্যা বের করতেন। তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি ছিলেন যিনি ইট গণনার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। (তারিখে বাগদাদ, ১ম খন্ড, পৃ. ৭১।)
দ্বিতীয়: তিনি স্বীয় জীবনের শেষের দিকে খলিফার বিরোধিতা করেন। যেমনটি খতিব বাগদাদি ও অন্যরা বর্ণনা করেন যে, খলিফা আবু জাফর মনসুরের বিরুদ্ধে বসরায় ইবরাহিমের বিদ্রোহের সময় আবু হানিফা খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও ইবরাহিমকে সহযোগিতা করার ব্যাপারে ফতোয়া প্রদান করতেন। (তারিখে বাগদাদ, ১৩তম খন্ড, পৃ. ২৮৪-২৮৬, বাবু যিকরি মা হুকিয়া আন আবি হানিফাতা মিন রা’য়িহি ফিল খুরুজি আলাস্ সুলতান।)
আরও কথিত আছে: এ কারণেই খলিফা মনসুর আবু হানিফাকে বাগদাদের একটি জেলখানায় বন্দী রাখে এবং তিনি সেখানেই মারা যান। আবু হানিফার পর তাঁরই ছাত্ররা খেলাফতের দরবারের আলেমদের কাতারে ছিলেন। যেমন: আবু ইউসুফ বাদশাহ হারুনুর রশিদের খেলাফতকালে তার বিচারপতি ছিলেন। আর এ ব্যাপারে আবু ইউসুফকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: “আমরা আবু হানিফার ফিকহের (ইসলামি আইনশাস্ত্র) দারসে অংশ নিতাম, কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে তাঁর তাকলিদ বা অন্ধানুকরণ করতাম না।” (তারিখে বাগদাদ, ১৩তম খন্ড, পৃ. ৩৭৫ ও ৩৮৬।)
যাই হোক, খলিফারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আবু হানিফার ফেকহি মাযহাবের প্রচার-প্রসার ঘটাত। উসমানীয় খেলাফতকালে রাজা-বাদশাহদের রাষ্ট্রীয় মাযহাব ছিল হানাফি মাযহাব।
এ ছিল হাদিস অনুসারে আমল করা কিংবা না করাকে কেন্দ্র করে খোলাফা মতাদর্শের ফেকহি দুই মাযহাবের মতানৈক্যের দৃষ্টান্ত। এখন আমরা খোলাফা মতাদর্শের মতানৈক্যের অপর কিছু দৃষ্টান্তের বর্ণনা দিব।
২। ইসলামের আক্বায়েদ বা বিভিন্ন বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য
ফিকাহ ও আহকামের ক্ষেত্রে খোলাফা মতাদর্শের অনুসারীদের মতানৈক্য ছাড়াও আক্বায়েদের ক্ষেত্রেও তাদের নিম্নরূপ গুরুতর মতানৈক্য ছিল:
ক) একদল বলে: আল্লাহর গুণাবলীর মধ্যে পড়ে যে, তাঁর হাত, পা ও চোখ আছে এবং কোনো এক স্থানে তিনি অবস্থান করেন। আর যারা বলে যে, আল্লাহর কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই ও তিনি কোনো বিশেষ স্থানে অবস্থান করেন না তারা আল্লাহর গুণাবলীকেই অস্বীকার ও উপেক্ষা করেছে এবং তাদেরকে “মুয়াত্তালাতুস্ সিফাত” বলা হয়। অপর একদল বলে: অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অধিকারী হওয়াটা হচ্ছে দেহ ও আল্লাহর সৃষ্টিবস্তুর গুণ-বৈশিষ্ট্য এবং যারা এ আক্বিদা-বিশ্বাস পোষণ করে তাদেরকে “মোজাস্সামাহ” ও “মোশাব্বেহাহ” বলা হয়; অর্থাৎ তারা আল্লাহকে দেহের অধিকারী জ্ঞান করে এবং তাঁকে তাঁর সৃষ্টিবস্তুর সঙ্গে সাদৃশ্য পেশ করে।
খ) সেই প্রথম দলটি বলে: আল্লাহ্ হচ্ছেন প্রাচীন এবং তাঁর গুণাবলীও প্রাচীন। আর কুরআন আল্লাহ্র বাণী হওয়ায় তা আল্লাহর অন্যতম গুণ। কাজেই, কুরআনও প্রাচীন এবং তা সৃষ্ট নয়। আর দ্বিতীয় দলটি বলে: মহান আল্লাহ্ হচ্ছেন প্রাচীন এবং কুরআন হচ্ছে আল্লাহর বাণী ও তা প্রাচীন নয়। আর যে ব্যক্তিই বলবে কুরআন প্রাচীন, সে ব্যক্তিই বিশ্বাস করে যে, কুরআনও আল্লাহর ন্যায় প্রাচীন; আর সে দুই যৌথ প্রাচীনের প্রবক্তা বনে যায়। লেখক বলেন: আমি জানি না আল্লাহর এসব বান্দার কি হয়েছে যে, তারা কুরআনে আল্লাহর বাণীর প্রতি এতটুকুও গুরুত্ব দেয়নি যেখানে তিনি বলছেন: অর্থাৎ হে রসুল, তারা আনফালের বণ্টন সম্পর্কে আপনাকে প্রশ্ন করছে …! (সূরা: আনফাল, ১ম আয়াত।)
যেসব সাহাবি “আনফালের” (যুদ্ধে অর্জিত এক প্রকারের গনিমত) ভাগ-বণ্টন নিয়ে দন্দে জড়িয়ে গিয়ে সে বিষয়ে রসুলকে (সা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাদের এ দ্বন্দ্ব ও দ্বন্দ্ব নিরসনের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসাকরণ কি রসুলের (সা.) জন্মের পূর্বে এবং আদিকাল থেকেই ছিল ও সে বিষয়ে কুরআন সংবাদ দিয়েছে যাতে বলা যায় যে, কুরআন প্রাচীন!?
অনুরূপভাবে, অপর চৌদ্দটি বিষয় রয়েছে যেখানে কুরআনে (ইয়াসআলুনাকা) শব্দ উল্লেখ হয়েছে এবং অপর দুই স্থানে (ইয়াসতাফতুনাকা) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে; অর্থাৎ তারা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে ও আপনার নিকট ফতোয়া প্রার্থনা করে; আরও অনেক বিষয় উল্লেখ হয়েছে, যেমন: (নিশ্চয়ই আল্লাহ সেই নারীর কথা শুনেছেন যে স্বীয় স্বামীর বিষয়ে আপনার সঙ্গে বিতর্ক করছিল ও অভিযোগ করছিল…।) (সূরা: মুজাদিলাহ, ১ম আয়াত।) তৎকালের লোকদের মাঝে দ্বন্দ্ব সংঘটিত হয় এবং তারপর তারা রসুলের (সা.) নিকট রুজু করতঃ নিজেদের করণীয় ঠিক করে নেয় এবং এরপর উপরোক্ত সব আয়াতে এসব দুর্ঘটনার সংবাদ দেয়া হয়। তাহলে এই অবস্থায়, কুরআনকে কি প্রাচীন বলা যেতে পারে!? নাকি এ দুর্ঘটনাগুলো প্রথম থেকেই সংঘটিত হয়েছিল এবং জনগণ আদিকাল ও রসুলের যুগের পূর্ব থেকেই নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য বুঝে নিয়েছিল এবং আদিকাল থেকেই যা কিছু বিদ্যমান ছিল সে সম্পর্কে কুরআন সংবাদ দিচ্ছে?! সত্যিই, কি বলা উচিৎ?!
গ) এক দল বলে: বান্দার (মানুষ) সব কাজ-কর্ম আল্লাহর পক্ষ থেকেই সংঘটিত হয় এবং এ ব্যাপারে বান্দার কোনো এক্তিয়ার নেই। (আল মেলাল ওয়ান্ নেহাল, শাহরিস্তানি, ১ম খন্ড, পৃ. ৮৫, আল ফাসলুস্ সানি: আল জাবরিয়্যাহ।)
অপর দল বলে: মানুষের সব কাজ-কর্ম তার নিজেরই। নিরুপায় হয়ে যদি কেউ কোনো কাজ-কর্ম বাস্তবায়ন করে তাহলে সে কাজের জন্যে তাকে শাস্তি দেয়াটা আল্লাহর ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। (প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৩, আল ফাসলুল আওয়াল: আল মো’তাযিলাহ।) দ্বিতীয় দল প্রথম দলটিকে “জাবরিয়্যাহ” এবং নিজেদেরকে “আদলিয়্যাহ” নামকরণ করে।
ঘ) খোলাফা মতাদর্শের অধিকাংশ অনুসারীই একমত পোষণ করে যে, খলিফাদের আনুগত্য করা ওয়াজিব ও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হারাম-এতে যদিও তারা অত্যাচারী ও পাপাচারী হয়! তবে কখনও কখনও তাদের মধ্যকার ক্ষুদ্র একটি দল, অল্পকিছু সময়ের জন্যে অত্যাচারী ও পাপাচারী খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে বৈধ জ্ঞান করত; কিন্তু খিলাফতযন্ত্র তাদেরকে ধ্বংস করে দিত এবং তারপর ইতিহাসে তাদেরকে কুখ্যাত আখ্যা দিত।
উপরোক্ত বিভিন্ন মতপার্থক্যের মূল উৎস ছিল, খোলাফা মতাদর্শের সেই কয়েক শ্রেণীর হাদিস যা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। এখন আমরা এসব আক্বিদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে যেসব দল তীব্র মতপার্থক্য পোষণ করে তাদের পরিচয় তুলে ধরব। ##