মূলঃ আল্লামা সাইয়্যেদ মুরতাজা আসকারী
অনুবাদ : মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ
মুসলমানদের সব শহর ও নগরে মোহাদ্দিসগণের ভ্রমণের মাধ্যমে হাদিসের প্রকাশ-প্রচারের সূত্র ধরে এবং সেগুলো হাদিসের কিতাবসমূহে সংকলিত হওয়ার ফলে খোলাফা মতাদর্শের অনুসারীদের মাঝে দু’টি বিষয়ে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়:
- ১। ইসলামের আহকাম বা বিধিবিধানের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য।
- ২। ইসলামের আক্বায়েদ বা বিভিন্ন বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য।
এখন আমরা এই ধারাবাহিক আলোচনাগুলো অনুধাবনের জন্যে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুর প্রতি ইঙ্গিত করব।
১। ইসলামের আহকাম বা বিধিবিধানের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য
খোলাফা মতাদর্শে সা¤প্রদায়িক মতপার্থক্য সৃষ্টি হওয়ার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, রসুলের হাদিসসমূহকে মেনে নেয়া এবং তা মানতে অস্বীকৃতি জানানো। এ বিষয়ে প্রসিদ্ধতম ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন হযরত আবু হানিফা (মৃত্যু ১৫০ হি.), যিনি রসুলের (সা.) যেসব হাদিস তাঁর মতের বিরোধী সেগুলোকে মানতে স্পষ্টভাষায় অস্বীকৃতি জানান। আমরা “মাআলীমুল মাদরাসাতাইন” (দুই বিদ্যালয়ের নিদর্শনসমূহ) শীর্ষক বইয়ের দ্বিতীয় খন্ডে “আল্ ইজতিহাদু ফি ক্বারনিস্ সানি” (দ্বিতীয় শতাব্দীতে ইজতিহাদ) শীর্ষক অধ্যায়ে তাঁর বিস্তারিত রূপরেখা উল্লেখ করেছি এবং সেখানে তিনি যেসব বিধিবিধানের ব্যাপারে রসুলের (সা.) সুন্নতের উল্টো ফতোয়া দিয়েছেন (রসুলের সুন্নতের সঙ্গে আবু হানিফার বিরোধিতাকরণ দ্বারা আমরা বুঝাতে চেয়েছি, যেসব ক্ষেত্রে রসুলের (সা.) হাদিসে উল্লেখ হয়েছে, কিন্তু তিনি এর বিপরীত ফতোয়া দিয়েছেন।) তারই কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করেছি।
আবু হানিফা ও তাঁর মতাদর্শের অনুসারীরা “কিয়াস”, “ইস্তিহসান” ও “মাসালেহে মুরসালাহ” শিরোনামে ইসলামের আহকাম ইস্তিখরাজ (কুরআন-হাদিস বিশ্লেষণ করে মাসআলা বের করা) করার কতক কায়দা (সূত্র) নির্ধারণ করেছেন। আর এসব কায়দার বাস্তবতা হচ্ছে মানুষের ইচ্ছা অনুযায়ী আমল করা। তারা এসব কায়দাকে আল্লাহর কিতাব ও রসুলের (সা.) সুন্নতের মতই ইসলামি আহকামের উৎস বা সনদপত্র ধার্য করেছেন। আর যিনি আহকাম ইস্তিখরাজ করেন তাকে “মুজতাহিদ” এবং তার কাজকে “ইজতিহাদ” বলা হয়।
স্মর্তব্য যে, আল্লাহর কিতাব ও রসুলের (সা.) সুন্নতে উল্লেখিত আহকামের বিপরীতে “ইজতিহাদ” বা নিজের মতানুসারে আমল করার প্রথাটি খোলাফা মতাদর্শে সাহাবি ও প্রথম তিন খলিফার যুগ হতেই সূচিত হয়। আমরা এ বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনাটি এ কিতাবেরই পূর্বের খন্ডে এবং “মাআলীমুল মাদরাসাতাইন” শীর্ষক কিতাবের দ্বিতীয় খন্ডে “موقف المدرستين من الفقه والإجتهاد” শীর্ষক অধ্যায়ে উল্লেখ করেছি।
সাহাবিদের পরই যিনি সর্বপ্রথম “সাহাবি ও তাবেঈনের ইজতিহাদকে” রসুলের (সা.) সুন্নতের একই সারিতে সংকলন করেন এবং এর সবকেই ইসলামের বিধিবিধানের উৎস বা সনদপত্র নির্ধারণ করেন তিনিই হলেন মালেক ইবনে আনাস; তিনি তদীয় “মুয়াত্তা” কিতাবে এহেন কাজ করেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আবু হানিফা মালেকের চেয়েও অগ্রগামী ছিলেন এবং তিনি আহকামের ক্ষেত্রে ব্যক্তিমত অনুযায়ী আমল করার নিমিত্তে কতক আইন-কানুন উদ্ভাবন করেন।
আবু হানিফার পর তাঁরই মতাদর্শের ছাত্ররা আহকামের পরিবর্তনের বিষয়টিকে এমন এক পর্যায়ে উপনীত করেন যে, ইসলামে নিষিদ্ধ বহু বিষয়কেই তারা বৈধ বা হালাল করে দেন ও তার নামকরণ করেন “আল হিয়ালুশ্ শারিয়্যাহ” (প্রয়োজনে দেখুন: আল মোহাল্লা, ইবনে হাযম, ১১তম খন্ড, পৃ. ২৫১-২৫৭। (এ শব্দের অর্থ: শরঈ ফন্দি।); বিশেষতঃ বাদশাহ হারুনুর রশিদের দরবারের বিচারপতি আবু ইউসুফের ন্যায় দরবারি আলেমদের দ্বারা এহেন কাজ বেশি সংঘটিত হয়।
অবশ্য হযরত আবু হানিফা ও তাঁর ছাত্রদের এই দুঃসাহসকে মালেক ইবনে আনাস মানতে পারেননি। মালেকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে: “ইসলাম ধর্মে আবু হানিফার চেয়ে বিষাক্ত আর কেউ জন্মগ্রহণ করেননি। ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করার পর আল্লাহর রসুল (সা.) ইন্তেকাল করেন। রসুলের হাদিস ও তাঁর সাহাবিদের অনুসরণ করা আমাদের উচিৎ এবং ব্যক্তিমতের অনুসরণ করা অনুচিৎ ইত্যাদি।” (তারিখে বাগদাদ, ১৩তম খন্ড, পৃ. ৩৯৬।)
হযরত আবু হানিফার মাযহাবের প্রসার-প্রচার এবং “শরঈ ফন্দিসমূহ” শিরোনামে ইসলামের আহকাম পরিবর্তনের ব্যাপারে তাঁর কতিপয় ছাত্রের পদক্ষেপের বিপরীতে, তাদেরই বিরোধী কতক মতাদর্শের উদ্ভাবন ঘটে। আবু হানিফার মতাদর্শ বিরোধী চিন্তাগত প্রসিদ্ধতম মাযহাবের ভিত্তিস্থাপন করেন আহমদ ইবনে হাম্বল (মৃত্যু ২৪১ হি.)। তিনি “মুসনাদ” নামক হাদিসের এক বৃহৎ কিতাবের সংকলক ছিলেন।
আহমদ ইবনে হাম্বলের মাযহাবের শ্লোগান ছিল আল্লাহর রসুল (সা.) ও সাহাবিদের যুগে প্রত্যাবর্তন করতে হবে এবং সাহাবিগণকে তিনি “সালাফে সালেহ” (সৎ পূর্বপুরুষগণ) বলতেন। দুই মতাদর্শের মাঝে এই মতপার্থক্য তীব্র আকার ধারণ করে এবং উভয় দলই পরস্পরকে পাপাচারী ও ইসলাম বহির্ভূত বলে আখ্যা দিতে থাকে। খতিব বাগদাদি স্বীয় ইতিহাসের কিতাবে আবু হানিফার বিরোধীদের পক্ষ থেকে নিম্নের
নিম্নের কবিতাটি উল্লেখ করেন:
إذا ذو الرأي خاصم في قياس وجاء ببدعة هَنّة سخيفة
أتيناهم بقول الله فيها وآثار مبرزة شريفة
فكم من فرج محصنة عفيف أُحل حرامه بأبي حنيفة
আহলে রাইয়ের (অভিমত দানে যোগ্য) কোনো ব্যক্তি যদি দলিল ও ক্বিয়াস ব্যবহারের মাধ্যমে এক তুচ্ছ ও বিশ্রী বিদআতের উপস্থাপন করেন, তাহলে আমরা সে বিষয়ে আল্লাহর বাণী ও হাদিস শরিফ দ্বারা দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করব। কতইনা এমন ঘটনা ঘটেছে যে, আবু হানিফার ফতোয়ার মাধ্যমে এক বেগানা পুরুষের সঙ্গে সতী-সাধ্বী স্বামী ওয়ালা নারীর বিবাহ বৈধ হয়ে গেছে! (তারিখে বাগদাদ, ১৩তম খন্ড, পৃ. ৪০৮।)###