আমরা জানি মৃত্যুকে অনেকেই ভয় পায়। আমাদের নিজেদের ভিতরেও এমন অনুভূতি অনুভব করে থাকি। মৃত্যুর প্রতি অসন্তুষ্টির রহস্য দীর্ঘদিন যাবত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে হযরত মুহাম্মাদের (সা.) জ্যেষ্ঠ দৌহিত্র ইমাম হাসান মুজতাবাকে (আ.) প্রশ্ন করা হয়েছিল-
এক ব্যক্তি ইমাম হাসান মুজতাবা’র (আ.) নিকট জানতে চাইলেন, কেন আমরা মৃত্যুর প্রতি অসন্তুষ্ট এবং মৃত্যুকে ভয় পাই? ইমাম হাসান (আ.) বললেন: ” এর কারণ হচ্ছে, তোমরা তোমাদের আখিরাতকে ধ্বংস করেছ এবং দুনিয়াকে সুন্দর ও চাকচিক্যময় করে গড়ে তুলেছ। এখন তোমরা ভাবছ যে তোমাদেরকে সেই চাকচিক্যময় সুখের জগত ছেড়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভুবনে যেতে হবে, আর এ কারণেই তোমরা অসন্তুষ্ট। মায়ানিউল আখবার, সাদুক, পৃ. ১১০)
এক ব্যক্তি ইমাম হাসান মুজতাবা’র (আ.) নিকট বললেন: আমি মৃত্যুকে ভয় পাই! ইমাম তার প্রশ্নের উত্তরে বললেন: ” মৃত্যুর প্রতি তোমার ভীতির কারণ হচ্ছে, তুমি তোমার ধন সম্পদ থেকে দান খয়রাত করতে বিলম্ব করেছো এবং যদি আগে থেকেই তোমার সঞ্চয়কে (আখিরাতে) পাঠিয়ে দিতে তাহলে তার সাথে মিলিত হওয়ার জন্য তোমার আকর্ষণ থাকত। (তারিখে ইয়াকুবি, ২নং খণ্ড, পৃ. ২০২) উপরোক্ত বিষয় থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, ভিন্ন সময়ে দুই ব্যক্তি একই প্রশ্ন সম্পর্কে ইমাম হাসানের (আ.) নিকট জানতে চেয়েছেন এবং তিনি এ দুই ব্যক্তিকে দু’প্রকার জবাব দিয়েছেন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এ দু’টি প্রশ্নের উত্তর একই, শুধু ব্যক্তিবিশেষ ও সামগ্রিক দৃষ্টিতে এ দু’টি প্রশ্নের উত্তর ভিন্ন। প্রথম প্রশ্নের উত্তরে ইমাম সাধারণভাবে সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিষয় উল্লেখ করেছেন এবং দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে ব্যক্তির বিশেষ ক্ষেত্রে বলেছেন। অর্থাৎ নিজেদের ধন সম্পদকে ফকির ও গরীব ব্যক্তিদের দান না করার উপর ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং এর ফলে নিজেদের
আখিরাতকে ধ্বংস এবং দুনিয়াকে শান্তিময় করার ব্যাপারে দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। আর এর ফলে মৃত্যুকে ভয়ানক মনে হয়। অপরদিকে সম্পদশালীরা যদি গরীব ও অসহায় ব্যক্তিদেরকে সাহায্য করত এবং তাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করত ও নিজেদের ধন সম্পদকে আল্লাহর পথে ব্যয় করত, তাহলে এ কর্মের মাধ্যমে নৈতিক ও সামাজিক শান্তি বজায় থাকত এবং তার আখিরাতও সুখময় হত। আর এর ফলে কোন ব্যক্তি মৃত্যুকে ভয় পেতো না এবং অতি সাধারণভাবে এবং এমনকি আনন্দের সাথে চিরন্তন পরকালের জীবনের উদ্দেশে গমন করত। ইমাম হাসানের (আ.) দ্বিতীয় উত্তরটি থেকে এ বিষয়টি লক্ষণীয় যে, মানুষের নিজের ধন সম্পত্তির প্রতি অনেক আকর্ষণ রয়েছে। তার সম্পত্তি যেখানে জমা হবে, স্বাভাবিকভাবে সেখানেই সে ঝুঁকে পড়বে। যদি এ সম্পত্তি দুনিয়ায় পুঞ্জিভূত করে এবং গরীব-দুঃখী ও আল্লাহর পথে ব্যয় করতে কৃপণতা করে তাহলে তার দুনিয়ার প্রতি টান থাকবে, সে আখিরাতের জন্য একটুও চিন্তা করবে না। কিন্তু যদি কোন ব্যক্তি গরীব-দুঃখী ও আল্লাহর পথে ব্যয় করতে কৃপণতা না করে, তাহলে ইসলামী গ্রন্থ ও আসমানী বার্তা অনুযায়ী তার নিজের ধন সম্পদকে অন্য পৃথিবীতে পাঠিয়ে তার পরকালকে শান্তিময় ও সুখময় করে তুলবে। এভাবেই আখিরাতের প্রতি তার ভালবাসা সৃষ্টি হবে এবং মৃত্যুকে সে ভয় পাবে না।
