ইসলামের মূল বিষয় হচ্ছে ঈমান আর ঈমানের মূল বিষয় হল সঠিক আক্বিদা বা বিশ্বাস। আমাদের যদি আক্বিদা বা বিশ্বাস সঠিক না হয় তাহলে আমল বা কর্মগুলোও সঠিক বলে গণ্য হবে না। তাই আমরা যদি মানবীয় গুণ-বৈশিষ্ট্যে পূূর্ণতা অর্জন করতে চাই তাহলে সর্বপ্রথম আমাদের আক্বিদা বা বিশ্বাসকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। ইসলামে বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে এবং পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের কথা। দ্বিতীয়ত ফেরেশতা, পবিত্র আসমানী গ্রন্থসমূহ, নবী-রাসূল, পরকাল ইত্যাদির ওপর বিশ্বাস। ইসলামের বর্ণিত এ বিশ্বাস কি মানব জাতির কোনো লক্ষ্য নাকি অন্য লক্ষ্যসমূহের জন্য উপায় স্বরূপ? এর সবই মানবের লক্ষ্য; কারণ, ঐশী লক্ষ্য বা উপায় সম্পৃক্ত নয়। এ লক্ষ্যগুলোকে পূর্ণতার পথে মানবের অর্জন বলে ধরা হয়।
বিশ্বাস নিজেই কি মানবের পূর্ণতা, যা তার প্রতি উপদেশরূপে এসেছে? না-কি এ বিশ্বাসগুলোর ইতিবাচক প্রভাবের কারণে এগুলোর ওপর বিশ্বাস পোষণ করতে মানবজাতিকে আহ্বান করা হয়েছে? দার্শনিকরা প্রশ্নটি এভাবে করেছেন ‘বিশ্বাস স্থাপন মানুষের জন্য আশীর্বাদ না-কি উপকারী? ‘আশীর্বাদ’ আর ‘উপকারী হওয়া’ এ দু’টির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আশীর্বাদ নিজেই কাঙ্খিত পূর্ণতা, নিজের জন্য-অন্য কোনো কিছুর জন্য নয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস ভালো তার উপকারী প্রভাবের জন্য। এটা আশীর্বাদের ভূমিকা, নিজে আশীর্বাদ নয়।
ইসলাম নিয়ে আলোচনায় এটা অবশ্যই পরিস্কার হওয়া দরকার যে, প্রভাব নির্বিশেষে একটি লক্ষ্য না-কি আশীর্বাদ। আমরা বিশ্বাসের প্রভাবের কথা বলি, বিশ্বাস দুর্ঘটনার বিপরীতে প্রশান্তি, সহিষ্ণুতা দিয়ে থাকে এবং এর ফলে সমাজে একে অন্যকে বিশ্বাস করে; পরস্পরের উপকার করে, ঈর্ষা থেকে দূরে থাকে।
কিন্তু বিশ্বাস কি ভালো প্রভাবের জন্য? না-কি নিজেই পূর্ণতা অন্বেষণ করে বলে? এখানে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় কিসে হয় মানব পূর্ণতা? বস্তুর পূর্ণতা সংক্রান্ত প্রশ্নের চেয়ে এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া অধিকতর কঠিন। এ বিশ্বে আমরা প্রতিনিয়ত বস্তুর পূর্ণতা নিরূপণ করে থাকি। একটা ভালো আপেল কেমন হওয়া উচিত? এতে স্বাদ, গন্ধ, বর্ণ, আকার-আকৃতি ইত্যাদি বোঝায়। আর যদি একটি আপেল এমন হয় তাহলে বলি আপেলটি পূর্ণতা লাভ করেছে।
একটি পূর্ণ বাড়িও সহজে নির্ধারণ করা যায়, একটি ঘোড়াও। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হলো একজন পূর্ণ মানবের সংজ্ঞা দেয়া। ফলে তাকে নিয়ে বিভিন্ন প্রকার ধারণা খতিয়ে দেখা দরকার, কোনগুলো সঠিক অথবা আমরা যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে না পারি অন্তত কুরআন কীভাবে এবং কতটুকু ধারণা অনুমোদন করে তা দেখা উচিত।
এটা কি বলা ঠিক হবে যে, সেই সত্তা পূর্ণ যে তার বহির্জগৎ-প্রকৃতি থেকে সর্বাধিক পরিমাণ সাফল্য অর্জন করে? কিন্তু না, দু’টি কারণে এটা ভুল; প্রথমতঃ আমরা অন্য কোনো কিছুকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করি না। আমরা বলি না, ঘোড়াটি পূর্ণ; একমাত্র কারণ, সর্বোচ্চ উপকার পেয়ে থাকি। আমরা এর নিজস্ব গুণাবলী ও সম্পদ বিবেচনা করি। আমরা বিবেচনায় নিই না যে, অনেক বেশি পরিমাণ খাবার খায় বলে ঘোড়াটি পূর্ণতা অর্জন করেছে। একটি আপেল বেশি বাতাস, আলো, পানি পেয়েছে বলেই তাকে পূর্ণ বলি না।
দ্বিতীয়তঃ বিবেচনাপ্রসূত নয় যে, যে লোকটি প্রকৃতি থেকে সবচেয়ে বেশি আহরণ করলো- সে পূর্ণমানব। কারণ, এতে মন্তব্য করা যায়, যে প্রকৃতি থেকে কম সুবিধা নিতে পারলো সে ত্রুটিপূর্ণ (পঙ্গু) কোনো মানব!
আমরা দু’টি মানব চরিত্র নিয়ে একটু আলোচনা করি: মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান আশি বছর দীর্ঘ জীবনে প্রচুর পার্থিব কল্যাণ ভোগ করেছেন। চল্লিশ বছর ধরে তিনি সিরিয়ার শাসনকর্তা ছিলেন। (২০ বছর ধরে শক্তিশালী গভর্ণর আর বাকী ২০ বছর প্রভাবশালী খলীফা) অন্যদিকে হযরত আলী (আ.) কঠোর সংযমী জীবন যাপন করতেন যাঁর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল হয়তো বা মুক্ত হওয়া, নয় মহৎ বা মানবিক হওয়া, অথবা এ পৃথিবী থেকে কিছু না নেয়া। তবে আধ্যাত্মিক বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার ব্যাপারটা ছিল নিশ্চিত। যা হোক তাঁর পার্থিব ভোগের পরিমাণ ছিল কয়েক টুকরো রুটি। তাঁকে কি আমরা অসম্পূর্ণ মানবরূপে অভিহিত করবো পার্থিব ভোগ ন্যূনতম বলে?
যদি আমরা এমনটা বলি, তাহলে জন্তুর চেয়েও মানবকে খাটো করে ফেলা হয়। কারণ, এ পৃথিবী থেকে উপকৃত হবার মাপকাঠিতে আমরা জীব-জন্তুকেও মূল্যায়ন করি না; অবশ্য কেউ কেউ মানুষের মূল্যায়নে এর বাইরে কিছু চিন্তাও করে না। তবে এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যে, আধ্যাত্মিক বিষয়াবলি অস্বীকার করে এগুলো বিশ্বাস করবে। এখানে আরেকটি বিষয়ের অবতারণা করা যায়, যদি এ পার্থিব সুখ অর্জন মানবের পূর্ণতার মাপকাঠি না-ই হয় তবে পরবর্তী বিষয়টির ব্যাপারে কী বলা যায়? অর্থাৎ মানবের পূর্ণতা হচ্ছে ¯্রষ্টার উপহার থেকে উপকৃত হওয়া-ঐ উপহার প্রাপ্তির যোগ্যতা অর্জন করা। তবে পার্থিব উপায়-উপকরণ দিয়ে এটা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তাই মানুষ প্রার্থনা করে পরকালে সর্বাধিক পরিমাণে উপকৃত হবার জন্য। এরকম প্রার্থনা নিয়ে ইবনে সিনা বলেন: ‘এরকম লোকেরা প্রার্থনা করে শ্রমিকের মতো যারা বেতনের আশায় পরিশ্রম করে। অর্থাৎ বেতন ছাড়া তাদের কাজের কোনো আগ্রহ নেই।’
ইসলামী যুক্তির নিরিখে এ রকম বিশ্বাসে যে ইবাদাত করা হয় তা ত্রুটিপূর্ণ, যেমন শুধু বেহেশতে পুরস্কারের আশায় আনুগত্য দেখানো, উপাসনা করা। ইমামগণ থেকে এ প্রসঙ্গে প্রচুর সংখ্যক বর্ণনা আছে। ‘যারা ভয়ে ইবাদাত করে, তারা দাসের মতো যেন কেউ মনিবের ভয়ে কোনো কাজ করে।’ একই রকম কথা বলেছেন হযরত আলী (আ.)। (নাহজুল বালাগা, জ্ঞান গর্ভমূলক বাণী : ২২৯)
‘কেউ আল্লাহর উপাসনা করে লোভে; এটা হলো ব্যবসায়িক ইবাদাত; কেউ ভয়ে; এটা দাসের ইবাদাত; কেউ ইবাদাত করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আর এ ইবাদাত বিনয়ীর ইবাদাত।’ অন্যত্র হযরত আলী (আ.) আরও পরিস্কার করে বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমি জাহান্নামের ভয়ে বা জান্নাতের লোভে তোমার ইবাদাত করি না; আমি তোমার ইবাদাত করি; কারণ, তুমি ইবাদাতের যোগ্য।’
কাজেই বস্তুগত সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করার সামর্থ্য দিয়ে মানব পূর্ণতা পরিমাণের ধারণা সঠিক নয়। এমনটি এ পৃথিবীর গুণরাজি অস্বীকার করে বা ভবিষ্যৎ জীবনের পার্থিব সুবিধাদি জমা রেখেও মানব পূর্ণতা পরিমাণের বিষয়টি সঠিক নয়। বিভিন্ন রকম বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে যার সবকিছুই শুধু কল্যাণের ধারণায় পর্যবসিত হয়।
আধ্যাত্মিক ধারণা নিম্নরূপ: ১. সম্ভবত ‘পূর্ণ মানব’ সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাটি হলো জেনো’র ধারণা। বিভিন্ন ধর্মে প্রভাবিত হয়ে তাঁরা এ ধারণার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন। বিভিন্ন ধারণা, যেমন ‘আদম’, ‘নবী -রাসূল’, ‘সিদ্ধপুরুষ’ এবং ‘প্রতীক্ষিত মাহদী’র মতো পূর্ণ মানব থেকেও তাঁরা প্রভাবিত। ম্যাকিনিয়ন ‘ইসলামে পূর্ণ মানব’ নামে বই লিখেছেন। আবদুর রহমান বাদাভী বইটি আরবি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এখানে তিনি বলেন, ‘পূর্ণ মানব তত্ত্ব গ্রীক সনদে প্রাপ্ত নয়; কারণ, এ ব্যাপারে গ্রীক দর্শনে কিছুই বলা হয়নি।’
ইসলামী জগতে সূফীবৃন্দ, যেমন মহিউদ্দীন আরাবী এ বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। অনুরূপ বই-পত্র লিখেছেন আবদুল-করিম দেইলামী, আজিজ আল দীন নাসাফী এবং একজন সূফী কবি সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ বরকতি। জেনো মানবের পূর্ণতার ও পূর্ণ মানব-এর ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা পোষণ করতেন যা অন্যদের কাছে হয়ত পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য ছিল না; তবে তাঁরা চূড়ান্ত নির্ধারণী মন্তব্যে তা উপস্থাপন করতেন।
তাঁরা বিশ্বাস করতেন, একটি সত্য আছে, আর তা হলো স্রষ্টা। অন্য সবকিছু ঐ সত্যের ছায়া মাত্র। তাঁদের ধারণা সবকিছুই স্রষ্টার মহিমা প্রকাশ করে। যদি আমরা ঐ সত্যের পরিচয় না পেয়ে মারা যাই আমাদের মৃত্যু হবে অবিশ্বাসীর, মূর্খের, অন্ধকারের এবং চরম উদাসীনতার মৃত্যু। একজন মানুষ পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় যখন সে ঐ সত্যকে বুঝতে পারে এবং তা অর্জন করে। তাঁদের ধারণা এটা অসম্ভব যে, স্রষ্টা মানুষের মধ্যে উপস্থিত হবেন বা তার সঙ্গে সংযুক্ত হবেন। তাঁদের ধারণামতে রূপধারণ হচ্ছে দ্বৈততা। কাজেই সত্য পাওয়া বা স্রষ্টাকে পাওয়ার অর্থ হলো নিজেকে স্রষ্টায় বিলীন করে দেয়া। আর তা হবে সত্যকে পুরোপুরি উপলব্ধি করার পর আর তখনই সে নিজেকে চিনবে। স্রষ্টা হচ্ছেন একমাত্র সত্য আর বাকী সব কিছুই তাঁর প্রকাশ। এটা মোটামুটি স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর মতো একটা ধারণা। এ ধারণা মতে তাঁরা বিশ্বাস করেন, তা না হলে নির্দিষ্ট নিয়মে ধাপে ধাপে স্রষ্টার দিকে এগুতে হবে। কাজেই জেনো মতবাদের সত্য অর্জনের বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। যে তা অর্জন করতে পারে না সে অপূর্ণ, আর মানবতা নির্ভর করে সত্যকে জানা ও অর্জন করার ওপর।
সত্য ও স্রষ্টার দিকে এগিয়ে যেতে সহায়ক হচ্ছে প্রেম, সহানুভূতি ও পরিচিতি। তাঁর দিকে যাবার পথে দর্শন বা মন দিয়ে নয়- হৃদয় দিয়ে এগুতে হয়। অন্য সকল পূর্ণতা, তাঁর পূর্ণতা থেকে উৎসারিত। আর কেবল এ কারণেই একে পূর্ণতা বলে বিবেচনা করা হয়। সংযম কি পূর্ণতা? তারা বলবেন, হ্যাঁ! কারণ, ঐ পথে চলার জন্য এটা একটা শর্ত। বিনয়, সহায়তা, পথনির্দেশসহ এরূপ আরও বিভিন্ন সদগুণাবলি যেগুলোর নৈতিক কল্যাণ রয়েছে সেগুলো ঐ পথে চলার শর্ত।
২. ঐশী মতবাদে বিশ্বাসী দার্শনিকরা জেনো’র ধারণার সাথে ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁদের মতানুসারে মানবের পূর্ণতা দু’টি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল; ঘটনার স্বীকৃতি ও জ্ঞান। জেনো গুরুত্ব দেন ‘সত্যের’ ওপর, কিন্তু ঐ দার্শনিক গুরুত্ব দেন জ্ঞানের ওপর, যা হলো বস্তু ও তার অস্তিত্বের বাস্তবতা সম্পর্কে উপলব্ধি; সাধারণত জ্ঞান নয়। যেমন : আপেলের বৈশিষ্ট্যাবলি বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত, জ্ঞানের সঙ্গে নয়। আবার একটি নগরী বা বাড়ি সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে জানা আর তার ভিন্ন ভিন্ন অংশ সম্পর্কে জানা এক নয়।
একজন সাধক বিশ্বজগতের বৈজ্ঞানিক ও সঠিক স্বীকৃতির সাধারণ প্রেক্ষাপটে মানবপূর্ণতাকে বিবেচনা করেন। তার কাছে বস্তুগত এ জগৎ বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যা উদ্দেশ্যমূলক জগতের সাথে সংযুক্ত। যেমন: উদ্দেশ্যমূলক জগতে একজন ¯্রষ্টা আছেন, তাঁর চিরন্তন নিয়ম-শৃঙ্খলা, বস্তু ও অবস্তুও রয়েছে সেখানে। বিজ্ঞানসম্মত বা বুদ্ধিবৃত্তিক জগতেও এ বিষয়গুলো নিশ্চিতভাবে বিরাজ করে। তাদের ধারণামতে একজন পূর্ণ মানবকে তাই জ্ঞানের স্বীকৃতি দিতে হবে। আমরা জ্ঞানের সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে আলোচনা করতে পারি; কিন্তু আমরা এর উৎস বা নিয়মনীতি নিয়ে কিছু বলতে অপারগ। পবিত্র কুরআন ঘোষণা করে, তিনি যাকে চান প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দেয়া হয়, তাকে অনেক কল্যাণ দেয়া হয়। আর বিবেক সম্পন্নগণই উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সূরা বাকারা : ২৬৯)
জ্ঞানের পাশাপাশি পূর্ণতার পূর্বশর্ত রূপে এমন সাধক ন্যায়বিচারকে শর্ত বলে মনে করেন-নৈতিক ন্যায়বিচার যার ওপর সামাজিক বিচার নির্ভরশীল। এর অর্থ দাঁড়ায় মানুষের শারীরিক শক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি যা তার অন্তর্নিহিত বিষয়াবলির ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে এ দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য থাকা উচিত। অন্য কথায় বুদ্ধির উচিত সকল ক্ষুধা, তাড়না ও কল্পনার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করা যাতে এগুলোর প্রতিটি শক্তি যোগ্যতা অনুযায়ী পরিমিত অংশ নিতে পারে। সাধকদের পরিভাষায় জ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াবলিকে অনুসন্ধিৎসু বুদ্ধি, আর বিচার সম্পর্কিত বিষয়াবলিকে ব্যবহারিক বুদ্ধি বলে অভিহিত করা হয়।
‘বিশ্বাস’ সংক্রান্ত প্রশ্নটিকে ‘জ্ঞান’ প্রসঙ্গে পুনরায় উত্থাপন করা যায়। জ্ঞান কি মানুষের ‘সমাপ্তি’ বা ‘উপায়’ তুলে ধরে? জ্ঞান নিজেই কি ‘সমাপ্তি’, ‘উপায়’ না-কি উভয়? জ্ঞান কি মানবের পূর্ণতা। যদি তা-ই হয় তাহলে তা সুবিধাদি সম্পর্কিত হয়ে পড়ে, আর সুবিধা ছাড়া তা মূল্যহীন হয়ে যায় এবং যতই সুবিধা ততই এটা ভালো হয়।
৩. তৃতীয় একটি মত অনুযায়ী মানবের পূর্ণতা আবেগ-অনুভূতিতে অন্তর্নিহিত; যেমন প্রেম। এটা একটা নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি যা দাবি করে অন্যদের প্রতি যার সহমর্মিতা বেশি সে-ই পূর্ণ। আর যদি সে অন্যদের প্রতি নামমাত্র সহানুভূতিশীল হয় সে অপূর্ণ এক মানুষ। নৈতিক বঞ্চনার ভিত্তি হচ্ছে স্বার্থপরতা। স্বার্থপরতাকে যে যত বেশি দূরে রাখতে পারে সে তত বেশি পূর্ণ। এ বিষয়ের ওপর হিন্দুরাও বেশ গুরুত্ব আরোপ করেছে। ‘এ আমার বিশ্বাস’ গ্রন্থে গান্ধী এ বিষয়টির ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন। হিন্দু ধর্মে সত্য ও সুন্দর (প্রেম) দু’টির ওপরই জোর দেয়া হয়েছে এবং এ দু’টি বিষয় অস্বীকারকারী পশ্চিমা সভ্যতার সমালোচনা করেছে।
৪. মানবপূর্ণতা নিয়ে আরেকটি মতবাদ হচ্ছে সৌন্দর্য। অবশ্য এ সৌন্দর্য বাহ্যিক নয়, আধ্যাত্মিক। শৈল্পিক বস্তু শৈল্পিক মেজাজ প্রকাশ করে, আর সব সুন্দর বস্তুর সৃষ্টি হয়।
৫. আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি যা পাশ্চাত্য ধারণারূপে খ্যাত তা বস্তুবাদী। এ মতবাদে মানবপূর্ণতা ক্ষমতায় নিহিত। যে ব্যক্তি যত বেশি ক্ষমতাশালী, নিজ গ-ি ও অন্যদের ওপর যত বেশি প্রভাবশালী, সে তত পূর্ণ। ডারউইনের বিবর্তনবাদেও এ ধারণা প্রতিফলিত হয়। ডারউইনের মানদ- অধিকতর পূর্ণ সত্তা নিজের সুরক্ষায় অবশ্যই যথেষ্ট শক্তিশালী এবং টিকে থাকার লড়াইয়ে সে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে সক্ষম। ডারউইনের সমালোচনা করা হয়েছে তাঁর ‘টিকে থাকার লড়াই’ সংক্রান্ত তত্ত্বে নীতি-নৈতিকতার কোনো স্থান না দেয়ার কারণে। অনেক পশ্চিমা প-িতও স্বীকার করেছেন জ্ঞানই মানুষের উপকার করে, তাকে আরও ক্ষমতাবান করে এবং প্রকৃতিতে বিরাজ করে। এভাবে তাঁরা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রচার চালান সভ্যতা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের অনুঘটক রূপে। এ ধারণার প্রয়োগও রয়েছে এবং তা এমন পরিসরে চলছে যে, উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে। তাঁরা জ্ঞান, সততা, প্রেম এবং বিশ্বাস-এর পবিত্রতা অগ্রাহ্য করেছেন যা আগে মানবজাতি বিশ্বাস করতো। তাঁদের মতে সব কিছুই ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করে আর তাই তার মানবিক অগ্রগতির পথ পরিবর্তন করেছে। আর তখন থেকেই মানুষ আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাস ছেড়ে দিয়েছে। যদি তাঁরা আধ্যাত্মিকতার দাবি করেন, তা হবে তাঁদের প্রতিপক্ষের কাজ।
নিৎসে’র দর্শন সমালোচিত হয় অনেক আড়ম্বরতার কারণে। তবে তিনি খোলাখুলি ও পরিস্কার ভাষায় কথা বলতেন। তাঁর যৌক্তিক উপসংহার- ক্ষমতার সেবায় বিজ্ঞান নিয়োজিত, আর মানবের পূর্ণতা স্বীকৃত তার ক্ষমতায়।
ইসলামী একেশ্বরবাদ: মানবের পূর্ণতা প্রসঙ্গে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী? যখন একটি মতবাদ কোনো আদর্শ স্থাপন করতে চায় তখন অবশ্যই নির্দেশিকা ও তা মেনে চলার কারণ জোরালোভাবে উপস্থাপন করে এবং সামনে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য উপস্থাপন করে তা সবাইকে অনুসরণ করতে আহ্বান জানায়। ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে সত্যিকারের একজন মুসলমানের সত্যিকার উদ্দেশ্য। একজন পূর্ণ মানবের ধারণা তুলে ধরা হচ্ছে আসলে ইসলামী আদর্শ ও এতৎসংক্রান্ত নীতিমালা নিয়ে একটি মৌলিক আলোচনা। মানব-পূর্ণতা এবং একটি পূর্ণ-সত্তা নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে। এখানে একটি উপসংহার টানা হবে।
জেনো-এর ধারণামতে ‘সত্য’ হচ্ছে সবকিছুর ভিত্তি। ‘সত্য’ শব্দটি দিয়ে তাঁরা ‘স্রষ্টা আভাস’ এবং সৃষ্ট সকল আকার-আকৃতি ও বস্তু ‘স্রষ্টা প্রকাশ’ বলে অর্থ করেন। এভাবে যে ‘সত্য’ স্রষ্টা তা ছাড়া অন্য সবকিছুই তাঁর ছায়া, তবে সত্য নিজেই এক বাস্তবতা। স্রষ্টা বলতে পরম প্রভুকে বোঝানো হয়েছে, কেউ যাঁর সমকক্ষ নয় বা যাঁর সাথে তুলনীয় নয়। তাঁরা আরো বিশ্বাস করেন, মানুষ স্রষ্টা সাথে মিশে যেতে পারে অথবা তাঁরা যেমন বলেন, স্রষ্টায় বিলীন হয়ে যেতে পারে। মানুষ একটি সত্তা, তার স্রষ্টা থেকে ভিন্ন সত্তা; মানবের পূর্ণতা বা সুখ তার উৎস-স্রষ্টার কাছে ফিরে যাওয়ার মধ্যে নিহিত। তাঁরা এ লক্ষ্য অর্জনের পথ ও উপায় প্রদর্শন করেন, আর তা একজন মানুষের সারা সত্তায় নিহিত যেমন এর হৃদয় এবং তার পরিবর্তন-পরিবর্ধন যা পূর্ণ একত্বের পথের প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে দেয়। তাদের উপায় হলো প্রেম, উপাসনা ও আত্মশুদ্ধি।
ঐশী মতবাদে বিশ্বাসী দার্শনিকরা বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখেন। তাঁরা বলেন, মানুষের অস্তিত্ব তার বুদ্ধিতে আর বাকী সব বিষয় দ্বিতীয় পর্যায়ের। বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার পূর্ণতার দু’টি দিক: অনুসন্ধিৎসু ও ব্যবহারিক। অনুসন্ধিৎসু বা তাত্ত্বিক দিকে আছে জ্ঞান যার অর্থ হলো যা যেমন আছে তাকে সেভাবে উপলব্ধি করা, আর ব্যবহারিক দিকে আছে ন্যায়বিচার। ন্যায়বিচার বলতে বোঝায় মানবের সমগ্র সত্তার ওপর অন্তর্নিহিত কোনো কামনা যা শক্তি নয়- বুদ্ধিবৃত্তিই বিজয়ী হবে। প্লেটো তাঁর ‘থিওরী অব রিপাবলিক’-এ এমন একটি বিষয় তুলে ধরেন যে, দার্শনিকরা শাসকে বা শাসকবর্গ দার্শনিকে রূপান্তরিত হন। এ তত্ত্বটি ব্যক্তি পর্যায়েও ব্যবহার করা যায় এবং বলা হয়, একজন তখনই সুখী হয় যখন তার অস্তিত্ব দর্শন দিয়ে পরিচালিত হয়। তাঁদের মতে সত্য অর্জন বিবেচ্য বিষয় নয়; তাঁরা চিন্তাধারা এবং প্রতিক্রিয়ার ওপর জোর দেন- হৃদয় বা আত্মার ওপর নয়। ঐ লক্ষ্য অর্জনের পথ হলো বুদ্ধিবৃত্তি, যুক্তি এবং কার্যকারণ।
অন্য একটি গোষ্ঠী প্রেমকে মানবপূর্ণতা বলে বিবেচনা করে। এর অর্থ নিজেকে ভুলে যাওয়া এবং অন্যদের ভালোবাসা যাতে আপন-পরের মধ্যে কোনো সীমারেখা না থাকে। আর যখনই কোনো পছন্দের প্রশ্ন আসে তখন অন্যকে নিজের ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারও মানবিক আবেগ-অনুভূতি তার সীমারেখার লক্ষ্য পর্যন্ত বিকশিত হলে তাকে পূর্ণ মানব বলা যেতে পারে।
আবার অন্য একটি মতবাদে পূর্ণমানবের অস্তিত্ব রূপে সৌন্দর্যের কথা বলা হয় যে সৌন্দর্য হবে আত্মিক, বাহ্যিক নয়। বাহ্যিক সৌন্দর্য কোনো গুরুত্ব বহন করে না। সক্রেটিস এর ধারণার মূল কথা ছিল এটি। তাঁরা বলেন, সত্যবাদিতা ভালো; কারণ, তা সুন্দর। ‘ভালো’ শব্দটি বোধ এবং বুদ্ধি উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।
জ্ঞান তাঁদের জন্য একটি পূর্ণতা, কারণ, তা সুন্দর। বিপরীতে মূর্খতা, ক্ষমতা, দায়ভার এবং দূর্বলতাও একই মানদ-ে বিচার্য। কবিতা, শিল্প এবং মৌলিকত্বের অর্থ দাঁড়ায় সুন্দরের সৃষ্টি, আর এ সুন্দরের ¯্রষ্টাও নিজে সুন্দর এবং সুন্দর সৃষ্টিতে সক্ষম। কেবল সুন্দর আত্মা-ই সুন্দর কবিতা বা সুন্দর আঁকতে পারে। কাজার বংশীয় এক রাজা সম্পর্কে একটি গল্প শোনা যায়। তিনি দু’লাইনের একটি ছন্দের একটি লাইন লিখলেন; দ্বিতীয় লাইনটি আর লিখতে পারলেন না। তিনি বিভিন্ন কবির সহায়তা চাইলেন। অবশেষে একজন দ্বিতীয় লাইনটি লিখলো যা সবচেয়ে মানানসই। প্রথম লাইনটি ছিল ‘ইউসূফের মতো সৌন্দর্য আর কেউ দেখেনি’ আর দ্বিতীয় লাইনটি হলো ‘তবে যে ইউসূফকে সৃষ্টি করেছেন, প্রকৃত সৌন্দর্য তাঁরই। এটা খুবই সত্য কথা শুধু পরম সৌন্দর্যের অধিকারী স্রষ্টা-ই পারেন তাঁর সৃষ্টির মাঝে সৌন্দর্য ভরে দিতে।
এবার আসুন এসব মতবাদ সম্পর্কে ইসলামে কী মন্তব্য পাওয়া যায়। ‘সত্য’-ই পূর্ণতা- ইসলাম কি এটা মেনে নিয়েছে? আমরা সামগ্রিকভাবে জোনো-এর মতবাদ গ্রহণ করতে পারি না। কারণ, ইসলাম অনুসারে, পিতা বলতে যে ভাব প্রকাশ পায় স্রষ্টা তেমন কোনো স্রষ্টা নন (পিতা তার মতো আরও সত্তা জন্ম দিতে সক্ষম)। যদি তা-ই হয়, সৃষ্টির কর্ম সম্পাদনের পর তিনি কে? তিনি কি পিতার মতো যার সন্তানাদি আছে? না-কি কেবল সৃষ্টের জীবিকা প্রদান করেই ক্ষান্ত। না-কি অ্যারিস্টটল যেমন বলেছেন প্রথম চালিকা শক্তি?
ইসলামে স্রষ্টার ব্যাপারে যুক্তি, ‘তাঁর সাথে কারও তুলনা হয় না’ এ যুক্তির চেয়ে উঁচু স্তরের। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ আসমান যমিনের নূর’-(সূরা নূর: ৩৫) অর্থাৎ তিনি তিনিই, অন্য সব কিছু তাঁর অধিকারভুক্ত। কুরআনের অন্যান্য বর্ণনায় পাওয়া যায় তিনি ‘পরম সত্য’। কুরআনে আরো বলা হয়েছে: ‘আমরা শিগগিরই তাদেরকে বিশ্ব জগতে ও তাদের হৃদয়ে আমাদের চিহ্ন দেখাবো যাতে তাদেরকে নিশ্চিত করা যায়- কুরআন সত্য।’ (সূরা হা-মীম আস সাজদা: ৫৩) আসলে, যখন কেউ আল্লাহকে বিশ্বাস করে, তার জন্য সব কিছুই হ্রাস পেয়ে অনস্তিত্বে রূপান্তরিত হয়। কারণ, সে এমন জিনিস পেয়েছে যার তুলনায় আর সব কিছুই মূল্যহীন। সাদী তাঁর কাব্যগ্রন্থ
বুস্তানে বিষয়টি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন-
‘বুদ্ধিজীবির জন্য এ পথ গোলক ধাঁধাঁ,
তবে জ্ঞানীদের জন্য আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ নেই।’
তিনি তখন তার প্রশ্নের জবাব দেন:
‘হে আমার বিজ্ঞ বন্ধু! ভালো প্রশ্ন করেছো; আমি তোমার বুদ্ধিবৃত্তিক অনুমোদনের জবাব দেব। এই যে সূর্য, সাগর, পাহাড়, আকাশ, মানুষ, দৈত্য-দানব, জ্বিন এবং ফেরেশতাবর্গ, যা-ই হোক না কেনো, তারা স্রষ্টার অস্তিত্বের সামনে অস্তিত্বের প্রশ্নে অতি নগণ্য।’
যদি তিনি-ই সত্তা, বাকী সব কিছু অনস্তিত্ব হয়, তাহলে স্রষ্টাকে চেনার পর কারও পক্ষে অন্যদিকে ফিরে যাওয়া বা অন্য কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ অসম্ভব। কাজেই স্রষ্টার সাথে অন্য কোনো ¯্রষ্টার তুলনা করার সম্ভাবনা অপেক্ষা ইসলাম অনুযায়ী বিশ্বাস অনেক ঊর্ধ্বে। স্রষ্টা সত্য, বাস্তবতা যাঁর সামনে আর কিছুই সত্য বা আসল নয়।
কিন্তু সাধকরা যে জ্ঞান-এর কথা বলেন ইসলামে কি তা গুরুত্বপূর্ণ? জ্ঞান সংক্রান্ত নীতি-যা যেমন আছে তার স্বীকৃতি-এটা ইসলামে অনুমোদন পায়। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘ তিনি যাকে চান প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দেয়া হয়, তাকে অনেক কল্যাণ দেয়া হয়। আর বিবেক সম্পন্নগণই উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সূরা বাকারা: ২৬৯) এ আয়াত আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করবো? জ্ঞানকে বলা হয়েছে মানবীয় কল্যাণ এবং তা প্রায় পূর্ণতার কাছাকাছি- তা কেবল প্রয়োজনীয় তা নয়।
ন্যায়বিচার অর্থাৎ সামাজিক ন্যায়বিচারও অনুরূপ। অবশ্য সামাজিক ন্যায়বিচার নৈতিক বিচার প্রসঙ্গে ব্যক্তি পূর্ণতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। ইসলাম বিশ্বাস করে ক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ আবেগ-অনুভূতির প্রতি নমনীয় সম্মানবোধ বজায় রাখা, তবে তা আড়ম্বরতা প্রত্যাখ্যান করে। এক বুদ্ধিবৃত্তিক বা বিশ্বাসের শাসনকে ইসলাম যথেষ্ট রূপে অনুমোদন করে না। মানব শক্তির দার্শনিকতাকে ইসলামে দেখা হয় মানব শাসনের অনুপযুক্তরূপ দুর্বলতা হিসাবে। বিশ্বাসের সাথে দর্শনের সংযোগ হলে তা গভর্নর হিসাবে ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। তবে ইসলামে ‘প্রেম’ প্রসঙ্গে নবীজীর হাদীস অপেক্ষা আর বেশি কী বলা যায়? দয়া ও পারস্পরিক সহনশীলতা প্রসঙ্গে আমাদের পয়গাম্বর (সা.) তাঁর সাহাবীদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বিশ্বাসের কোন্ শাখাটি অধিকতর শক্তিশালী?’ তাঁদের প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দিলেন, কেউ বললেন, ‘নামায’, কেউ ‘রোযা’, কেউ বললেন, ‘হজ্ব’ ইত্যাদি। তিনি বললেন, ‘তোমরা যা বলেছ তা সত্য, তবে এদের কোনোটি-ই সবচেয়ে শক্তিশালী নয়।’ তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে সেটা কী?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় অন্যকে ভালোবাসা।’
ওপরের বিশ্বাসগুলোর কোনটি গুরুত্ব বিবেচনায় প্রথম, আর কোন্গুলো এর পরিপূরক? ইবাদাত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: ‘আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে আমার ইবাদাত করা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি।’
কাজেই ইবাদাতকে উদ্দেশ্য হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যদিও কেউ কেউ এটা মানতে নারাজ। আমরা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি সেসব মতবাদ যা বস্তুগত সুবিধাদি সমুন্নত করে এবং মানবের পূর্ণতা এবং পূর্ণ সত্তার অস্তিত্বও অস্বীকার করে। তাঁরা জ্ঞানসহ সব কিছুকে মানবজাতির জন্য কল্যাণকর বলে বিবেচনা করে থাকেন।
বেকনের সময় থেকে মানুষের চিন্তাধারা এমনই ছিল। আজ দাবি করা হয় সমাজ উন্নত হয়েছে, বিবর্তিত হয়েছে। তাহলে কোন্ সমাজ বেশি পূর্ণ? সে সমাজ যা বাস্তবতার কাছাকাছি না বিশ্বাসের? নাকি সে সমাজ যেখানে জ্ঞান, ন্যায়বিচার বা প্রেম আছে? তাঁরা বলেন: ‘না, এটা সে সমাজ যা বেশি স্বার্থ নিশ্চিত করে, বেশি প্রযুক্তি, আরও বেশি বিজ্ঞানময় যার সবটাই মানবজাতিকে উন্নততর আরাম-আয়েশ এবং বস্তুগত স্বার্থ উপহার দেয়।’ এই যে অধিকতর স্বার্থ যা তাঁরা দেখতে পান তা জীব-জন্তু ও বৃক্ষলতা যা ভোগ করে তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। এগুলো শারীরিক স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধি, ক্ষুধা ও কামনা-বাসনা তৃপ্তিই নিশ্চিত করে মাত্র। কাজেই তাঁদের মতে জীবজন্তু ও বৃক্ষ লতার পূর্ণতা ছাড়া আর কোনো মানবিক পূর্ণতা থাকতে পারে না। বিজ্ঞানও মানুষের তেমন যেমন একটি জন্তুর জন্য শিং যা অস্ত্র হিসাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যবহৃত হয়।
আসুন এবার আমরা উপাসনার কথায় আসি। কেন ইবাদাত করবো? দু’টি দৃষ্টিতে এটা দেখা যেতে পারে। সাধারণ মানুষের জন্য উপাসনা পরবর্তী জীবনে আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার পাওয়ার উপায়। এ পৃথিবীর পুরস্কার সীমিত, তাই ইবাদাত এ জীবনের পর আরো গভীরতর এবং বৃহত্তর পরিসরে পুরস্কার পাবার আশা জাগ্রত করে। যেমন: হুর, বেহেশতী প্রাসাদ, মধু, সুস্বাদু ফল ও পানীয় ইত্যাদি। কিন্তু এটাও জীবের পূর্ণতার বাইরে কিছু নয় যদিও তা চিরকালের জন্য দেয়া হবে। ইবাদাতের অন্য অর্থও থাকতে পারে। যা দাসের ইবাদাত নয় যে পরকালে পুরস্কার লাভ করা যাবে। শারীরিক বা বস্তুগত দুঃখ-দূর্দশা থেকে মুক্তি লাভও উদ্দেশ্য নয়। এটা প্রাণীর ক্ষুধা থেকে অনেক দূরের বিষয়। এ ইবাদাত প্রেমের, আবেগ-অনুভূতির, কৃতজ্ঞতার। তখনই ইবাদাতের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় যা সত্যের প্রেম-এর সমার্থক-সমমানের। স্রষ্টা আর তখন ইহকাল বা পরকালে জীবনের উপায় রূপে বিবেচিত হন না। স্রষ্টা-ই তখন নিজে সত্য এবং প্রকৃত লক্ষ্য রূপে উদ্ভাসিত হন। এ ধরনের ইবাদাত অনেক উন্নত স্থানে সমাসীন; কারণ, এটা মাধ্যম নয়, ঐ সত্তায় তার সমাপ্তি।
এভাবে ইবাদাতের বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। পরকালে জীবের কামনা-বাসনা পূরণের জন্য ইবাদাত-যা ইবাদাতের অনুপস্থিতিতে তুলনামূলক এক প্রকার পূর্ণতা বোঝায় এবং তা বস্তু সাম্রাজ্যে এক প্রকার ইতিবাচক সহাবস্থান। কারণ, এর অর্থ দাঁড়ায় ¯্রষ্টার কাছে চিরস্থায়ী কিছু একটা কামনা করা-এ জগতে স্বার্থপরতা ও কামনা-বাসনার পরিবর্তে। তবে এরকম ইবাদাত সত্যিকার ইবাদাতের তুলনায় অনেক নিম্ন মানের। কাজেই ইবাদাত বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল এবং বিশ্বাস নির্ভর করে সত্যের ওপর। ইসলাম মানবজাতিকে জ্ঞান, ন্যায়বিচার, প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রতি আহ্বান জানায়। কিন্তু প্রধান লক্ষ্য কোনটি? এর সবগুলোই কি সমান গুরুত্ববহ? নাকি এর একটি প্রধান উদ্দেশ্য এবং অন্যগুলো এর পরিপূরক?
আমরা মনে করি, লক্ষ্য হচ্ছে ‘সত্য’ (স্রষ্টা) আল্লাহ্। ইসলামী একেশ্বরবাদের কেবল এ অর্থই গ্রহণযোগ্য। যদি ইসলাম অন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করে, যেমন: বেহেশত-দোযখ থেকে পলায়ন, এগুলো দ্বিতীয় সারির গুরুত্ব বহন করে। জ্ঞান নিজে লক্ষ্য নয় তবে সত্যের অন্বেষণে সহায়ক। ন্যায়বিচার ও মানবাত্মার পশুত্ব দমনে এবং সত্যের পথে কৃত্রিম বাধা-বিপত্তি দূরীকরণে কল্যাণকর। প্রেমও সত্য অর্জনে সহায়তা করে। বিশ্বাস যা ইসলামের লক্ষ্য হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস কি দূর্দশা দূরীকরণে, আগ্রাসন প্রতিরোধে এবং পারস্পরিক আস্থা স্থাপনে ভূমিকা পালনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ? স্রষ্টা বিশ্বাস নিজেই একটি লক্ষ্য। বিশ্বাসের প্রভাব, যা অসংখ্য মানুষকে স্রষ্টা সাথে সংযুক্ত করে, আর ইসলামের দৃষ্টিতে এ সংযোগ-ই হচ্ছে পূর্ণতা।-প্রত্যাশা, বর্ষ-১, সংখ্যা-১####
1.2k
আগের পোস্ট
