ভাষান্তর: হুজ্জাতুল ইসলাম মো: আলী মোর্ত্তজা
হতভাগা ব্যক্তি:
১। শয়তান: সে ছয় হাজার বছর আল্লাহর ইবাদাত করেছে। কিন্তু অহংকারের জন্য সে ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরশাদ হচ্ছে: “(সে সময়কেও স্মরণ কর) যখন আমরা ফেরেশতাদের বললাম, ‘আদমকে সিজদা কর’, তখন ইবলিস ব্যতীত সকলেই সিজদায় নত হল; সে অমান্য করল এবং অহংকারী হয়ে গেল; আর সে তো অবিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলই।” (বাকারা-৩৪)
২। বালয়াম বাউরা (ইহুদি পন্ডিত)
সূরা আ’রাফের ১৭৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
“হে নবী! আপনি মানুষের কাছে ওই ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করুন যাকে আমি আমার ক্ষমতা সম্পর্কে নিদর্শনাবলী দিয়েছিলাম। কিন্তু সে অকৃতজ্ঞ হয়ে তা বর্জন করে এবং শয়তান তাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে। আর সে বিপথগামীদের দলভুক্ত হয়।”
এ আয়াতে বনি ইসরাইলের বালাম বাউরা নামের একজন পন্ডিত ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। এ পন্ডিত প্রথমে হযরত মূসার (আ.) অনুসারী তথা মুমিন ছিল, কিন্তু পরে শয়তানের প্ররোচনায় পথভ্রষ্ট হয়ে ফেরাউনের দরবারে যোগ দেয়। ফেরাউনের রাজদরবারের বাহ্যিক চাকচিক্য ও জৌলুস তাকে এতটা ধোঁকায় ফেলে দেয় যে, সে হযরত মূসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে তৎপর হয়ে মন্দ পরিণতির শিকার হয়। তাওরাতেও তার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
দুনিয়ার লোভ-লালসা ধর্মীয় পন্ডিত বা আলেমদেরকেও ধোঁকায় ফেলতে পারে। বালাম বাউরার পরিণতি থেকে সব আলেমেরই শিক্ষা নেয়া উচিত। নিজের অতীত নিয়ে অহংকার করা ঠিক নয়। পতনের বিপদ সব সময়ই রয়েছে এবং যে যত বেশী উপরে উঠবে তার তত বেশী নীচে পড়ার আশংকা বেশী। যে আল্লাহর পথ ছেড়ে দেয় সে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে। দুনিয়ার লোভ ধর্মীয় পন্ডিত বা আলেমকেও শয়তানের শিকার বা শয়তানের দোসরে পরিণত করে।
সূরা আ’রাফের ১৭৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আমি ইচ্ছে করলে এ নিদর্শন ও যে জ্ঞান তাকে দিয়েছি তার মাধ্যমে তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করতে পারতাম। কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং তার কামনা বাসনার অনুসরণ করে। তার অবস্থা এমন কুকুরের মতো যে, তাকে আপনি কষ্ট বা আঘাত দিলে সে জিভ বের করে হাঁপাতে থাকে এবং কষ্ট না দিলেও জিভ বের করে হাঁপায়। যারা আমার নিদর্শনকে অবিশ্বাস করে, তাদের অবস্থা এ রকম; আপনি এ ঘটনা তাদের কাছে বলুন, যেন তারা চিন্তা করে।”
এ আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন, আমি তাকে মর্যাদা দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে নিজেই দুনিয়ার লোভ ছাড়তে পারেনি। আমি তাকে উন্নতি ও মর্যাদার মাধ্যম দিয়েছিলাম, কিন্তু সে নিজেই উঁচুতে উঠতে তথা মর্যাদা নিতে চায়নি। সে দুনিয়ার লোভের কারণে শয়তানের ফাঁদে পড়ে এবং যা কিছু সে অর্জন করেছিল তা হারিয়ে ফেলে।
পবিত্র কুরআন উদাসীন মানুষকে চতুস্পদ জন্তুর সাথে তুলনা করেছে এবং দুনিয়াপূজারী পন্ডিতকে কুকুরের সাথে তুলনা করেছে। কুকুর সব সময় মুখ থেকে জিভ বের করে রাখে এবং এমনভাবে লালা ঝরাতে থাকে যে মনে হয় তার লোভের কোনো শেষ নেই। অর্থ-বৈভব, খ্যাতি, যশ এবং সম্মানের লোভ মানুষের অহংকার থেকে উদ্ভুত হয়। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন: জ্ঞান বাড়লেও সঠিক পথের দিশা বা হেদায়াতের চেতনা যার মধ্যে বৃদ্ধি পায় না, সে জ্ঞান তাকে আল্লাহ থেকে আরো বেশী দূরে সরিয়ে দেয়।
৩। হযরত মুসার (আ.) গোত্রের কিছু লোক নীল দরিয়া পার হওয়ার পর হযরত মুসার (আ.) কাছে মূর্তি পুজার অনুরোধ জানিয়ে বলেছিল: “আর বনী ইস্রাঈলকে আমি সমুদ্র পার করিয়ে দিলাম, অতঃপর তারা মূর্তি পূজায় রত এক জাতির সংস্পর্শে এল। তারা বলল, ‘হে মূসা! ওদের যেমন বহু দেবতা রয়েছে, তেমনি আমাদের জন্যও একটি দেবতা বানিয়ে দিন। সে বলল, তোমরা তো এক মূর্খ জাতি।”
এর থেকে বড় মূর্খতা ও বোকামি আর কি হতে পারে যে, যে মহান আল্লাহ ফিরআউনের মত বড় শত্রুর হাত হতে তাদেরকে শুধু পরিত্রাণই দেননি; বরং তাদেরই চোখের সামনে তাকে তার সৈন্য-সামন্তসহ ডুবিয়ে মারলেন এবং তাদেরকে অলৌকিকভাবে সমূদ্র পার করিয়ে দিলেন, সেই আল্লাহকেই তারা সমুদ্র পার হয়েই ভুলে গিয়ে নিজ হাতে গড়া পাথরের মূর্তির খোঁজ শুরু করে। বলা হয় যে, তাদের ঐ মূর্তিগুলো গাভীর আকারে পাথরের তৈরী ছিল।
৪। কিছু আহলে কিতাব: আহলে কিতাবের কিছু লোক মহানবী (সা.) সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও সত্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল। সূরা বাকারার ৮৯ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে: “আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের কাছে রাখা নিদর্শনের সমর্থক কিতাব আসার পরও তারা সেই কিতাব অগ্রাহ্য করল। অথচ এর আগে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে তারা তাদের কাছে রাখা নিদর্শনের সাহায্যে বিজয় প্রার্থনা করত। কিন্তু যখন তাদের কাছে তা আসল, তখন তারা সেটি প্রত্যাখ্যান করল। সুতরাং অবিশ্বাসীদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ।”
এ আয়াতে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইহুদীদের কথা বলা হয়েছে, যারা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ তাওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী ইসলামের নবীর আগমনের অপেক্ষায় ছিল এবং নিজেদের ঘর-বাড়ি ও মাতৃভূমি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিল হিজাজে।
মদিনা ও মদিনার আশেপাশে বসতিস্থাপনকারী ইহুদীরা মুশরিকদেরকে বলত, খুব শিগগিরই আবির্ভূত হবেন মুহাম্মদ নামের একজন নবী যিনি শত্রুদের ওপর বিজয় লাভ করবেন৷ ইহুদীরা ওই নবীর প্রতি ঈমান আনারও কথা বলত। কিন্তু সত্যিই যখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) আবির্ভূত হলেন এবং মদীনায় হিজরত করলেন, তখন দেখা গেল ইহুদীরা তাদের গোঁড়ামী ও বস্তুপূজার কারণে ঈমান আনতে অস্বীকার করল। অপরদিকে মদিনার মুশরিকরা দলে দলে ঈমান আনল এবং গ্রহণ করল ইসলাম।
এ আয়াত থেকে বোঝা যায় স্রেফ জ্ঞানই যথেষ্ট নয় বরং সত্যকে গ্রহণ ও তা মেনে চলার মনোভাবেরও প্রয়োজন। ইহুদীরা এবং তাদের পুরোহিতরা মহানবী (সা.) সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও সত্য গ্রহণ ও তা মেনে নিতে পারেনি।
৫। ছা’লাবা: সে মহানবীর কাছে এসে বলল, দোয়া করুন আমি যেন ধনি হতে পারি। যখন তার সম্পদ বৃদ্ধি পেল সে যাকাত দিতে অস্বীকার করল। তার এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের জন্য আয়াত অবতীর্ণ হল: সূরা তাওবার ৭৫ ও ৭৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “তাদের মধ্যে অনেকেই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তিনি যদি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন, তাহলে অবশ্যই আমরা সাদাকা প্রদান করব এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে থাকব। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে দান করলেন, তখন তাতে তারা কার্পণ্য করেছে এবং (অঙ্গীকার) ভঙ্গ করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।”
একবার ছা’লাবা নামে মদিনার এক মুসলমান ব্যক্তি মহানবীর (সা.) কাছে এসে আর্জি পেশ করলো যে, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি দোয়া করে দিন, আল্লাহ তায়ালা যেন আমার ধন-সম্পদ আরো বাড়িয়ে দেন। রাসূল (সা.) তাকে বললেন, কৃতজ্ঞতা আদায় করা অসাধ্য এমন অপরিমিত সম্পদের চেয়ে পরিমিত সম্পদ অনেক উত্তম। কারণ এর কৃতজ্ঞতা আদায় করা সম্ভবপর।
আল্লাহর রাসূলের এই কথা শুনে লোকটি বললো, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আল্লাহপাক যদি আমাকে দান করেন তাহলে আমি অবশ্যই তার যাকাত এবং সাদাকা প্রদান করবো। এরপর মহানবীর (সা.) দোয়ার বরকতে লোকটির সম্পদ দিন দিন বৃদ্ধি পেল। এরপর দেখা গেল লোকটি এতবেশি সম্পদশালী হয়েছে যে, নামাজের জামাতেও আসতে পারছেন না। এক পর্যায়ে তার কাছে যাকাতের জন্য লোক পাঠানো হলে সে যাকাত দিতে অস্বীকার করে বসলো। কাজেই কৃতজ্ঞতা, নিয়ামতের স্বীকৃতি দান ও প্রতিশ্রুতি পুরনের মত চারিত্রিক গুণাবলী মুনাফিকদের মধ্যে অনুপস্থিত।
মানুষের যদি যোগ্যতা না থাকে অর্থাৎ কেউ যদি উপযুক্ত না হয় তাহলে ঐশী কল্যাণও তার জন্য অমঙ্গল হয়ে দেখা দেয়। অকৃতজ্ঞ ও ওয়াদা ভঙ্গকারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় ধন-সম্পদের প্রাচুর্য তাদের জন্য প্রশান্তিদায়ক হয় না। এগুলো তাদের জন্য অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া মহান আল্লাহ ধনি মানুষের সম্পদে গরীবের অধিকার নির্ধারণ করেছেন। কাজেই যারা গরীবের এই অধিকার আদায় করে না, তাদের জন্য এই ধন-সম্পদই অকল্যাণ ও অশান্তির উপাদান হয়ে দেখা দেয়।
৬। হিসান বিন ছাবেত: সে গাদীরের হাদিস ও ঘটনা নিয়ে সর্বপ্রথম কবিতা লিখেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে হযরত আলীর (আ.) শত্রুদের সাথে যোগ দিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
৭ ও ৮। তালহা এবং যুবাইর: দুজনই হযরত আলীর (আ.) সাথী ছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমতার লোভে ধ্বংস হয়ে যায়।
৯। শাবাছ বিন রাবি: সে সিফফিনের যুদ্ধে হযরত আলীর (আ.) সাথেই ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে দুনিয়ার মোহে পড়ে কারবালায় ইমাম হুসাইনের (আ.) শত্রু ইয়াযিদের পক্ষে লড়াই করেছিল।
১০। নাজ্জাশি: সে হযরত আলীর (আ.) ভক্ত ছিল। কিন্তু এক খারাপ বন্ধুর পাল্লায় পড়ে রমজান মাসে মদ পান করার কারণে মাওলা আলী (আ.) তাকে চাবুক পেটা করেন। শেষ পর্যন্ত সে আমীরে মুয়াবিয়ার দলে যোগদান করে এবং ধ্বংস হয়ে যায়।
সৌভাগ্যবান ব্যক্তি:
১। ফিরাউনের গোত্রের কিছু লোক: তারা প্রথমে ফিরাউনের সাহায্যকারী ছিল। কিন্তু যখন হযরত মুসার (আ.) মোজেজা দেখল তখন তারা হযরত মুসার (আ.) প্রতি ঈমান আনল। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে: “এবং জাদুকররা ফেরাউনের কাছে এসে বলল, আমাদের জন্য কি কোন পারিশ্রমিক নির্ধারিত আছে, যদি আমরা জয়লাভ করি?” (আ’রাফ-১১৩)
সূরা আ’রাফের ১১৯ ও ১২০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “ফিরাউন ও তার সঙ্গীরা মোকাবিলার ময়দানে পরাজিত হলো এবং (বিজয়ী হবার পরিবর্তে) উল্টো তারা লাঞ্ছিত হলো। আর জাদুকররা শ্রদ্ধায় সিজ্দাবনত হলো।”
জাদুকরদের বিরুদ্ধে হযরত মূসার (আ.) বিজয়ের মধ্য দিয়ে ফিরাউন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তার সম্মান-মর্যাদায় বড় আঘাত আসে। ফিরাউন জনসমক্ষে হযরত মূসাকে (আ.) লাঞ্ছিত করে জনগণকে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো ঘটনাটিই ঘটে। যে জাদুকরদের দিয়ে মূসা (আ.) কে মিথ্যা প্রমাণিত করার চেষ্টা করেছিল, সেই জাদুকররা পর্যন্ত ফিরাউনের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো এবং মূসা (আ.)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলো। তারা আল্লাহকে মেনে নিয়ে তার সামনে সিজদাবনত হলো। যেসব জাদুকর কিছু সোনা-কড়ির লোভে ফেরাউনের দরবারে এসেছিল, তারা সব স্বার্থ ত্যাগ করে মূসা (আ.)-এর কাছে আত্মসমর্পণ করলো।
সূরা আ’রাফের ১২১, ১২২ ও ১২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “তারা বলতে লাগল: আমরা ঈমান আনলাম বিশ্বজাহানের রবের প্রতি। যিনি মূসা ও হারুনেরও রব। ফেরাউন বলল: আমার অনুমতি দেবার আগেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে? নিশ্চয়ই এটা কোন গোপন চক্রান্ত ছিল। তোমরা এ রাজধানীতে বসে এ চক্রান্ত এঁটেছো এর অধিবাসীদের ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য। বেশ, এখন এর পরিণাম তোমরা জানতে পারবে।”
জাদুকররা হযরত মূসা (আ.)-এর মোজেজার সামনে মাথানত করতে বাধ্য হন। তারা এটা মেনে নেন যে, মূসা (আ.) কোন জাদুকর নন, তিনি যা করেছেন, তা সত্য। তিনি কোনো ধোঁকা দেননি। এ কারণে তারা হযরত মূসার (আ.) মোজেজা দেখার সঙ্গে সঙ্গে সিজদাবনত হয়ে পড়ে এবং সিজদা থেকে ওঠে এ ঘোষণা দেয় যে, মূসা (আ.) হচ্ছেন আল্লাহর রাসূল এবং তার প্রতিপালক আল্লাহই হচ্ছে গোটা বিশ্বের প্রতিপালক। আমরা বিশ্ব জাহানের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছি। এ পরিস্থিতির জন্য ফিরাউন প্রস্তুত ছিল না। সে এ অপবাদ দিতে থাকে যে, মুসা (আ.)-এর সঙ্গে মিলে জাদুকররা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে।
সূরা আ’রাফের ১১২ থেকে ১২৬ পর্যন্ত আয়াত ছাড়াও সূরা তাহা’র ৬৫ থেকে ৭৩ নম্বর আয়াতে এসকল সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
২। ফুযাইল বিন আইয়াজ: নিম্নের আয়াতটি শ্রবণ করে তিনি গোনাহ থেকে তাওবা করে সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যান। ইরশাদ হচ্ছে: “যারা ঈমান এনেছে তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে তার কারণে বিগলিত হওয়ার সময় হয়নি? আর তারা যেন তাদের মত না হয়, যাদেরকে ইতঃপূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল, তারপর তাদের উপর দিয়ে দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হল, অতঃপর তাদের অন্তরসমূহ কঠিন হয়ে গেল। আর তাদের অধিকাংশই ফাসিক ও পাপাচারী।” (হাদিদ-১৬)
ফুযাইল ইবনে আইয়াজ ছিলেন একজন ডাকাত। তিনি এক তরুণীর প্রেমে গভীরভাবে আসক্ত হলেন। একরাতে তিনি ওই তরুণীর ঘরে ঢুকতে দেয়াল বেয়ে উঠছিলেন। এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন, কেউ একজন সুরা হাদিদ-এর একটি আয়াত তেলাওয়াত করছেন। ফুযাইল ইবনে আইয়াজ এ আয়াত শুনে এতবেশি প্রভাবিত হলেন যে, তিনি তখনই তাওবাহ করলেন। অন্যায় থেকে ফিরে আসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।
৩। বেশরে হাফি: সে নিজের বাড়িতে গান-বাজনার অনুষ্ঠান করছিল। এসময়ে তার দাসী বাড়ির বাইরে ময়লা ফেলতে গেলে ইমাম মুসা কাজিমের (আ.) সাথে তার দেখা হয়। তখন ইমাম দাসীকে বলেন। তোমার মালিক কি দাস না স্বাধীন। সে বলল: স্বাধীন। ইমাম বললেন: স্বাধীন তো হবেই। সে যদি আল্লাহর বান্দা তথা দাস হত তাহলে কখনোই এমন পাপের কাজ করতে পারত না। দাসী একটু দেরিতে ঘরে ফেরার কারণে বেশর তাকে জিজ্ঞাসা করল: তোমার ফিরতে দেরি হল কেন? দাসী বলল: বাইরে ইমাম কাজিমের (আ.) সাথে দেখা হয়েছিল। তিনি কিছু প্রশ্ন করেছিলেন, তার উত্তর দিয়ে আসতে দেরি হয়ে গেল। সব শুনে বেশর খালি পায়ে দৌড়ে ঘরের বাইরে আসে এবং ইমামের কাছে তওবা করে হেদায়াত প্রাপ্ত হয়।
৪। যুহাইর বিন কাইন: সে ইমাম হুসাইনের (আ.) অনুসারী ছিল না। ইমাম হুসাইন (আ.) যখন মক্কা থেকে কারবালার দিকে যাচ্ছিলেন, পথে তার সাথে সাক্ষাত হয় এবং ইমামের সাথে আলোচনা করার পর সে ইমাম হুসাইনের (আ.) দলে যোগদান করে শাহাদাতবরণ করে সৌভাগ্যবান হয়ে যায়।
৫। হুর বিন ইয়াযিদ রিয়াহি: সে ইমাম হুসাইনের (আ.) কাফেলাকে কুফায় প্রবেশ করতে বাধা দেয় এবং কারবালার ময়দানে নিয়ে আসে। কিন্তু আশুরার রাতে তাঁর মধ্যে পরিবর্তন দেখা দেয় এবং আশুরার সকালে ইয়াযিদের বাহিনী পরিত্যাগ করে ইমাম হুসাইনের (আ.) দলে যোগদান করে ইয়াযিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে শাহাদাতবরণ করে সৌভাগ্যবান হয়ে যায়।
তথ্যসূত্র: “কুরআন ও আহলে বাইত’র বাহাত্তরটি শিক্ষা” শীর্ষক গ্রন্থ হতে সংকলিত।###
