তওবা কি সত্যিই আমাদের নিজের কাজ?

মানুষ কখনো কখনো আল্লাহর অসীম রহমতের সামনে এমন গভীর বিস্ময় ও আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়ে যে, নিজের ভেতরেই স্থির থাকতে পারে না। তখন হৃদয় থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসে— হে আল্লাহ, আমরা সত্যিই আপনার কদর বুঝতে পারি না।
প্রকৃত সত্য হলো— আমরা আল্লাহর দিকে এগিয়ে যাই না; বরং আল্লাহই তাঁর বান্দাদের খুঁজে নেন। সীমাহীন দয়া, ভালোবাসা ও করুণার মাধ্যমে তিনি নিজেই বান্দাদের নিজের দিকে আহ্বান করেন।
প্রয়াত উস্তাদ আয়াতুল্লাহ ফাতেমী নিয়া (রহ.) তাঁর এক বক্তৃতায় “বান্দাদের প্রতি আল্লাহর রহমত” প্রসঙ্গে এই গভীর ও হৃদয়স্পর্শী সত্যটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
আমরা ভাবি— আমরা ফিরে এসেছি
মানুষ যখন তওবা করে, তখন সাধারণত মনে করে— সে নিজেই আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে, আর আল্লাহ দয়া করে তাকে ক্ষমা করেছেন। কিন্তু এই ধারণা পুরো সত্য নয়। বরং সত্যটি আরও গভীর, আরও সান্ত্বনাদায়ক।
বাস্তবে আল্লাহই আমাদের দিকে এগিয়ে আসেন। তিনি কখনোই তাঁর বান্দাদের একা ছেড়ে দেন না। বান্দা যত দূরেই সরে যাক, যতই পাপে নিমজ্জিত হোক— আল্লাহ নিজেই তাকে খুঁজে নেন এবং ফিরে আসার পথ খুলে দেন।
বান্দা যদি আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়, এমনকি তাঁর কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ায়— তবুও আল্লাহ সেই পলাতক বান্দাকেই অনুসন্ধান করেন। তিনি তাকে তিরস্কার করেন না; বরং দয়ার আহ্বানে ডাকেন।
পাপের মধ্যেও ‘হে আমার বান্দারা’
আল্লাহ তাআলা বলেন—“হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।”
(সূরা যুমার: ৫৩)
এই আয়াত আল্লাহর রহমতের চূড়ান্ত প্রকাশ। বান্দা যখন পাপে ডুবে থাকে, তখনও আল্লাহ তাকে বলেন— ‘হে আমার বান্দারা’। তিনি বলেন না— “হে পাপীরা” বা “হে অবাধ্যরা”; বরং সম্পর্ক অটুট রেখে ডাক দেন।
এক বাবার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সন্তানের মতো
এই রহমত বোঝাতে আয়াতুল্লাহ ফাতেমী নিয়া (রহ.) একটি হৃদয়ছোঁয়া উদাহরণ দেন।
ধরা যাক, এক ছেলে কোনো ভুল করেছে। বাবার সামনে যেতে সে লজ্জা পাচ্ছে। অপরাধবোধে সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে— ভেতরে ঢোকার সাহস তার নেই।
এখন বাবা যদি রুক্ষভাবে বলেন—
“যাও, তাকে বলো এসে খেয়ে যাক, তবে যেন আর এমন কাজ না করে”—
এটি হবে একজন সাধারণ বাবার আচরণ, যেখানে রাগ ও অভিমান প্রকাশ পায়।
কিন্তু আল্লাহ তো সাধারণ নন। তিনি আরহামুর রাহিমিন— সবচেয়ে দয়ালু, সবচেয়ে করুণাময়।
আল্লাহর ডাক ভয় দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে
আল্লাহ আমাদের কাছে দূত পাঠান— কিন্তু ভয় দেখিয়ে নয়, কঠোরতা দিয়ে নয়; বরং ভালোবাসা ও করুণার ভাষায়।
গোটা আহ্বান যেন এমন—
“এসো, হে আমার বান্দা। দরজা খোলা।
আমি দয়ালু রব।
আমি আরহামুর রাহিমিন।
আমি আকরামুল আকরামীন।
আমি নিজেই তোমাকে ক্ষমা করি।
আমি নিজেই তোমার দিকে এসেছি—
এমনকি তুমি যদি আমার কাছ থেকে পালিয়েও থাকো।”
তাহলে তওবা কার কাজ?
আমরা মনে করি— আমরাই তওবা করেছি।
অথচ বাস্তবে আমাদের এই তওবা আল্লাহর পক্ষ থেকে ফিরে আসার এক করুণাময় আমন্ত্রণ ছাড়া আর কিছুই নয়।
তিনি নিজেই আমাদের হাত ধরে নেন, নিজেই আমাদের তাঁর দরবারে টেনে আনেন এবং অসীম দয়ায় বলেন— “আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম; কারণ আমি ক্ষমাশীল।”
তওবা কেবল মানুষের ইচ্ছা বা প্রচেষ্টার ফল নয়। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, আহ্বান ও ভালোবাসার এক জীবন্ত প্রকাশ।
বান্দা যখন ফিরে আসে, তখন সে উপলব্ধি করে— এই ফেরার পথটি সে নিজে তৈরি করেনি; বরং আল্লাহ নিজেই তার জন্য দরজা খুলে রেখেছিলেন।
এই উপলব্ধিই মানুষের হৃদয়ে আশা জাগায়, ভরসা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্ম দেয়।

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More