শাবান মাস, একটি ফজিলতপূর্ণ মাস। আমাদের ধর্মীয় মহান ব্যক্তিরা শাবান মাসের ফজিলত ও রোযা রাখা সর্ম্পকে বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন।
শাবান মাসের ফজিলত সর্ম্পকে হাদীসসমূহ:
শাবান মাস অত্যন্ত মহিমান্বিত একটি মাস, ধর্মীয় মহান ব্যক্তিবর্গ থেকে শাবান মাসের ফজিলত, ইবাদত ও আল্লাহর আনুগত্য সর্ম্পকে বহু হাদীস ও রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। আমাদের নবী ও ইমামগণ মানুষকে সুখের পথ দেখিয়েছেন। শাবান মাসের রোযা ও অন্যান্য আমল সর্ম্পকে উপদেশ দিয়েছেন- যে ঐ আমলগুলো পালন করবে সে অনেক পুরস্কারের অধিকারী হবে।
আমিরুল মু’মিনিন (আ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রাসূল (স.) বলেছেন:
শাবান আমার মাস ও রমযান আল্লাহর মাস, সুতরাং যে আমার মাসে রোযা রাখবে, কিয়ামতের দিন তাকে শাফায়েত করবো আর যে আল্লাহর মাসে রোযা রাখবে, আল্লাহ তায়ালা তার কবর থেকে ভয় দূর করে দিবেন এবং তাকে পরিচিত করে তুলে তার একাকীত্ব দূর করে দিবেন। যখন সে তার কবর হতে বের হবে, তখন সে একজন দূতের মতো হবে, তার ডান হাতে তার বই এবং তার বাম হাতে অমরত্ব থাকবে, যাতে সে সর্বশক্তিমান আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারে। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাকে বলবে, আমার বান্দা! উত্তরে বলবে, আমি হাযির হে আমার মাওলা! আল্লাহ তায়ালা বলবে, আমার জন্য রোযা রেখেছ? উত্তর আসবে, হ্যাঁ আমার মাওলা, এরপর আল্লাহ তায়ালা বলবেন “হে আমার ফেরেস্তা আমার বান্দার হাতকে ধর এবং তাকে আমার পয়গাম্বারের নিকট নিয়ে আস। অতঃপর তাকে আল্লাহর রাসূলের নিকট নিয়ে যাবে, পরে আমি তাকে বলবো, আমার মাসে রোযা রেখেছ? সে বলবে, হ্যাঁ! পরে আমি তাকে বলবো, আজ আমি তোমার শাফায়েত করবো। এরপর সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আমি আমার অধিকারকে যেহেতু সে আমার বান্দা তাকে অর্পন করলাম কিন্তু আমার বান্দাদের অন্যান্য হক যা তার (পয়গাম্বার (স.)” উপর বর্তায়, সে যাকে মনে করবে ক্ষমা করে দিবে, আমি তাকে এতই পরিবর্তন করবো যাতে তিনি সন্তুষ্ট থাকেন। আল্লাহর রাসূল (স.) বলেন, পরে আমি তার হাতকে ধরে তাকে সঠিক পথে পৌঁছে দিবো। আমি যখন তার হাত ধরবো, মুয়াক্কেল ফেরেস্তা বলবে, হে আল্লাহর রাসূল, উনি কে?
আমি বলবো, উনি অমুক (তার নাম উচ্চারণ করবো) সে আমার মাসে (শাবান) আমার শাফায়েতের উদ্দেশ্যে রোযা রেখেছে এবং আল্লাহর মাসে (রমযান) আল্লাহর ওয়াদা পালনের জন্য রোযা রেখেছে। তাই বেহেস্তকে তার জন্য খুলে দিবো, রেজওয়ান (বেহেস্তের ফেরেস্তা) বলবে, ঐ দিন আমাদের নিকট নির্দেশ আসবে বেহেস্তকে তোমার উম্মদের জন্য খুলে দিবো। এরপর আমিরুল মু’মিনিন (আ.) বলেন, আল্লাহর রাসূলের মাসে রোযা রাখো যাতে কিয়ামতের দিন তোমাদের শাফায়াতকারী হয় ও আল্লাহর মাসে রোযা রাখ যাতে রাহিকে মাখতুম (বেহেস্তের মজাদার শরবত) পান করতে পার এবং যে শাবান মাসকে রমযান মাসের সাথে যুক্ত করবে, তার জন্য দুই মাসের পুরস্কার পর পর লেখা হবে। (ফাযায়েলুল আশহারুস সালাসা পৃ.৬৪ হি.৪৬ ও পৃ.১২৪ হি.১৩২)
হযরত মুহাম্মাদ (স.) এরশাদ করেন:
শাবান মাস আমার মাস। যে আমার মাসে রোযা রাখবে, কিয়ামতের দিনে তার শাফায়াতকারী হবো। (বিহারুল আনোয়ার, খ.৯৪ পৃ.৮৩ হি.৫৪)
আল্লাহর রাসূল (স.) বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে রযব ও শাবান মাস, আমার মাস এবং রমযান মাস আমার উম্মতের মাস। (আমালী(সুদুক) আবনা বাবুয়ে, মুহাম্মাদ বিন আলী(কা.৩৮১) পৃ৬২৮)
ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন:
যে শাবান মাসের শেষের তিন দিন রোযা রাখবে ও রমযান মাসের রোযার সাথে যুক্ত করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে দুই মাসের রোযার সাওয়াব প্রদান করবেন। (আমালী-সুদুক পৃ.৬৭০)
ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:
রমযান আল্লাহর মাস, শাবান আল্লাহর রাসূলের মাস এবং রযব আমার মাস। (শাহরে ফুরুয়ে কাফি খ.৪, পৃ.১৪)
ইমাম রেযা (আ.) বলেছেন:
হে আল্লাহ শাবান মাসের যে দিনগুলো অতিবাহিত হলো আমাদেরকে ক্ষমা করলে না তাহলে আমাদেরকে যে দিনগুলো বাকি রয়েছে ক্ষমা করে দাও। {এই দোয়ার ক্ষেত্রে সুপারিশ করা হয়েছে শাবান মাসের শেষের দিনগুলোতে বেশী বেশী করে বলতে।} (অসায়েলুস সীয়া খ.১০, পৃ.৩০১)
ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:
আমার থেকে শাবান মাসের রোযা বাদ পড়েনি, যখন থেকে আল্লাহর রাসূলকে (স.) ফরিয়াদ করতে শুনেছিলাম, তখন থেকে কখনো শাবান মাসের রোযা আমার জীবন থেকে বাদ পড়েনি, আল্লাহ চাহেন তো বাদ পড়বে না। (ইকবালুল আমাল, সাইয়্যেদ ইববে তাউস(৬৬৪খ্রি, খ.২, পৃ.৬৮৩)
ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:
শাবান মাসের রোযা অন্তরের প্রতারণা ও জীবনের কষ্টগুলো দূর করে দেয়। (তুহুফুল উকুল পৃ.১০৪, পৃ.৬১২)
উম্মে সালমাহ বলেছেন, আল্লাহর রাসূল (স.) কোন মাসেরই শেষ পর্যন্ত রোযা রাখতেন না একমাত্র শাবান মাসে শেষ পর্যন্ত রোযা রেখে রমযান মাসের সাথে যুক্ত করতেন। (সাওয়াবুল আ’মাল ও একাবুল আ’মাল, ইবনে বাবুয়ে, মুহাম্মদ বিন আলী, পৃ.৬১)
ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন, কারো প্রশ্নের উত্তরে বলেন, শাবান মাসের কোন আমল উত্তম? সদকা প্রদান করা ও ইসতেগফার করা। (ইকালুল আ’মাল,খ.৩, পৃ.২৯৪)
আনাস বিন মালেক থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (স.) এর নিকটে প্রশ্ন করা হয়েছিল:
আনাস বিন মালেক থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (স.) এর নিকটে প্রশ্ন করা হয়েছিল,
রোযার মধ্যে কোন রোযা উত্তম? তিনি বলেন, রমযান মাসকে স্মরণ করার জন্য শাবান মাস। (সাওয়াবুল আ’মাল, ইকাবুল আ’মাল, ইবনে বাবুয়ে, মুহাম্মদ বিন আলী, পৃ.৬১)
ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন:
যে ব্যক্তি শাবান মাসের তিন দিন রোযা রাখবে তার জন্য বেহেস্ত অবধারিত, আল্লাহর রাসূল (স.) কিয়ামতের দিন তাকে শাফায়েত করবেন। (ফাজায়েলুল আশহুর সালাসাহ, ইবনে বাবুয়ে, মুহাম্মাদ বিন আলী , পৃ. ৬১, হি.৪২)
আবি আব্দিল্লাহ (আ.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তায়ালা ১৫ই শাবান রাতে বনি কালাব সম্প্রদায়ের ভেড়াসমূহের পশমের পরিমাণ ক্ষমা করবেন।(বিহারুল আনোয়ার, মাজলেছি, খ.৯৪, পৃ.৮৭)
আবিল হাসানির রেজা (আ.) বলেছেন;
আমিরুল মু’মিনিন (আ.) তিন রাত ঘুমাতেন না, রাতগুলো হলো ২৩ ই রমযানের রাত, ঈদুল ফিৎরের রাত ও ১৫ই শাবানের রাত, এই রাতগুলোতে রিজিকসমূহ বন্টন ও তার আয়ুষ্কালে ঐ বছরে যা ঘটবে নির্ধারণ করা হয়। (মিসবাহুল মুতাহাজাদ, সিলাহুল মুতায়াবাদ, তুসি, মুহাম্মাদ বিন হাসান, খ.২, পৃ.৮৫৩)
ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন;
পয়গাম্বার (স.) এর বিবিরা যখন তাদের উপর রোযা অবধারিত হত, ওগুলোকে শাবান মাস পর্যন্ত বিলম্ব করতো যাতে আল্লাহর রাসূলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায়, যখন শাবান মাসের আগমন ঘটতো তখন তাঁরা রোযা রাখতেন এবং হযরত (স.)ও বিবিদের সাথে রোযা রাখতেন। হযরত তাঁর বক্তব্যে আরো বলেন, আল্লাহর রাসূল (স.) বলেছেন, শাবান মাস আমার মাস। (আল কাফি, কুলাইনী, মুহাম্মাদ বিন ইয়াকুব, খ.৪, পৃ.৯০, হি.৪)
পয়গাম্বর (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈুদল ফিতর, ঈদুল কুরবান ও ১৫ই শাবান রাতে জাগ্রত থাকে, যেদিন তার অন্তরের মৃত্যু হবে, অন্তরের মৃত্যু হবে না। (ইকবালুল আ’মাল, সাইয়্যেদ বিন তাউস, খ.৩, পৃ.৩৫৪, অ.৫৬)
ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন:
খোদার কসম, শাবান মাসে এবং রমযান মাসের টানা দুই মাস রোযা রাখাই সেই তওবা যা আল্লাহ কবুল করেন।(সাওয়াবুল আ’মাল, একাবুল আ’মাল, ইবনে বাবুয়ে, মুহাম্মাদ বিন আলী পৃ.৫৯)
আব্দুল্লাহ বিন মারহুম আজাদী বলেছেন যে, তিনি ইমাম সাদেক (আ.) থেকে শুনেছেন তিনি বলেছেন:
যে ব্যক্তি শাবান মাসের প্রথম দিন রোযা রাখবে, অবশ্যই তার উপর বেহেস্ত অবধারিত হবে; আর যে ব্যক্তি দুটি রোযা রাখবে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা জগতে প্রতিদিন ও প্রতি রাতে তার দিকে তাকাবেন এবং আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টি বেহেস্তেও তার প্রতি অব্যাহত থাকবে। আর যে ব্যক্তি তিনটি রোযা রাখবে প্রতি দিন বেহেস্ত থেকে আল্লাহকে আরসে জিয়ারাত করবে। (সাওয়াবুল আ’মাল, ইকাবুল আ’মাল, ইবনে বাবুয়ে, মুহাম্মাদ বিন আলী, পৃ.৫৯)
সামায়াতু বিন মেহরন বর্ণনা করেছেন:
সামায়াতু বিন মেহরন বর্ণনা করেছেন যে, আমি ইমাম সাদেক (আ.) এর নিকট প্রশ্ন করেছিলাম, আপনার পিতামহদের মধ্যে কেউ কি শাবান মাসে রোযা রাখতেনা? তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (স.) হলেন আমার সবচেয়ে উত্তম পিতামহ, শাবান মাসে রোযা রাখতেন।(আল কাফি, কুলাইনী, মুহাম্মাদ বিন ইয়াকুব বিন ইসহাক, খ.৪, পৃ.৯১, হি.৫)
যায়েদ বিন আসলাম বর্ণনা করেছেন যে, পয়গাম্বার (স.) এর নিকট রযব মাসের রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো,
হযরত (স.) বললেন, শাবান মাসের রোযা রাখার ব্যাপারে আপনি কেন বেখবর?
ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন:
শাবানের রোযা বান্দার জন্য বিচার দিবসের জন্য সংরক্ষিত এবং যে বান্দা শাবান মাসে বেশী করে রোযা রাখবে আল্লাহ তায়ালা তার জীবিকার ব্যবস্থা করবেন এবং শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন। (অসায়েলুস শীয়া খ.১০, পৃ.৫০৫)
ইমাম রেযা (আ.) শাবান মাসের ফজিলত সর্ম্পকে বলেছেন;
হযরত আলী ইবনে মুসা রেযা (আ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, পয়গাম্বার (স.) বলেছেন, রযব মাস আল্লাহর মাস, আল্লার রহমত তার মধ্যে ঢেলে দেয়া হয় এবং শাবান মাস এমন একটি মাস যে মাসে দান-খয়রাতের প্রসার ঘটে। রমযান মাসের প্রথম দিন শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয় আর পবিত্র রমযান মাসের প্রতিটি রাতে সত্তর হাজার আল্লাহর গোনাহগার বান্দাকে ক্ষমা করা হয়। (অসায়েলুস শীয়া, খ.১০, পৃ.৩১৫)
106
আগের পোস্ট
