হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা ইব্রাহিম খলিল রিজভী:
ঈদে গাদীর – ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পটভূমি
পবিত্র ঈদে গাদীরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ধর্মীয় তাৎপর্য এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য এর গুরুত্ব নিয়ে এক বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা ইব্রাহিম খলিল রিজভী। সাক্ষাৎকারে তিনি গাদীরে খুমের ঘটনা, ইসলামের ইতিহাসে এর অবস্থান এবং ঈদে গাদীরের শিক্ষা ও বার্তা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
ঈদে গাদিরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, গুরুত্ব নিয়ে হাওজা নিউজ এজেন্সি’র সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ উলামা কাউন্সিলের সভাপতি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা ইব্রাহিম খলিল রাজাভী সাহেব— যার সারসংক্ষেপ পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি:
গাদীরের ঘটনা কী এবং এটি ইসলামের ইতিহাসে কেন একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত?
উঃ গাদীরে খুম ঘটনার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
‘গাদীরে খুম’ ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে (মোতাবেকে ১০ম হিজরীর ১৮ই যিলহজ্ব), বিদায় হজ থেকে ফেরার পথে মহানবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি ‘গাদীরে খুম’ নামক স্থানে মুসলমানদের সমবেত করেন এবং এক মহামূল্যবান ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি বলেন:
“যার আমি মাওলা, আলী ইবনে আবী তালিবও তার মাওলা।”
গুরুত্ব
শিয়া মুসলমানদের দৃষ্টিতে: এই ঘটনার মাধ্যমে হযরত আলী ইবনে আবী তালিবকে আল্লাহর রসুলের (সা.) রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি হিসেবে মনোনয়নের ঘোষণা দেয়া হয়।
সুন্নি মুসলমানদের দৃষ্টিতে: অধিকাংশ সুন্নি আলেম এই বক্তব্যকে আলী ইবনে আবী তালিবের মর্যাদা, ভালোবাসা ও নেতৃত্বগুণের স্বীকৃতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, তবে সরাসরি খিলাফতের মনোনয়ন হিসেবে নয়।
এই কারণে গাদীরে খুমের ঘটনা শিয়া-সুন্নি ইতিহাস ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলক।
সংক্ষেপে বলা যেতে পারে: ‘গাদীরে খুম’ ইসলামের ইতিহাসে নেতৃত্ব, উত্তরাধিকার এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রশ্নে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি।
এই ঘটনা কি শুধু শিয়া সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, নাকি সুন্নি গ্রন্থেও এর বর্ণনা বিদ্যমান?
উঃ গাদীরে খুম ঘটনার মূল ঐতিহাসিকতা মুসলিম ঐতিহ্যে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত, তবে এর অর্থ ও রাজনৈতিক-ধর্মীয় তাৎপর্য নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
সুন্নি দৃষ্টিভঙ্গি
অধিকাংশ সুন্নি আলেম গাদীরে খুমের ঘটনাকে ঐতিহাসিকভাবে সত্য বলে গ্রহণ করেন।
তবে তারা “মাওলা” শব্দকে সাধারণত বন্ধু, প্রিয়জন, অভিভাবক বা সম্মানিত ব্যক্তি অর্থে ব্যাখ্যা করেন।
তাদের মতে, এটি হযরত আলীর (আ.) মর্যাদা ও তাঁর প্রতি ভালোবাসার ঘোষণা ছিল; সরাসরি রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের (খিলাফত) ঘোষণা নয়।
শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি
শিয়া মুসলিমরা গাদীরে খুমকে, হযরত আলী ইবনে আবী তালিবকে (আ.) নবীর পরবর্তী নেতা ও ইমাম হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নের ঘটনা বলে মনে করেন।
তাদের মতে “মাওলা” কথাটি এখানে নেতা, কর্তৃত্বশালী, অভিভাবক বা উত্তরসূরি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
গাদীরে খুম শিয়া আকীদায় ইমামতের অন্যতম প্রধান দলিল।
নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
আধুনিক গবেষকগণ ও রেফারেন্স গ্রন্থগুলো সাধারণত বলে যে, ঘটনাটি ঐতিহাসিকভাবে ব্যাপকভাবে নথিবদ্ধ এবং শিয়া-সুন্নি উভয় সূত্রেই সংরক্ষিত।
বিতর্ক মূলত ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে, ঘটনার অস্তিত্ব নিয়ে নয়।
নির্ভরযোগ্য সূত্র
গাদীরে খুমের এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি উভয় পক্ষেরই নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলিতে আলোচিত হয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নোক্ত গ্রন্থগুলো উল্লেখ করা যেতে পারে, যথা:
১। সহীহ মুসলিম,
২। জামে আত্ তিরমিযী,
৩। মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বাল,
৪। আল গাদীর (শিয়া গবেষণা) এবং
৫। Oxford Bibliographies in Islamic Studies (একাডেমিক পর্যালোচনা)
সংক্ষেপে বলা যায়: গাদীরে খুমের ঘটনা মুসলিম ঐতিহ্যে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত; তবে সুন্নি ও শিয়া মতবাদের প্রধান পার্থক্য হলো “মাওলা” শব্দের অর্থ ও সেই ঘোষণার রাজনৈতিক-ধর্মীয় তাৎপর্যের ব্যাখ্যায়।
হিজরির ১০ম সনে রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন বিদায় হজ্জ সম্পন্ন করেন, তখন কোন বিশেষ পরিস্থিতি তাকে এত বড় ঘোষণা দিতে বাধ্য করেছিল বলে আপনি মনে করেন?
উঃ ১০ম হিজরীতে আল্লাহর রসুল (সা.) সাহাবীদেরকে সঙ্গে নিয়ে হজ্বকার্য সম্পন্ন করে মক্কা ত্যাগ করার মুহূর্তে তাঁর উপর সূরা মায়েদার ৬৭ নম্বর আয়াতটি নাযিল হয় যেখানে বলা হয়: “হে রসুল! আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছে দিন। আর যদি তা না করেন, তবে আপনি তাঁর বার্তা পৌঁছালেন না! আল্লাহ আপনাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন …।”
এই আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে মুসলমানদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে:
শিয়া মুসলিমদের মতে, এই আয়াতটি হযরত আলী ইবনে আবী তালিবের (আ.) নেতৃত্ব (ভিলায়াত ও ইমামত) ঘোষণা করার নির্দেশ হিসেবে নাযিল হয়। তাঁদের মতে, এর পরই গাদীরে খুমে নবী করিম (সা.) “মাওলা” সম্পর্কিত বিখ্যাত ভাষণ দেন।
সুন্নি মুসলিমদের অধিকাংশ তাফসিরকার মনে করেন, আয়াতটি সাধারণভাবে রসুলকে (সা.) আল্লাহর সব বিধান ও বার্তা নির্ভয়ে প্রচার করার নির্দেশ দেয়। তাঁরা গাদীরে খুমের ঘটনাকে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকার করলেও সূরা মায়েদার ৬৭তম আয়াতকে হযরত আলীর (আ.) খিলাফত ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত করেন না।
স্মর্তব্য:
আচ্ছা আপনি বলুনতো যে, রসুলের (সা.) নবুওত জীবনের শেষলগ্নে উক্ত আয়াতটি তাঁর উপর নাযিল হয়েছে। তিনি স্বীয় জীবনের প্রায় সব দায়িত্বই পালন করেছেন, মুসলিম জনসংখ্যাও বেড়েছে, ইসলামী রাষ্ট্রের আয়তনও ব্যাপকতা লাভ করেছে – ইত্যাদি; এরপরও আল্লাহ তাঁকে বলছেন যে, তিনি যদি সেই বিষয় প্রচার না করেন তাহলে তিনি যেন কিছুই করলেন না! আর আল্লাহ তাঁকে মানুষের অনিষ্ট থেকে হেফাযতের দায়িত্বভার গ্রহণ করছেন। বিদায় হজ্বের পর হতে তিনি মাত্র মাস দুয়েকের মত জীবিত ছিলেন। তাহলে বুঝতে হবে যে, বিষয়টি কোনো সাধারণ বিষয় ছিল না। এসব দিক বিচারে, শিয়া মাযহাবের আলেমগণ উক্ত আয়াতের যে তাফসীর করেছেন সেটিই অধিকতর গ্রহণযোগ্য তাফসীর বলে আমার মনে হয়।
সুতরাং,একদিকে আল্লাহর কড়া ভাষা এবং অপর দিকে, রসুলকে মানুষের অনিষ্টতা থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি – ইত্যাদির ফলেই তিনি (সা.) গাদীরে খুমে হাজীদের সমবেত করতে বাধ্য হন।
“মান কুনতু মাওলাহু ফা হাজা আলিয়ুন মাওলাহ”–এই বাক্যটির অর্থ ও তাৎপর্য কী? আরবি ‘মাওলা’ শব্দটি এখানে কোন অর্থ বহন করে?
উঃ “মান কুনতু মাওলাহু ফা হাজা আলিয়ুন মাওলাহ” ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত আলোচিত একটি হাদিসের অংশ। এর বাংলা অর্থ সাধারণভাবে: “যার আমি মাওলা, এই আলীও তার মাওলা।”
এটি নবী করিমের (সা.) পক্ষ থেকে হযরত আলী (আ.) সম্পর্কে বলা একটি বক্তব্য হিসেবে বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। ঘটনাটি সাধারণত গাদীরে খুম সম্পর্কিত।
‘মাওলা’ শব্দের অর্থ
আরবি ‘মাওলা’ শব্দটি বহু অর্থবোধক। যথা: বন্ধু, সাহায্যকারী, অভিভাবক, পৃষ্ঠপোষক, নিকটজন, মুক্তিদাতা বা মনিব, নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি, কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি – ইত্যাদি।
প্রসঙ্গভেদে এর অর্থ পরিবর্তিত হয়ে থাকে। আরবি ভাষায় এটি এমন একটি শব্দ যার নির্দিষ্ট অর্থ প্রসঙ্গ দ্বারা নির্ধারিত হয়।
এই হাদিসে ‘মাওলা’ দ্বারা যা বোঝানো হয়েছে
এখানেই মূল মতপার্থক্য দেখা যায়।
সুন্নি ব্যাখ্যা: অনেক সুন্নি আলেমের মতে, এখানে মাওলা বলতে “প্রিয়জন”, “বন্ধু”, “সহায়ক” বা “যার প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা থাকা উচিত” বোঝানো হয়েছে। তাদের মতে,নবী করিম (সা.) হযরত আলীর (আ.) মর্যাদা ও সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে এই ঘোষণা দেন,বিশেষত কিছু মানুষের অভিযোগ বা ভুল বোঝাবুঝির প্রেক্ষাপটে।
শিয়া ব্যাখ্যা: শিয়া মুসলমানদের মতে, এখানে মাওলা শব্দটি “নেতা”, “অধিকারসম্পন্ন অভিভাবক” বা “উত্তরসূরি” অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁদের মতে, গাদীরে খুমে নবী করিম (সা.) আনুষ্ঠানিকভাবে হযরত আলীকে (আ.) নিজের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।
ভাষাগত দিক থেকে যে অর্থটি বেশি শক্তিশালী
শুধু “মাওলা” শব্দটি আলাদা করে দেখলে একটিমাত্র অর্থ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ প্রাচীন আরবী অভিধানগুলোতে এর বহু অর্থ উল্লেখ আছে যা আমরা উপরে ইশারা করলাম। তাই গবেষকগণ সাধারণত বক্তব্যের পূর্ণ প্রসঙ্গ, ঘটনার ঐতিহাসিক পটভূমি, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য হাদিস, সাহাবিদের প্রতিক্রিয়া – প্রভৃতি বিষয় বিবেচনা করে এর অর্থ নির্ধারণের চেষ্টা করে থাকেন। আর এসব বিষয় দৃষ্টিতে নিলে আমাদেরকে ‘মাওলা’ শব্দের অর্থ: “নেতা”, “অধিকারসম্পন্ন অভিভাবক” বা “উত্তরসূরি” নির্ধারণ করা ব্যতীত আর কোনো উপায় থাকে না।
গাদীরের দিন অবতীর্ণ আয়াত “আল-ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দ্বীনাকুম…” (সূরা মায়িদা, আয়াত ৩)-কে কীভাবে ঘটনার সমাপ্তি হিসেবে গণ্য করা হয়?
উঃ “আল্ ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দ্বীনাকুম…” (সূরা মায়েদার ৩য়) আয়াতকে গাদীরের ঘটনার সমাপ্তি বা পরিপূর্ণতার ঘোষণা হিসেবে গণ্য করা হয়। এখানে মহান আল্লাহ বলছেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”
শিয়া সূত্রগুলো সহ অন্যান্য সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে যে, গাদীরে খুমে নবী করিম (সা.) হযরত আলীর (আ.) ব্যাপারে “মান কুনতু মাওলাহু ফা-হাযা আলিয়্যুন মাওলাহু” ঘোষণা দেয়ার পরই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। সেই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নেতৃত্ব (ইমামত/ ভিলায়াত) নির্ধারণের মাধ্যমে ইসলামী ব্যবস্থার শেষ অপরিহার্য অংশ সম্পন্ন হয়েছিল; তাই আয়াতে “দ্বীন পূর্ণাঙ্গ” হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ কারণে শিয়া আলেমগণ বলেন:
১. গাদীরে হযরত আলীর (আ.) নেতৃত্ব ঘোষণা ছিল নবী করিমের (সা.) শেষ বড় দায়িত্ব।
২. এই ঘোষণার পর “দ্বীন পূর্ণাঙ্গ” হওয়ার আয়াত নাযিল হয়।
৩. ফলে আয়াতটি গাদীরের ঘটনার ঐশী অনুমোদন ও সমাপ্তির ঘোষণা হিসেবে বিবেচিত হয়।
৬. ঘটনাস্থলে রাসুলুল্লাহ (সা.) কতজন সাহাবীর উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে কতজন পরবর্তীতে এই বাণীর সাক্ষ্য দিয়েছেন?
উঃ গাদীর খুমের ঘটনার ক্ষেত্রে “কতজন সাহাবী উপস্থিত ছিলেন” এবং “কতজন পরে সাক্ষ্য দিয়েছেন” – এ বিষয়ে বিভিন্ন ইসলামী ধারায় ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। যথা:
বহু ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয় যে, বিদায় হজ্ব থেকে ফেরার পথে গাদীরে বিপুলসংখ্যক সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। কতক শিয়া সূত্রে এই সংখ্যা প্রায় ৭০,০০০ থেকে ১২০,০০০ বা ১২৪,০০০ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
শিয়া হাদিস গবেষক আব্দুল হুসাইন আল আমিনীর সংকলন অনুযায়ী, গাদীরের হাদিস অন্তত ১১০ জন সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে।
পরবর্তীকালে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) যখন কুফায় লোকদের সামনে গাদীরের ঘটনার সাক্ষ্য দিতে আহ্বান করেন তখন বিভিন্ন বর্ণনায় ১২ জন, ১৭ জন, ৩০ জনেরও বেশি সাহাবী উঠে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ আছে। ভিন্ন সূত্রে সংখ্যা ভিন্ন হওয়ার কারণ হলো ঘটনাটি বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন সমাবেশে বর্ণিত হয়েছে।
সুতরাং, কোনো এক নির্দিষ্ট সর্বসম্মত সংখ্যা নেই। শিয়া ঐতিহ্যে সাধারণত বলা হয়:
১। গাদীরে কয়েক দশ হাজার সাহাবী উপস্থিত ছিলেন।
২। অন্তত ১১০ জন সাহাবী হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
৩। পরবর্তী একাধিক উপলক্ষ্যে কয়েকজন থেকে কয়েক ডজন সাহাবী প্রকাশ্যে এর সাক্ষ্য দিয়েছেন।
সুন্নি সূত্র
অনেক সুন্নি ঐতিহাসিক ও হাদিসবিদের মতে, বিদায় হজ্বে অংশগ্রহণকারী সাহাবীর সংখ্যা প্রায় ৯০,০০০ থেকে ১২০,০০০ বা তারও বেশি ছিল। ফলে গাদীর খুমে সমবেত জনতার সংখ্যাও সাধারণত এই পরিসরের মধ্যে উল্লেখ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ: ইবনে কাসীর, আজ্জাহাবী, আল্ বিদায়া ওয়ান নিহায়া প্রভৃতি উৎসে এসব সংখ্যা উল্লেখ হয়েছে।
আবার অনেক সুন্নি আলেম বলেন যে, ঘটনাটি বহু মানুষের সামনে ঘটেছিল, তবে সুনির্দিষ্ট উপস্থিতির সংখ্যা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।
পরবর্তীতে কতজন সাহাবী গাদীরের হাদিস বর্ণনা করেছেন তা নিয়েও একাধিক অভিমত পাওয়া যায়, যথা:
অনেক সুন্নি মুহাদ্দিসের মতে, গাদীরের হাদিস “من كنت مولاه فعلي مولاه” বহু সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য সংখ্যাগুলো:
আহমাদ ইবনে হাম্বালের বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে বহু সাহাবী থেকে হাদিসটি এসেছে।
ইবনে হাজার আস্কালানী এবং অন্যদের আলোচনায় প্রায় ৩০ জন বা তার বেশি সাহাবী এই হাদিস বর্ণনা করেছেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
আজ্জাহাবীও বহু সাহাবী সূত্রে হাদিসটির বর্ণনা স্বীকার করেছেন।
সুন্নি গবেষণায় সবচেয়ে প্রচলিত সংখ্যাটি হচ্ছে এই যে, ৩০–৪০ জনের বেশি সাহাবী সরাসরি এই হাদিস বর্ণনা করেছেন।
বিশেষ করে ‘মুসনাদে আহমাদের’ কিছু বর্ণনায় প্রায় ৩০ জন সাহাবীর সাক্ষ্য দেওয়ার উল্লেখ রয়েছে।
গাদীরের ঘোষণার পর হযরত উমরের (রা.) ‘হানীয়্যান লাকা ইয়া ইয়াবনা আবি তালিব …’; (হে আলী, তুমি এখন আমার মাওলা …) বলে অভিনন্দন জানানোর ঐতিহাসিক সত্যতা কতটুকু?
উঃ গাদীরে খুমের ঘটনার পর হযরত উমর (রা.) কর্তৃক হযরত আলীকে (রা.) অভিনন্দন জানানোর একটি বর্ণনা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও হাদিসগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। বহুল উদ্ধৃত বাক্যটি হলো:
“بَخٍّ بَخٍّ لَكَ يَا عَلِيُّ، أَصْبَحْتَ مَوْلَايَ وَمَوْلَى كُلِّ مُؤْمِنٍ وَمُؤْمِنَةٍ”
(বাখ্খিন! বাখ্খিন!! আপনাকে অভিনন্দন হে আলী! আপনি আমার মাওলা এবং প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর মাওলা হয়ে গেলেন।”
এ হাদীসের মাধ্যমে, হযরত আলী (আ.) রসুলের (সা.) উত্তরসূরী নির্বাচিত হওয়ায় হযরত উমর স্বীয় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তার সঙ্গে আরও অনেক সাহাবীই একই প্রতিক্রিয়া জানান।
যেসব উৎসে এই বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে
১। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের (রহ.) ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে এ গাদীরের হাদিসের বিভিন্ন সনদ এসেছে এবং কিছু রেওয়ায়েতে হযরত উমরের অভিনন্দনের উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে বলে পরবর্তী আলেমরা উল্লেখ করেছেন।
২। হাকিম তদীয় ‘আল মুস্তাদরাক আলাস্ সাহীহাইন’ শীর্ষক গ্রন্থে গাদীরের হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং এটিকে সহিহ বলে মন্তব্য করেছেন। হযরত উমরের অভিনন্দন-সংক্রান্ত বর্ণনাও পরবর্তী গ্রন্থগুলোতে এরই সূত্রে উদ্ধৃত হয়েছে।
৩। ইবনে কাসীর স্বীয় ‘তারীখে’ গাদীরের ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রেওয়ায়েত আলোচনা করেছেন।
৪। ‘আর রিয়াজুন্ নাজেরাহ’ শীর্ষক গ্রন্থে হযরত উমরের অভিনন্দনমূলক উক্তির বিভিন্ন শব্দরূপ উদ্ধৃত হয়েছে।
ঐতিহাসিক গাদীর ও সাকিফার ঘটনা – এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি উম্মাহর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণে বেশি প্রামাণিক বলে আপনি দাবি করবেন এবং কেন?
উঃ এই প্রশ্নটি মূলত ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস ও শিয়া-সুন্নি মতপার্থক্যের একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। গাদিরে খুম এবং বনি সাকিফা (সাকিফায়ে বনি সাঈদা) এই দুই ঘটনাকেই মুসলমানরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন; কিন্তু কোনটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণে বেশি প্রামাণিক বলে গণ্য হবে, সে বিষয়ে বিভিন্ন ইসলামী ধারার মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে।
সুন্নি দৃষ্টিভঙ্গি
সুন্নি মুসলিমদের মতে, সাকিফা মিটিংয়ের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারণ বৈধ ও প্রামাণিকভাবে সম্পন্ন হয়।
তাদের যুক্তি:
নবী মুহাম্মদ (সা.) কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উত্তরসূরি নির্ধারণ করে যাননি।
গাদিরে খুমের বক্তব্যকে তারা হযরত আলীর মর্যাদা, ভালোবাসা ও সম্মান প্রতিষ্ঠার ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, সরাসরি খিলাফতের নিয়োগ হিসেবে নয়।
সাকিফায় সাহাবিদের পরামর্শ (শূরা) ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে হযরত আবু বকরকে খলিফা নির্বাচিত করা হয়েছিল যা তারা ইসলামী রাজনৈতিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন।
শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি
শিয়া মুসলিমদের মতে,গাদীরে খুমই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের সবচেয়ে প্রামাণিক ঘটনা।
তাদের যুক্তি:
নবী করিম (সা.) গাদিরে খুমে প্রকাশ্যে হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (আ.) সম্পর্কে বলেন: “যার আমি মাওলা, আলীও তার মাওলা।”
শিয়ারা “মাওলা” শব্দকে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের অর্থে ব্যাখ্যা করেন।
ঘটনাটি বিপুল সংখ্যক সাহাবির উপস্থিতিতে সংঘটিত হয়েছিল বলে তারা এটিকে নবীর সরাসরি মনোনয়ন হিসেবে দেখেন।
খেলাফতের দায়িত্ব কাঁধে নেয়ার পর হযরত আবু বকর স্বীয় অবস্থার বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন – যা সহীহ বোখারীতে উল্লেখ হয়েছে -: “নিশ্চয়ই আমার বায়আত (খিলাফতের শপথ/ নেতৃত্ব গ্রহণ) ছিল আকস্মিকভাবে সংঘটিত একটি ঘটনা; তবে আল্লাহ তার অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেছেন। অতএব, যে ব্যক্তি মুসলমানদের পরামর্শ ছাড়া কোনো ব্যক্তির হাতে বায়আত করে, তাহলে না সেই বায়আত গ্রহণকারীকে অনুসরণ করা হবে, আর না যাকে বায়আত করা হয়েছে তাকে -এই আশঙ্কায় যে, তারা উভয়েই হত্যার সম্মুখীন হতে পারে।” আরেক বর্ণনায় এসেছে: “যে ব্যক্তি আবার এমন কাজ করবে, তাকে তোমরা হত্যা করো!”
(إنّ بيعتي كانت فلتةً، ولكن الله وقى شرها، فمن بايع رجلاً عن غير مشورة من المسلمين فلا يُتابَع هو ولا الذي بايعه تغرّةً أن يُقتلا. وفي بعض الروايات: فمن عاد الى مثلها فاقتلوه.)
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইমামত ও খিলাফতের ধারণা গঠনে গাদীরের নীতি কী ধরনের ভূমিকা রাখে?
উঃ ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইমামত ও খিলাফত -এই দুটি ধারণা গঠনে গাদীরে খুমের ঘটনা (গাদীরের নীতি) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর ব্যাখ্যা, মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধারায় ভিন্নভাবে করা হয়।
১০ম হিজরিতে বিদায় হজ্ব থেকে ফেরার পথে রসুল (সা.) বলেন: “আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা।” এই উক্তির অর্থ ও রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে পরবর্তীকালে ভিন্ন ব্যাখ্যা গড়ে ওঠে।
সুন্নি দৃষ্টিভঙ্গি: খিলাফতের সঙ্গে সম্পর্ক
সুন্নি সমাজের অধিকাংশ আলেমই মনে করেন, গাদীর খুমে নবী করিম (সা.) হযরত আলীর মর্যাদা, ভালোবাসা ও আনুগত্যের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন; তবে তাঁকে রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেননি।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী:
মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব পরামর্শ (শূরা) ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে।
মহানবীর (সা.) মৃত্যুর পর হযরত আবু বকরের নির্বাচন ছিল সেই নীতিরই বাস্তবায়ন।
গাদীরের ঘটনা হযরত আলীর (আ.) বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ হলেও খিলাফতের একমাত্র সাংবিধানিক ভিত্তি নয়।
ফলে সুন্নি রাজনৈতিক চিন্তায় খিলাফত একটি সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকশিত হয়।
শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি: ইমামতের ভিত্তি
শিয়া সমাজের মতে, গাদীর খুমে নবী করিম (সা.) স্পষ্টভাবে হযরত আলীকে (আ.) নিজের উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী:
নেতৃত্ব মানুষের নির্বাচনের বিষয় নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।
ইমাম কেবল রাজনৈতিক শাসকই নন, বরং ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকও বটে।
গাদীরের ঘটনা ইমামতের বৈধতার প্রধান দলিলগুলোর একটি।
ফলে শিয়া রাজনৈতিক চিন্তায় রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হয় ইমামত, অর্থাৎ আল্লাহনির্ধারিত নেতৃত্ব।
রাষ্ট্রব্যবস্থাগত গুরুত্ব
গাদীরের নীতি ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে:
নেতৃত্ব কি ঐশীভাবে মনোনীত হবে, নাকি মুসলিম সমাজের পরামর্শ ও সম্মতির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে?
এই প্রশ্নের ভিন্ন উত্তরের ফলেই:
শিয়া মতবাদে ইমামত কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে।
সুন্নি মতবাদে খিলাফত ও শূরাভিত্তিক নেতৃত্বের ধারণা বিকশিত হয়।
অতএব, গাদীর খুমের ঘটনাটি ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ এটি মুসলিম নেতৃত্বের বৈধতা, কর্তৃত্ব এবং উত্তরাধিকার সম্পর্কে দুই প্রধান ধারার রাজনৈতিক-ধর্মীয় তত্ত্বের ভিত্তি গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
আপনি যদি একজন সাধারণ মুসলমানকে গাদীরের ঘটনাটি সহজ ভাষায় বুঝাতে চান, তাহলে কোন তিনটি মূল পয়েন্ট তুলে ধরবেন?
উঃ এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত তিনটি বিষয় আলোচনা করা যেতে পারে, যথা:
১. গাদীরে খুমের ঘটনাটি ছিল নবী করিমের (সা.) জীবনের শেষ দিকে এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। এর মাধ্যমে, নবুওতি ধারার সমাপ্তি এবং ইমামত ধারার সূচনা হয়েছে। এ ঘোষণার মাধ্যমে এ বিষয়ের প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ১২ জন মাসুম ইমামের (আ.) আগমন পর্যন্ত এ পৃথিবী অটুট থাকবে এবং তাঁদের আগমনের সমাপ্তি ঘটলে আমরা কিয়ামতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাব।
২. “মাওলা” শব্দের অর্থ নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও তা মূলত সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই পরবর্তীতে আবিষ্কার করা হয়েছে। কেননা, রসুলের (সা.) “মান কুনতু মাওলাহু, ফা হাযা আলিয়্যুন মাওলাহু” – এই বক্তব্যের পূর্ণ প্রসঙ্গ, ঘটনার ঐতিহাসিক পটভূমি, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য হাদিস, সাহাবিদের প্রতিক্রিয়া– এসবই ‘মাওলা’ শব্দের সঠিক অর্থ নির্ণয় করে দেয় যে, এখানে ‘মাওলা’ দ্বারা নেতা, অভিভাবক বা উত্তরসূরি বোঝানো হয়েছে, না অন্য কিছু।
৩. গাদীর ঘটনার সূচনায় এর গুরুত্ব নিয়ে সবাই একমত পোষণ করলেও পরবর্তীতে এর রাজনৈতিক অর্থ নিয়ে মতভিন্নতার উদ্ভাবন করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমে শাক দিয়ে মাছ ঢাঁকার চেষ্টা করা হয়েছে যা আদৌ সম্ভব নয়।
তাই আসুন! আমরা সত্যকে জানার ও মানার চেষ্টা করি। আর তাহলেই সমাজের যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে – ইনশা আল্লাহ।
