“কা’বার প্রতিপালকের কসম আমি সফলকাম হলাম।” এটি এমনই এক উক্তি যা হিজরী ৪০ সনের ১৯শে রমজান কুফার মসজিদ থেকে ধ্বনিত হয় এবং তা আজও মানুষের মন ও মননে গ্রথিত আছে যার ব্যাখ্যা বিভিন্ন আঙ্গিক ও দৃষ্টিকোণ মাসুমের মুখনিঃসৃত বচনের ব্যাখ্যা দেয়া খুব সহজ নয়। যার মুখনিঃসৃত উক্তিসমূহকে আল্লামা সৈয়দ রাজি সংকলিত করলে সংকলনটি ‘নাহজুল বালাগা’ শিরোনম পায় নিশ্চিন্তরূপে তাঁর প্রতিটি উক্তি তাৎপযমন্ডিত ও সূগভীর যে কারণে গবেষকগণ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তার উক্তিসমূহের ব্যাখ্যা করেও সঠিক তাৎপর্য ও অর্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। ওলামায়ে কেরামগণ মাওলা আলী (আঃ)’র উপরোল্লিখিত উক্তির ব্রাখ্যায় সাধারণভাবে এ কথাই বলার প্রয়াস পেয়েছেন যে, এ উক্তিতে ইমাম ইঙ্গিত করেছেন, যেহেতু তাঁর জীবনের সূচনা মসজিদুল হারাম থেকে এবং সমাপ্তি মসজিদে কুফায় অর্থাৎ জীবনের সূচনাও মসজিদে এবং সমাপ্তিও মসজিদে। একটি মুহূর্তের জন্যও তাঁর পবিত্র জীবন মসজিদ থেকে পৃথক বা বিচ্ছিন্ন ছিল না। পক্ষান্তরে তিনি সুস্পষ্টভাবে বুঝাতে চেয়েছেন যে, তাঁর সফলকাম হওয়ার পেছনে শাহাদাৎ লাভই হর মূল রহস্য। ইসলামের বিভিন্ন বিজয় ও সাফল্য তারই তরবারি দ্বারা অর্জিত হলেও কোন সময় তিনি “ফুযতো বে রাব্বিল কা’বা” উক্তিটি করেন নি। অথচ প্রতিটি বিজয ও সাফল্য তাঁর মহান ব্যক্তিত্বের সাথে এমনভাবে জড়িত ছিল যা অন্য কোন ব্যক্তির খেত্রে দেখা যায় না। এই সাফল্য বা বিজয় যদি অন্য কারো ক্ষেত্রে হতো তাহলে বিষয়টি তার জন্য সম্মান ও গর্বের হতো। অথচ হযরত আলী (আ.)’র কোন মুহূর্তে গর্ব না করার বিষয়টি এটাই প্রমাণ করে যে, যাবতীয় সাফল্যের সাথে শাহাদাৎ যদি অর্জিত না হয় তাহলে আলীর (আ.) দৃষ্টিতে একে ‘ফুযতো’ বা সাফল্য বলা যেতে পারে কিন্তু ‘ফুযআন আজিমা’ অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ সাফল্য বলা যাবে না। তাই শাহাদাতের আকাংখা, মনের গভীরেই থেকে যেত যা কিনা চরমোৎকর্ষতার শেষ সমিা, যা অর্জন করে আলী (আ.) সাফল্যের ঘোষণা দিলেন।
আলী (আ.) এর উক্তির ব্যাখ্যার জন্য ঐ যুগকেও যদি দৃষ্টিতে রাখা হয় যে সময় তিনি আঘাৎ প্রাপ্ত হয়েছিলেন সেক্ষেত্রে উপরে বর্ণিত দুইটি ব্যাখ্যার সাথে নুতন একদিক প্রকাশিত হয়ে সামনে আসে। আসুন, ঐ সময়ের ইতিহাসের প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করি যা ছিল আলীর (আ.) জীবনের বিভিন্ন দিকগুলি পর্দার অন্তরালে রাখার জন্য কখনও তরবারি কখনও বিক্রীত কলম আবার কখনও শাসকবর্গের সহযোগিতা নেয়া হতো। বিষয়টি এতদূর গড়িয়েছিল যে, হযরত আলী (আ.) যখন মসজিদে কুফায় আঘাত প্রাপ্ত হন তখন এ সংবাদ শ্রবণকারীরা আশ্চার্য হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল আলী কি নামাজও পড়তেন। অর্থাৎ আলী (আ.) সম্পর্কে ধারণা এমনভাবে পাল্টে ফেলা হয়েছিল অথচতিনি শরিয়তের সত্যিকার রক্ষক হিসাবে জীবন অতিবাহিত করছিলেন। হযরত আলীর (আ.) নামাযের একদিকে এত খ্যতি যে নামাযরত অবস্থায় পা থেকে তীর বের করে নিলেও কোন অনুভূতি নেই অপরদিকে তাঁর সম্পর্কে সবাই সন্ধিহান যে আলী কি নামাজও পড়তেন? আলী (আ.) শেষ মূহূতেৃ আওয়াজ দিলেন “ফুযতো বে রাব্বিল কা’বা” অর্থাৎ আমি এসেছিলাম আমার উদ্দেশ্যের প্রতি দৃঢ় থাকার জন্য, শরিয়ত রক্ষার জন্য এবং রেসালতের পদাঙ্ক অনুসরণের জন্য এতেই আমার সাফল্য নিহিত। যুগ পাল্টে যাক, পাল্টে যাক রাষ্ট্র, কলম (লেখনি) বিক্রি হয়ে যাক, তবুও একটি মুহূর্তের জন্য আমি পরিবর্তনশীল জীবনের প্রতি ধাবিত হবো না এবং বাস্তবে হলোও তাই।
মসজিদুল হারাম থেকে যে জীবন উদ্দেশ্যের সুচনা সমাপ্তি লগ্নে এ কথাই উচ্চারণ করছে “দেখ কোন পরিবর্তনই আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। আমি সফলকাম ছিলাম, সফলকাম আছি এবং সাফল্য নিয়েই এই পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে নিজ প্রতিপালকের নিকটে ফিরে যাচ্ছি।” তাঁ মহান জীবনের প্রতিটি উদ্দেশ্যেই প্রতি আমার সালাম।###
