বুদ্ধিমতী ও কর্তব্যপরায়ণ হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)

by Syed Yesin Mehedi

 

 

হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.) স্বীয় বাল্যকাল কিভাবে অতিবাহিত করেন? ইতিহাসে তাঁর বাল্যকাল সম্পর্কে বিশদ আকারে কোন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দান করেনি। তবে এ প্রসঙ্গে বর্ণিত বিভিন্ন হাদীস ও রেওয়ায়েত থেকে এ বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁর বাল্যকাল অন্যান্য বালক-বালিকাদের ন্যায় শিশুসূলভ আচরণ ও খেলাধুলাতে আদৌ মত্ত ছিল না। মূলতঃ প্রথম থেকেই তাঁর মধ্যে এমন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও পরিপূর্ণতা বিদ্যমান ছিল যে, শিশুসূলভ আচরণের কোন অবকাশই ছিল না। তাঁর  অভ্যন্তরীণ ধারণ ক্ষমতা ছিল অন্য কোন শিশু অপেক্ষা অনেক উর্ধ্বে। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা.) সে কঠিন ও দূর্বিসহ দিনগুলিতে পিতার দুঃখ-কষ্ট লাঘবে একজন পূর্ণবয়ষ্ক ব্যক্তির ন্যায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। শিশুকাল হতেই তাঁর মধ্যে মাতৃত্বের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল এবং তিনি স্বীয় পিতাকে মাতৃত্বের পরশ দিয়ে সিক্ত করতেন।

শিশু ফাতেমা (আ.) প্রায়ই পিতাকে মুশরিকদের অত্যাচার ও দূর্ব্যবহারে ক্লান্ত ও বিষণ্ন অবস্থায় বাড়ী ফিরতে দেখতেন। এমতাবস্থায় তিনি গভীর স্নেহ ও মমতার সাথে পিতাকে জড়িয়ে ধরে সান্তনা দিতেন। একদিন তিনি মসজিদে হারামে পিতাকে নামাজরত অবস্থাতে দেখতে পান। এমন সময় মুশরিকরা তাঁর পিতার পোষাকে নোংরা নিক্ষেপ করছিল। এ দৃশ্য দেখে তিনি অত্যন্ত মনোক্ষুন্ন ও অশ্রুসিক্ত নয়নে পিতার পোষাক হতে ময়লা আবর্জনাসমূহ পরিস্কার করেন।

এভাবে জীবনের শুরু থেকেই অত্যন্ত দায়িত্ব ও কর্তব্যপরায়ণ ছিলেন শিশু ফাতেমা (আ.) এবং স্বীয় পিতাকে সাহায্য ও দেখাশোনার ক্ষেত্রে এক মূহুর্তের জন্যও কালক্ষেপণ করেন নি; যে পিতা শিশুকালেই স্নেহময়ী মাতাকে হারিয়েছেন। আবার সুযোগ্য সহধর্মিনীও অকালে এ পৃথিবী হতে বিদায় নিয়েছেন; এখন কেবল ফাতেমার (আ.) সান্নিধ্যই তাঁর প্রয়োজন। শিশু ফাতেমা (আ.) এমন অবস্থায় পিতা রাসূলুল্লাহর (সা.) পাশে দাঁড়ান যখন তাঁর পিতা তওহীদের বাণী প্রচারের দায়ে চর্তুদিক হতে মুশরিকদের আক্রমণের শিকার। শত্রুরা একদিকে রাসূলকে (সা.) পাগল ও যাদুকর নামে আখ্যায়িত করত আর অপরদিকে তাঁর উপর পাথর ও ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপ করত। এমনকি তাঁর চাচা আবু লাহাব কোরাইশদের প্রতি লক্ষ্য করে বলত, “হে আমার গোত্র, জেনে রেখ! সে (মুহাম্মাদ) তোমাদেরকে যাদু করেছে।” (তাফসীরে নুরুস সাকালাইন, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬৬)

ইসলামের প্রচারকার্যে রাসূল (সা.) পাহাড়সম দুঃখ-কষ্ট ও বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হতেন। নজিরবিহীন ধৈর্য ও সহিষ্ণুর সাথে তিনি সেগুলোর মোকাবেলা করতেন। ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে যখন তিনি বাড়ী ফিরতেন, তখন কন্যা ফাতেমার স্নেহ ও মমতার পরশ পেয়ে নতুনভাবে উদ্দীপনা লাভ করতেন। হযরত ফাতেমার (আ.) মমতা শিশুসূলভ ও চেতনাহীন ছিল না। বরং উক্ত মমতা ছিল গভীর বিচক্ষণতায় পরিপূর্ণ; যা তিনি রাসূলকে (সা.) সান্তনা দান এবং তাঁর রেসালাতের গুরুদায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা দানের নিমিত্তে নিবেদন করতেন।

হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.) শৈশবকালেই মহানবীর (সা.) যাবতীয় দুঃখ-কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করতেন এবং নবুয়্যাতের শাশ্বত বাণীকে গুরুত্বের সাথে স্বীয় সত্তায় ধারণ করেছিলেন। কাজেই এমন শিশুর নিকট খেলা-ধুলা কিম্বা আমোদ-ফুর্তি অর্থহীন হওয়াটাই স্বাভাবিক। সাধারণতঃ অবসর সময়ে খেলা-ধুলার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সুতরাং যার জ্ঞান বিচক্ষণতায়, অনুভূতি বুদ্ধি-বিবেচনায় এবং জীবন বাস্তবতায় পরিপূর্ণ, তাঁর অবসর ও কালক্ষেপণের আদৌ কোন সুযোগ নেই। ফাতেমার (আ.) যে স্নেহ ও মমতা তাঁর পিতার পবিত্র হৃদয়কে আন্দোলিত করত, তা আমাদের পারিবারিক জীবনে এক সুমহান শিক্ষা হিসেবে পরিগণিত। এ বিষয়টি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সন্তান প্রতিপালন পদ্ধতি পারস্পরিক স্নেহ-মমতা ও ভালবাসার গভীরতার উপর নির্ভরশীল। পিতামাতা এমন অনুকূল পরিবেশে দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তিলগ্নে সন্তানাদির স্নেহ-মমতায় সিক্ত হয়ে মানসিক চাপ হতে মুক্তি লাভ করে। আর এভাবে পরিবারসমূহ দ্বিপাক্ষিক সহায়তায় সমৃদ্ধ হয়। কখনও সন্তানরা পিতামাতার মানসিক ভারসাম্যতা রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখে আবার কখনও পিতামাতা সন্তানদের সাথে তাদের সমবয়সী ও খেলার সাথী হিসেবে ভূমিকা পালন করে। আর তাই তো রাসূল (সা.) বলেছে, “যে ব্যক্তির শিশু রয়েছে, তার উচিত স্বীয় শিশুর সাথে শিশুসূলভ আচরণ করা।” (মান লা ইয়াহ যারাহুল ফাকীহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৪৮)

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔