সূরা সাফ্ফের আয়াতগুলো জিহাদের প্রতি অনুপ্রেরণাদায়ক ও উৎসাহব্যঞ্জক এবং এ সূরার সূচনা হয়েছে মু’মিনদের -যারা আল্লাহর উপর ঈমান পোষণ করেন- প্রতি (না কোন মুনাফিকের প্রতি) সম্বোধন করে। কিন্তু যখন জিহাদের বিষয় উত্থাপিত হয়, তখন তারা বারংবার আল্লাহর প্রতি নিজেদের ঈমান ও আস্থার কথা পুনরুক্তি করা সত্তে ও এ বিষয়টি তাদের নিকট কষ্টদায়ক মনে হয়। তাই এ সূরার আয়াতসমূহ এমন ব্যক্তিদের সম্বোধন করে এবং তাদের অবস্থার কথা তুলে ধরে বর্ণিত হয়েছে। এমন অবস্থা এক ধরনের ব্যাধি হিসেবে গণ্য, যে বিষয়ের প্রতি আমাদের মনোনিবেশ করা উচিত। আর এ ব্যাধি হচ্ছে মানুষ কখনও কখনও কোন বিষয়ে মত প্রকাশ করে কিংবা দাবি উত্থাপন করে। হয়তো সে এক্ষেত্রে আদৌ মিথ্যা বলছে না এবং মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে যে, কাজটি সঠিক, সে নিজেও উক্ত কাজ সম্পন্নের জন্য মনঃস্থির করেছে এবং এমন ধ্যান-ধ্যারণার ভিত্তিতেই এরূপ দাবি তুলেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে উক্ত বিষয় সম্পর্কে নির্ভুল বিশ্লেষণ ও সম্যক ধারণা না থাকায় কিংবা এক্ষেত্রে সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হওয়াতে যখন কার্যকর পদক্ষেপ নেবার সময় আসে এবং সেক্ষেত্রে বিপদাপদের আশংকা থাকে, তখন পশ্চাদপসরণ করে। আর এ অবস্থাই হচ্ছে এক ধরনের ব্যাধি তথা দাবি উত্থাপনের পরও সময়মত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। আর এ কারণেই তো পবিত্র কুরআনের কিছু আয়াতে এ ধরনের লোকদের স্বরূপ এভাবে তুলে ধরা হয়েছে,
(হে রাসূল!) তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য কর নি-যাদের মক্কায় অবস্থানকালীন- বলা হয়েছিল, ‘(এখন কিছু দিন) হাত গুটিয়ে থাক -জিহাদ থেকে বিরত থাক- এবং নামায প্রতিষ্ঠা কর ও যাকাত প্রদান কর’ (তখন তারা অস্থির হয়ে গেল)। যখন -মদীনায় আসার পর- যুদ্ধ আবশ্যিক করা হল তখন তাদের মধ্যে একদল লোকদেরকে (শত্রুদের) এমনই ভয় করতে লাগল যেমন আল্লাহকে ভয় করা উচিত, বরং এর চেয়েও বেশি; এবং তারা (ঘাবড়ে গিয়ে) বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের ওপর কেন যুদ্ধকে আবশ্যিক করে দিলে; আমাদের কেন আরও কিছু দিন অবকাশ দিলে না।’ ( সূরা নাস : ৭৭ )
ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন লোকদেরকে বলা হয়েছিল যে, তোমরা মক্কার জীবনে শুধুমাত্র নামায আদায় ও জাকাত প্রদান কর (কেননা মক্কাতে কোন যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল না); কিন্তু পরবর্তীতে যখন আল কুরআনে তাদের প্রতি জিহাদ বা যুদ্ধের বিধান জারি করা হয়, তখন তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। অর্থাৎ তারা যুদ্ধ করতে ভয় পেল। অথচ তারা আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল এবং রাসূলের (সা.) সাথে তাদের বাইয়াতের পূর্ব শর্ত ছিল যে, তারা যে কোন সমস্যা ও প্রতিকূলতা মোকাবেলায় সম্মত থাকবে। হয়তো তারা সে সমস্যা ও বিপদাপদগুলোকে সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে নি এবং সেগুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল না। অথবা তারা নিজেদের সামর্থ সম্পর্কে যথাযথভাবে ওয়াকিবহাল ছিল না। আর এ সব কারণেই তারা যুদ্ধ থেকে পিছপা হয়েছিল।
মানুষের মধ্যে কখনও কখনও এমন ব্যাধির জন্ম নেয়। আর এমন অবস্থা শুধুমাত্র জিহাদ বা যুদ্ধের ক্ষেত্রে দেখা যায় এমনটি নয়। বরং মানব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যখন কোন ভারী কিংবা গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়, তখন এমন অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। মানুষ নিজের মধ্যে কিছু কল্পনা করে ও ভাবে বিষয়টি হয়তো সহজসাধ্য হবে এবং তদানুযায়ী উচ্চবাচ্য করে থাকে; কিন্তু যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় এবং কঠিন পরিস্থিতি সামনে এসে দাঁড়ায়; তখন তা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে নিজের দূর্বলতা ও অক্ষমতার বিষয়টি বুঝতে পারে। আলোচ্য সূরা ও এর আয়াতগুলোয় জিহাদ সম্পর্কে এসব ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিপাত করার পাশাপাশি তাদেরকে প্রশিক্ষিত ও গড়ে তোলার অভিপ্রায় ও ইচ্ছা বিদ্যমান।
