সূরা সাফ্ফ পবিত্র কুরআনে সূরা মুমতাহানার পর এবং সূরা জুমআর পূর্বে বিদ্যমান। এটি কুরআনের অন্যতম সূরা যেটির আয়াতসমূহ একটি নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুকে ঘিরে বর্ণিত হয়েছে; আর তা হচ্ছে- আল্লাহর পথে জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ এবং যারা দুঃখ-কষ্ট, বিপদাপদ এবং পার্থিব জীবনের প্রতি মোহাচ্ছন্নতার কারণে জিহাদ করা থেকে বিরত থাকে তাদেরকে কঠোরভাবে তিরস্কৃত করা হয়েছে। অর্থাৎ এ সূরার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে জিহাদ। অবশ্য এ বিষয়ের পাশাপাশি আরও অনেক বিষয়ও বাস্তবতার প্রতি ইশারা করা হয়েছে।
আল কুরআনে জিহাদ সম্পর্কে নানাবিধ আয়াত বর্ণনার নেপথ্য কারণ
প্রথমেই উল্লেখ করতে চাই যে, পবিত্র কুরআনে জিহাদ সম্পর্কে নানাবিধ আয়াত ও বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। যদি আমরা সে আয়াতগুলোকে শ্রেণী বিন্যাস করি তাহলে তা দশ ভাগে বিভক্ত করা যাবে। যেমন- কিছু আয়াতে জিহাদের আবশ্যকীয়তা বর্ণনা করা হয়েছে, কিছু আয়াতে জিহাদের উদ্দেশ্যাবলি তুলে ধরা হয়েছে, কোন কোন আয়াতে জিহাদের বিধিবিধান বর্ণনা করা হয়েছে, আবার কিছু আয়াতে যে সব ব্যক্তি জিহাদ পরিত্যাগ করে ও জিহাদের প্রতি আকিদা পোষণ করে না, তাদের প্রতি ভর্ৎসনা করা হয়েছে। এছাড়া এ সম্পর্কে আরও কিছু আয়াত রয়েছে, যেগুলোর মূখ্য বিষয়বস্তু হচ্ছে জিহাদের প্রতি গুরুত্বারোপ এবং এর প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণ। অবশ্য সেগুলো ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা ও বাচনভঙ্গিতে উত্থাপিত হয়েছে। আর এমনটির নেপথ্য কারণ হচ্ছে যারা জিহাদের বিধানের মুখোমুখি হয় এবং এ বিধান অনুধাবন ও বাস্তবায়ন করে; তাদের মন-মানস, চিন্তা-চেতনা এবং জীবনধারাতে কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। আর উক্ত বৈশিষ্ট্যাবলির ভিত্তিতে তাদের নিজেদের মধ্যে এক ধরনের বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হয়; আর তা হচ্ছে- হয় তারা জিহাদের বিধানকে মেনে নেবে ও সাগ্রহে জিহাদের দিকে ছুটে যাবে ও এ পথে আগত সব ধরনের বিপদাপদকে সহ্য করবে, নতুবা এ কাজে শৈথিল্য প্রদর্শন করবে কিংবা আদৌ এ বিধানকে মেনে নেবে না, অথবা পার্থিব স্বার্থ হাসিলের নিমিত্তে জিহাদের দিকে অগ্রসর হবে প্রভৃতি।
সব মানুষ সমান ও এক ধরনের নয়। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের প্রতি যখন জিহাদের আহব্বান জানান হয় তখন তাদের মধ্যে নানাবিধ প্রকারভেদ ও অবস্থার সৃষ্টি হয়। যেমন- আমাদের প্রচলিত সমাজে যখন জিহাদ আহব্বান আসে তখন একটি শ্রেণী অধীর আগ্রহের সাথে জিহাদের ময়দানে ছুটে যায়, আবার একটি দল তীব্র আগ্রহ না থাকা সত্তে ও জিহাদে অংশগ্রহণ করে, একটি শ্রেণী জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, কেউ কেউ অংশগ্রহণ না করলেও যারা অংশগ্রহণ করে তাদেরকে উৎসাহ দেয়, আবার একদল লোক কোন ধরনের উৎসাহ যোগান থেকেও বিরত থাকে। অর্থাৎ বিভিন্ন শ্রেণী ও ধ্যান-ধারণার লোক রয়েছে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আমরা যে সমাজে বসবাস করছি সে সমাজের অধিকাংশই আল্লাহর পথে জিহাদ করাকে ভীষণভাবে পছন্দ করে; হয় তারা নিজেরাই জিহাদের ময়দানে ছুটে যায় কিংবা নিজেদের কাউকে জিহাদে প্রেরণ করে অথবা নুন্যতম যারা জিহাদরত রয়েছে তাদের প্রতি উৎসাহ যোগায় ও সম্মান প্রদর্শন করে। অবশ্য ইতিহাসে সব সময় এমন অবস্থা বহাল ছিল না; যেমন- রাসূলুল্লাহর (সা.) যুগে যখন কেবল ইসলামের অভ্যুদয় ঘটেছিল, তখনও সে সমাজের লোকদের মধ্যে জাহেলি যুগের রীতি-প্রথার রেশ ছিল, তখনও তাদের মধ্যে ধন-সম্পদের প্রতি মোহাচ্ছন্নতা, পার্থিব জীবনের প্রতি আসক্তি, কিছু বেশি দিন এ জগতে বেঁচে থাকা ও জগতের ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকার প্রবণতা বিদ্যমান ছিল। প্রকাশ থাকে যে, এমন অবস্থা সবার মধ্যে ছিল না বরং অনেকের মধ্যে বিরাজমান ছিল। এ কারণেই তো পবিত্র কুরআনের কিছু আয়াতে জিহাদ থেকে বিরত থাকা লোকদের প্রতি তীব্র ভর্ৎসনা করা হয়েছে।
115
আগের পোস্ট
