শত্রুতা ও অন্যদের প্রতি ঘৃণার মনোভাব পোষণের ফলে সৃষ্ট বিপজ্জনক মনস্তাত্তি¡ক ও আচার-আচরণগত উচ্ছৃংখলতা এবং এর থেকে সৃষ্ট ক্ষতির চেয়ে মারাত্মক আর কোন ক্ষতি মানুষের জীবনে হতে পারে না। মানুষের ঘৃণার অনুভূতি, তার মনের সুখ-শান্তিকে বিনষ্টকারী ক্ষতিকর দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম। ক্রোধ হতে ঘৃণার উৎপত্তি হয় এবং তা মানুষের চিন্তার ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে। একজন মানুষ যখন রাগান্বিত হয় তখন কোন কারণ হয়ত তার অন্তরের ক্রোধের অগ্নিশিখাকে নির্বাপিত করে তার মনস্তাত্তি¡ক অস্থিরতাকে দূর করে। তবে, ঘৃণার একটি অগ্নিষ্ফুলিঙ্গ তার অন্তরে অবশিষ্ট থেকে যেতে পারে, যা তার সুখকে জ্বালিয়ে দিয়ে তার অন্তরের শান্তিকে নষ্ট করে। ক্ষমা, দয়াশীলতা ও মানসিক ভারসাম্য সুখ-শান্তির প্রধান উপাদান, আর এর উল্টো হচ্ছে শত্রুতা ও ঘৃণা-বিদ্বেষ যা মানুষের মধ্যে মত বিরোধ ও অনৈক্য ঘটায়। এসব হচ্ছে অপরাধমূলক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। ক্রোধ আবেগের অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দূর করে, কিন্তু মন্দকে মন্দের দ্বারা মোকাবিলা করার প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে যে যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়, তা অন্য কোন দুঃখ-যন্ত্রণার চেয়ে বেশী মারাত্মক। এর কারণ হচ্ছে এই যে, শেষোক্ত ধরনের যন্ত্রণা স্বভাবতঃ সাময়িক হয়ে থাকে, কিন্তু শত্রুতার যন্ত্রণা সাময়িক নয় কারণ শত্রুপক্ষের বীর যোদ্ধারা যখন হাজির হয়ে যায়, তখন তারা মনের গভীরে লুকানো ঘৃণাকে পুনরায় জাগ্রত করে তোলে। অধিকন্তু, একটা মন্দ কাজের দ্বারা শত্রুতা দূর হয় না, বরং পুনরায় অন্তরের পুরাতন ক্ষতচিহ্নকে আরও প্রসারিত করে এবং প্রতিরক্ষা বা প্রতিশোধমূলক কাজ করার জন্য প্রস্তুত করে।
শত্রুতা যন্ত্রণাদায়ক পরিণতি ও বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে এটিই একবার দেখা দিলে তার প্রতিকার করা সম্ভব নাও হতে পারে। শত্রুতা বা ঘৃণা হতে উদ্ভূত অযৌক্তিক কাজের ফলে একজন ব্যক্তি চিরদিনের জন্য তার এ ধরনের চেতনার শিকারে পরিণত হয়ে যেতে পারে। ব্যাপারটা এত দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে যে সে শেষ পর্যন্ত তার নিজের জন্য মারাত্মক ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। এমন কিছু লোক রয়েছে, যাদের জীবনে ক্ষমা বা মহত্ত¡ প্রদর্শনের কোন নজির পাওয়া যায় না। কারণ তারা তাদের জীবনে তাদের বিরুদ্ধে কৃত সামান্যতম সীমালংঘন বা দুর্বলতাকেও ভুলে যায় না। এসব উচ্ছৃঙ্খল অনুভূতি এমন যে প্রতিশোধ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের শক্তি ও যোগ্যতার অপচয় করতে তাদেরকে প্ররোচিত করে, তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে হলেও।
এমন কিছু লোক রয়েছে যারা অতি সহজে রেগে যায় এবং দ্রুত প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চায়। তারা তাদের আচরণের উপর সামান্যতম সমালোচনা শুনতে রাজী নয়। অপরপক্ষে, শক্তিমান ও জ্ঞানী লোকেরা সমালোচনা হতে গঠনমূলক বিষয়াদি শিখে এবং উন্নততর জীবনযাপনে পরিবর্তিত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে।
জনৈক বিজ্ঞ পন্ডিতের মতে: “শক্ত প্রতিক্রিয়ার (সমালোচনার জবাবে) দ্বারা পূর্ণ পরিপক্কতার অভাব বুঝা যায়। কেননা, প্রথম হতে বিরোধিতা বা অপমানিত হওয়ার মত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে থাকলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হওয়ার সুযোগ ঘটতো। একজন লোক প্রথম হতে অপমানিত হওয়ার কারণসমূহ সম্পর্কে মনে মনে চিন্তা করতে পারে। হয় সে সত্যিই অপমানিত হয়নি কিংবা সত্যি অপমানিত হয়েছে। উভয়ক্ষেত্রে দুঃখ পাবার বা অভিযোগ করার কোন কারণ নেই। যদি সত্যি সে অপমানিত হয়ে থাকে, তাহলে তা হয়ত তার স্বাভাবিক কোন দুর্বলতার কারণে ঘটেছে এবং এজন্য তার উচিত কোন অভিযোগ না করে দুর্বলতা হতে মুক্ত হবার জন্য কাজ করা অথবা এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনও হতে পারে এ ক্ষেত্রেও মানুষকে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত নয় বরং এটাই অনুভব করা উচিত যে, যে লোকটি তাকে অপমানিত করেছে সে হয়তো ঈর্ষান্বিত হয়ে খারাপ উদ্দেশ্যে করেছে। একজন হতাশাগ্রস্ত ও অবিবেচক ব্যক্তি তার প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করার প্রচেষ্টায় কি বা একজন মুর্খ লোক অন্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ঘটনা তৈরী করে তাকে হেয় করার চেষ্টা করছে। যে কোন কারণেই হোক না কেন একজন জ্ঞানী ব্যক্তিকে এ ধরনের অজ্ঞতাজনিত কারণে কৃত কোন ব্যাপারে দুঃখ অনুভব করা উচিত নয়।”
একজন ব্যক্তি যখন অর্থহীন অনুভূতি দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন সে প্রতিশোধ গ্রহণের কাজ করে। ছেলেবেলাকার কোন ক্ষত বা আঘাতের ফলে প্রাপ্ত দৈহিক অসুস্থতা কিংবা এমন একটা সামাজিক পরিবেশ, যেখানে দুঃখজনক কোন ঘটনার অভিজ্ঞতা অর্জনের কারণে, একজন ব্যক্তি অর্থহীন অনুভূতি দ্বারা আক্রান্ত হয়। ফলে তার দ্বারা প্রতিশোধস্পৃহাজনিত কাজ সংঘটিত হয়। অন্যকথায় বলা যায় যে, মানসিক বিকৃতিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরাই, তাদের ব্যর্থতা বা ক্ষুদ্রতা পূরণ করতে গিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণের পন্থাকে গ্রহণ করে থাকে। এসব লোক অন্যদের ক্ষতি করার জন্য পথ খুঁজতে থাকে এবং যে কোন অপরাধমূলক কাজ করতে পারে।
খারাপ অবস্থা হতে মুক্তিলাভের কার্যকরী পন্থাসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জীবনের পবিত্র উদ্দেশ্যসমূহের অনুসরণ, কেননা যে নিজের আত্মা ও আচার-আচরণকে পরিশুদ্ধ করে এবং অপরাপর লক্ষ্যসমূহকে বর্জন করে, সে তার বিরুদ্ধে অন্যদের কৃত দুর্ব্যবহার উপেক্ষা করতে পারে।
অন্যদের দুর্ব্যবহারের দ্বারা আমরা কতখানি প্রভাবিত হব তা আমাদের উপর নির্ভর করে। আমাদের চিন্তাধারাকে পরিবর্তনের কাজটিও আমাদের ইচ্ছাধীন, সুতরাং আমরা ইচ্ছা করলে আমাদের মনের মধকার বিভিন্ন শক্তির প্রভাবকে এমনভাবে পরিবর্তন করতে পারি যাতে আমাদের আত্মার উপর চাপ সৃষ্টিকারী স্পৃহাকে উৎপাটিত করে নিজেদেরকে শক্তিশালী করা যায়। এছাড়াও, আমরা যদি আমাদের নৈতিক দায়িত্বকে উপেক্ষা করি, তাহলে অন্যদের পক্ষে আমাদের দোষত্রæটি দূরীকরণে সাহায্য করা সম্ভব নয়।
প্রতিশোধ গ্রহণের ধরন বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। কিছু লোক এমন সব বস্তু দ্বারা তাদের শত্রæদের উপর আক্রমণ চালায় যা তাদের জন্য পূর্ণ দুর্ভাগ্য ডেকে নিয়ে আসে। যদিও এর মাধ্যমে তারা তাদের প্রতিপক্ষকে ধার্মিকতা ও সততার পথে পরিচালিত করার ভান করে থাকে। এসব প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা জেনে শুনে ষড়যন্ত্র করছে।
জনৈক পাশ্চাত্য পন্ডিতের মতে: শত্রুতা ও ঘৃণা মানসিক অস্থিরতা হতে উৎপন্ন হয়। অন্য কোন দৃশ্যমান কারণ না থাকলে সাধারণতঃ আমরা আমাদের মধ্যকার সকল সমস্যাই ভ্রাতৃত্বসুলভ আচরণের দ্বারা সমাধা করতে পারি। কিন্তু অহংকার ও দাম্ভিকতা তা কিছুতেই করতে দেয় না। আমরা প্রায়ই আমাদের বন্ধু বান্ধব ও প্রিয়জনদের কৃত ছোটখাটো ভুলের কারণে তাদেরকে পরিত্যাগ করে থাকি। অনেক সময় তাদেরকে নিরাপরাধ জেনেও আমরা তাদেরকে ক্ষমা করতে পারি না। আমি আশা করি যে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আমাদের এ ধরনের অবিচার কমাতে সক্ষম হব।
687
আগের পোস্ট
