যেসব অবস্থায় কেবল রোযার কাযা করা ওয়াজিব

by Syed Yesin Mehedi

১। এমন কতক ক্ষেত্র রয়েছে যেগুলোতে মানুষের উপর কেবলমাত্র রোযার কাযা করা ওয়াজিব, কাফফারা নয়। আর সেগুলো হচ্ছে নিম্নরুপ:

ক) রমযান মাসে কোনো রোযাদার ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করেন।
খ) রোযাদার ব্যক্তি যদি রমযানের রাতে  ফজরের আযান পর্যন্ত তৃতীয়বার ঘুম থেকে জাগ্রত না হন।
গ) রোযাদার ব্যক্তি রোযা বাতিলকারী কোনো কাজ যদি নাও করেন কিন্তু যদি রোযার নিয়ত না করেন কিংবা লোক দেখানোর নিয়তে রোযা রাখেন অথবা রোযা না রাখার নিয়ত করেন।
ঘ) কেউ যদি রমযান মাসে জানাবতের গোসল করা ভুলে গিয়ে এক বা একাধিক রোযা রাখেন।
ঙ) রমযান মাসে সুবহে সাদেক সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া বা অনুসন্ধান ব্যতীত এমন কোনো কাজ করতে থাকা যা রোযাকে বাতিল করে দেয় এবং পরে জানা যায় যে, তখন সুবহে সাদেক হয়ে গিয়েছিল। অনুরূপভাবে অনুসন্ধান করার পর তিনি ধারণা করেন যে, সুবহে সাদেক হয়ে গিয়েছে এরপরও তিনি এমন কোনো কাজ করেন যা রোযাকে বাতিল করে দেয় এবং পরে নিশ্চিত হতে পারেন যে, তখন সুবহে সাদেক হয়ে গিয়েছিল, তাহলে সেই দিনের কাযা করা তার উপর ওয়াজিব। আর যদি অনুসন্ধানের পর ধারণা হয় বা তিনি নিশ্চিত হন যে, সুবহে সাদেক হয়নি এবং কোনো কিছু খেয়ে নেন কিন্তু পরে জানতে পারেন যে, তখন সুবহে সাদেক হয়ে গিয়েছিল তাহলে সে রোযার কাযা করা ওয়াজিব নয়। একইভাবে অনুসন্ধানের পর যদি সন্দেহ হয় যে, সুবহে সাদেক হয়ে গিয়েছিল তাহলেও কাযা ওয়াজিব নয়।
চ) “সুবহে সাদেক হয়নি” এমর্মে কারও কথার উপর আস্থা রেখে রোযা বাতিলকারী কোনো কাজ করার পর জানা যায় যে, সে সময় সুবহে সাদেক হয়ে গিয়েছিল।
ছ) “সুবহে সাদিক হয়ে গিয়েছে” এমর্মে কেউ বলার পরও তিনি সেটিকে ঠাট্টা কিংবা মিথ্যা ধারণা করে রোযা বাতিলকারী কোনো কাজ করার পর যদি জানতে পারেন যে, বাস্তবক্ষেত্রেই সে সময় সুবহে সাদেক হয়ে গিয়েছিল।
জ) অন্ধ বা এ ধরনের কোনো মাযুর [নিরুপায়] ব্যক্তি কারও কথার প্রেক্ষিতে ইফতার করার পর যদি জানতে পারেন যে, তখন ইফতারের সময় হয়নি।
ঝ) আকাশ পরিষ্কার, কিন্তু অন্ধকার নেমে আসার কারণে কেউ ইফতারের সময়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে ইফতার করে নিয়ে যদি জানতে পারেন যে, তখন ইফতারের সময় হয়নি। তবে মেঘের কারণে আকাশ পরিষ্কার না থাকায় ইফতারের সময় হয়ে গিয়েছে বলে অনুমিত হওয়ায় তিনি ইফতার করে নিয়ে যদি জানতে পারেন যে, তখন ইফতারের সময় হয়নি, তাহলে সেক্ষেত্রে সেই রোযার কাযা করা তার উপর ওয়াজিব নয়।
ঞ) কেউ যদি ঠান্ডা লাভের উদ্দেশ্যে মুখে পানি নেন [কুলি করেন] কিংবা অকারণে কুলি করেন, আর অনিচ্ছাকৃতভাবে পানি গলার ভিতরে চলে যায় তাহলে তাকে সে দিনের রোযার কাযা করা ওয়াজিব। তবে তিনি যদি রোযাদার হওয়ার কথা ভুলে গিয়ে পানি পান করে নেন অথবা অজুর উদ্দেশ্যে কুলি করার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে পানি ভিতরে চলে যায় তাহলে তার জন্যে কাযা ওয়াজিব নয়।
২। পানি ব্যতীত অপর কোনো বস্তু মুখে রাখলে ও তা অনিচ্ছাকৃতভাবে ভিতরে চলে গেলে কিংবা নাকে পানি দিলে এবং তা অনিচ্ছাকৃতভাবে ভিতরে চলে গেলে তার কাযা ওয়াজিব নয়।
৩। একাধিক কুলি করা রোযাদার ব্যক্তির জন্যে মকরূহ। কুলি করার পর যদি তিনি থুথু গিলতে চান তাহলে প্রথমে তিনবার থুথু ফেলে নেয়া উত্তম।
৪। যদি কোনো ব্যক্তি জ্ঞাত থাকেন যে, কুলি করলে পানি বিনা বাধায় অথবা ভুলে ভিতরে প্রবেশ করবে তাহলে তার কুলি করা উচিৎ নয়।
৫। রমযান মাসে যদি কেউ অনুসন্ধানের পর সুবহে সাদেক হয়নি এই মর্মে নিশ্চিত হন এবং রোযা বাতিলকারী কোনো কাজ করেন ও পরে জানতে পারেন যে, তখন সুবহে সাদেক হয়ে গিয়েছিল তাহলে সে রোযার কাযা করা তার উপর ওয়াজিব নয়।
৬। কোনো রোযাদার ব্যক্তির যদি সন্দেহ হয় যে, ইফতারের সময় হয়েছে কিনা তাহলে তিনি ইফতার করতে পারবেন না। তবে সুবহে সাদেক হয়েছে কিনা এই মর্মে সন্দেহ হলে অনুসন্ধান করার পূর্বে সেসব কাজ করতে পারেন যা রোযাকে বাতিল করে দেয়।
ফওত হওয়া (ছুটে যাওয়া) রোযা কাযা করার আহকাম
১। যদি কোনো পাগল ব্যক্তি সুস্থ হয়ে ওঠেন তাহলে তার জন্যে রমযান মাসের সেসব রোযার কাযা করা ওয়াজিব নয় যেসব দিনে তিনি পাগল বা অসুস্থ ছিলেন।
২। যদি কোনো কাফের [অমুসলিম] ব্যক্তি মুসলমান হন তাহলে তার জন্যে সেসব রোযার কাযা করা ওয়াজিব নয় যেসব দিনে তিনি কাফের ছিলেন। তবে কোনো মুসলমান যদি কাফের হয়ে যান এবং পুনরায় মুসলমান হন তাহলে তার জন্যে সেসব রোযার কাযা করা ওয়াজিব যেসব দিনে তিনি কাফের ছিলেন।
৩। নেশার কারণে যেসব রোযা নষ্ট হয়েছে তার কাযা করা ওয়াজিব-যদিও নেশাগ্রস্থ করার দ্রব্যটি চিকিৎসার জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কেউ যদি রোযার নিয়ত করে রোযা রাখা অবস্থায় মাতাল হয়ে যান এবং রোযা অবস্থাতেই তার মাতলামি কেটে যায় তাহলে এহতিয়াতে ওয়াজিব হচ্ছে তাকে সেই রোযা সমাপ্ত করতে হবে এবং এর কাযাও করতে হবে। আর যদি মাতাল অবস্থাতেই রোযাসহ দিনটি শেষ হয়ে থাকে তাহলে তাকে কাযা করতে হবে।
৪। কেউ যদি কোনো কারণবশতঃ কিছুদিন রোযা না রেখে থাকেন এবং পরে সেই কারণটি কবে শেষ হয়েছিল তা নিয়ে সন্দেহ হয়, এমতাবস্থায় তার ধারণা অনুযায়ী যে কয়দিন তিনি রোযা রাখেননি সে কয়দিনেরই কাযা করতে হবে। যেমন- তিনি রমযানের পূর্বে সফরে বেরিয়েছিলেন অথচ তার মনে নেই যে, তিনি রমযানের পাঁচ তারিখে ফিরে এসেছিলেন, নাকি ছয় তারিখে, সেক্ষেত্রে তাকে কেবলমাত্র ৫ দিনের রোযার কাযা করতে হবে। অনুরূপভাবে কেউ যদি স্মরণ করতে না পারেন যে, কারণটি কোন্ দিন সৃষ্টি হয়েছিল তাহলে তিনি কম পরিমাণ রোযার কাযা করবেন। যেমন- কেউ যদি রমযানের শেষ দিনগুলিতে সফর করে রমযানের শেষে ফিরে আসেন অথচ তার স্মরণে নেই যে, তিনি রমযানের ২৫ তারিখে সফর করেছিলেন নাকি ২৬ তারিখে, সেক্ষেত্রে তাকে কম পরিমাণ অর্থাৎ ৫ দিনের রোযার কাযা করতে হবে।
৫। যদি কারও কাঁধে কয়েক রমযানের রোযার কাযা থেকে থাকে তাহলে তিনি প্রথমে যে কোনো রমযানের রোযার কাযা করতে পারেন এবং এতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে শেষ রমযানের রোযার কাযা করার সময় যদি সংকীর্ণ হয়, যেমন- শেষ রমযানের ৫দিনের রোযার কাযা তার কাঁধে ছিল এবং সামনের রমযান আসতে আর মাত্র ৫ দিন বাকী, তাহলে তাকে শেষ রমযানের রোযার কাযা করতে হবে।
৬। যদি কারও কাঁধে কয়েক রমযানের রোযার কাযা থেকে থাকে এবং তিনি নিয়তে নির্দিষ্ট করে না থাকেন যে, কোন্ রমযানের কাযা করছেন, তাহলে তা প্রথম রমযানের রোযার কাযা হিসেবে গণ্য হবে।
৭। কাউকে যদি ফওত হওয়া [ছুটে যাওয়া] রোযার কাযা করতে হয় এবং তা কাযা করার সময় যদি সংকীর্ণ না হয়, তাহলে তিনি যোহরের পূর্বে রোযা ভেঙ্গে দিতে পারেন।
৮। কেউ যদি কোনো নির্দিষ্ট রোযার কাযা করেন তাহলে এহতিয়াতে ওয়াজিব হচ্ছে যোহরের পর সেই রোযা না ভাঙ্গা।
৯। যদি কোনো রুগ্ন ব্যক্তি [নারী-পুরুষ উভয়ই] অথবা হায়েয বা নেফাসে আক্রান্ত ব্যক্তি [নিছক নারী] এসব কারণে রোযা না রেখে থাকেন এবং রমযান শেষ হওয়ার পূর্বেই মারা যান, তাহলে সেই রোযার কাযা করা ওয়াজিব নয়।
১০। কেউ যদি অসুস্থতার কারণে রমযানের রোযা রাখতে না পারেন এবং আগামী রমযান পর্যন্ত তার অসুস্থ্যতা অব্যাহত থাকে, তাহলে তা কাযা করা ওয়াজিব নয়। তবে তার উচিৎ হচ্ছে প্রতিটি রোযার পরিবর্তে এক মুদ্দ করে খাদ্যদ্রব্য ফকিরকে দেয়া। আর যদি অন্য কোনো কারণে [যেমন- সফর] রোযা না রেখে থাকেন এবং তা পরবর্তী রমযান পর্যন্ত অব্যাহত থাকে তাহলে এ রোযার কাযা করা জরুরী এবং এহতিয়াতে মুস্তাহাব হচ্ছে প্রতিটি রোযার পরিবর্তে এক মুদ্দ করে খাদ্যদ্রব্য ফকিরকে দেয়া।
১১। যদি কেউ রোগের কারণে রমযানের রোযা না রেখে থাকেন এবং রমযানের পর সুস্থ্যতা লাভ করেন, কিন্তু অপর কোনো সমস্যার কারণে পরবর্তী রমযান পর্যন্ত তার কাযা করতে না পারেন, তাহলে এ রোযার কাযা করা তার জন্যে উচিৎ। অনুরূপভাবে রমযান মাসে যদি কেউ রোগ ব্যতীত অপর কোনো কারণে রোযা রাখতে না পারেন এবং রমযানের পর সেটি দূরীভূত হয়ে যায়; কিন্তু রুগ্নতার কারণে পরবর্তী রমযান পর্যন্ত তার কাযা করতে না পারেন, তাহলে ফওত হওয়া রোযার কাযা করা তার জন্যে জরুরী।
১২। যদি কেউ কোনো কারণবশতঃ রমযান মাসে রোযা রাখতে না পারেন এবং রমযানের পর সেটি দূরীভূত হয়ে যায়; কিন্তু তিনি পরবর্তী রমযান পর্যন্ত সেই রোযার কাযা করতে না পারেন, তাহলে তাকে প্রতিটি রোযার পরিবর্তে এক মুদ্দ করে খাদ্যদ্রব্য ফকিরকে দিতে হবে।
১৩। কেউ যদি রোযার কাযা করতে গড়িমসি করার কারণে সময় সংকীর্ণ হয়ে পড়ে এবং এই সংকীর্ণ সময়ে যদি কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয় তাহলে তাকে তা কাযা করার পাশাপাশি প্রতিটি রোযার জন্যে এক মুদ্দ করে খাদ্যদ্রব্য ফকিরকে দিতে হবে।
১৪। যদি কোনো ব্যক্তি কয়েক বছর পর্যন্ত অসুস্থ থাকার পর আরোগ্য লাভ করেন এবং পরবর্তী রমযান পর্যন্ত যদি সে রোযাগুলোর কাযা করার সময় অবশিষ্ট থেকে থাকে; তাহলে সেক্ষেত্রে তাকে শেষ রমযানের রোযার কাযা করতে হবে এবং অপর বছরগুলোর প্রতিটি রোযার জন্যে তাকে এক মুদ্দ পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য ফকিরকে দিতে হবে।
১৫। যদি কাউকে রোযার পরিবর্তে কয়েক মুদ্দ পরিমাণ আহার ফকিরকে দিতে হয়ে তাহলে তিনি কয়েক দিনের কাফফারা একজন ফকিরকে দিতে পারেন।
১৬। যদি কোনো ব্যক্তি রমযানের রোযার কাযা করাকে একাধিক বছর বিলম্বিত করেন তাহলে তাকে তার কাযাও করতে হবে এবং প্রতিটি রোযার পরিবর্তে এক মুদ্দ পরিমাণ খাদ্যদ্রব্যও দিতে হবে।
১৭। কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে যদি রমযানের রোযা না রাখেন তাহলে তাকে এর কাযা করতে হবে। এতদ্ব্যতীত প্রতিটি রোযার পরিবর্তে তাকে দুই মাস করে ধারাবাহিকভাবে রোযা রাখতে হবে অথবা ৬০ জন মিসকিন খাওয়াতে হবে কিংবা একজন কৃতদাস মুক্ত করতে হবে। আর যদি তিনি পরবর্তী রমযান পর্যন্ত এর কাযা না করেন তাহলে প্রতিটি রোযার পরিবর্তে তাকে এক মুদ্দ পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য দেওয়াও জরুরী।
১৮। যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রমযানের কোনো রোযা না রাখেন এবং সে দিন এমন কাজও করেন যা রোযা বাতিল করে দেয়, [যেমন- একাধিকবার সহবাস করা] তাহলে তার জন্যে একটি কাফফারাই যথেষ্ট।
১৯। পিতার মৃত্যুর পর তার বড় ছেলের উপর পিতার ফওত হওয়া নামায-রোযা কাযা করা ওয়াজিব; কিন্তু মাতার নামায-রোযা কাযা করা তার উপর ওয়াজিব নয়।
২০। কোনো মৃত পিতার উপর রমযান ব্যতীত অপর কোনো ওয়াজিব রোযা [যেমন- মান্নতের রোযা] থাকলে সেটিও বড় ছেলেকে কাযা করতে হবে।

(সূত্র : রোযার আহকাম ও শবে কদরের আমল সংকলন: সৈয়দ মোঃ রেজা রাজাভী )

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔