ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর নৈকট্য অর্জনের উপায়

by Syed Yesin Mehedi

ইসলামের ইতিহাসে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর গায়বাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও রহস্যময় অধ্যায়। বহু মুসলমানের হৃদয়ে এ প্রশ্ন জাগে গায়বাতের যুগে কীভাবে তাঁর নৈকট্য অর্জন করা সম্ভব? ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমের হাওজায়ে ইলমিয়ার প্রখ্যাত শিক্ষক ও বিশিষ্ট ধর্মীয় বক্তা হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন হাবিবুল্লাহ ফারাহজাদ এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।
গায়বাত: অনুপস্থিতি নয়, বরং অচেনা উপস্থিতি
হুজ্জাতুল ইসলাম ফারাহজাদ ব্যাখ্যা করেন যে, গায়বাতের অর্থ ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর পৃথিবীতে অনুপস্থিতি নয়। বরং তিনি মানুষের মাঝেই উপস্থিত আছেন। বহু বর্ণনায় এসেছে, তিনি মানুষের সাথে মিশে চলেন, এমনকি মানুষের ঘরের মাটিতেও তাঁর পদচিহ্ন রয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে তিনি একটি হাদিস উদ্ধৃত করেন: “যখন আমাদের কায়েম (আ.ফা.) জুহুর করবেন, তখন মানুষ বলবে: আমরা তো তাঁকে আগে থেকেই দেখতাম। কিন্তু তাঁকে চিনতে পারিনি।” (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৫২, হাদিস ২৩)
অর্থাৎ ইমাম আমাদের জীবনের বাস্তব প্রেক্ষাপটে উপস্থিত, তবে আধ্যাত্মিক দৃষ্টির অভাবে আমরা তাঁকে চিনতে পারি না।
নৈকট্যের দুটি প্রধান উপাদান
ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর বাণী উদ্ধৃত করে ফারাহজাদ বলেন, ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর নৈকট্য অর্জনের দুটি প্রধান উপাদান হলো
আনুগত্য (এতা‘আত)
খাঁটি নিয়ত (ইখলাস)
আনুগত্য
আল্লাহ বলেন কুরআনে: “হে মুমিনগণ! আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশালী তাদেরও।” (সূরা আন-নিসা ৪:৫৯)
প্রকৃত আনুগত্য মানে আল্লাহ যা চান তা মেনে চলা। অনেক মানুষ নিজেদের অভ্যাস, সামাজিক রীতি বা ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। অথচ ইমামের নৈকট্য অর্জনের শর্ত হলোÑনিজের চাওয়া নয়, বরং আল্লাহর চাওয়াকে অনুসরণ করা।
ইখলাস
কুরআনে আল্লাহ বলেন: “তাদেরকে আদেশ করা হয়নি, শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার জন্য, তাঁর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে।” (সূরা আল-বাইয়্যিনা ৯৮:৫)
ইখলাস মানে প্রতিটি আমলকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদন করা। লোক দেখানো, প্রশংসা লাভ বা দুনিয়ার স্বার্থ অর্জনের জন্য করা আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর মানুষের জন্য তার নিয়ত অনুযায়ী ফল হবে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
শয়তানের কুমন্ত্রণার ঝুঁকি: হুজ্জাতুল ইসলাম ফারাহজাদ সতর্ক করে বলেন, যারা সন্দেহপ্রবণ এবং শয়তানের কুমন্ত্রণায় ভোগে, তারা বাস্তবে শয়তানের দাসে পরিণত হয়।
কুরআনে আল্লাহ সতর্ক করেছেন: “নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু, তাই তোমরা তাকে শত্রæ হিসেবে গ্রহণ করো।” (সূরা ফাতির ৩৫:৬)
অতএব, ইমামের নৈকট্য অর্জনের পথে শয়তানের কুমন্ত্রণাকে প্রতিহত করা অপরিহার্য।
নৈকট্যের পথ: নিয়তের পবিত্রতা
ইমাম হাসান আসকারি (আ.) ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন: “আনুগত্য ও ইখলাসে ভরা হৃদয়গুলো তোমার দিকে ধাবিত হবে।” (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৭৮, পৃ. ৩৮০)
অর্থাৎ যাদের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও নিখাঁদ নিয়ত রয়েছে, কেবল তারাই ইমামের প্রকৃত নৈকট্য লাভ করতে সক্ষম হবে।
ফারাহজাদ বলেন, অধিকাংশ মানুষ আমল করে দুনিয়ার স্বার্থে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়। অথচ নিয়ত যদি খাঁটি হয়, তবে অল্প আমলও মহামূল্যবান হয়ে যায়। আর নিয়ত যদি কলুষিত হয়, তবে বড় আমলও মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
উপসংহার: ইমাম মাহদী (আ.ফা.) আমাদের মাঝে উপস্থিত থেকেও অচেনা। তাঁর নৈকট্য অর্জনের জন্য বাহ্যিক দর্শন নয়, বরং আন্তরিক আনুগত্য ও নিয়তের পবিত্রতাই মূল চাবিকাঠি।
কুরআনে আল্লাহ বলেন: “যারা আমাদের জন্য সংগ্রাম করে, অবশ্যই আমি তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব।” (সূরা আল-আনকাবুত ২৯:৬৯)
আমরা যত বেশি আল্লাহর আদেশ মানতে শিখব, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচব এবং আমলকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করব, ততই ইমামের নৈকট্যের পথে এগিয়ে যাব।
অতএব, গায়বাতের এই যুগে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো
আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকা
নিয়তকে খাঁটি করা
রিয়া ও দুনিয়াবাসনার প্রভাব থেকে বাঁচা
কেবল এভাবেই আমরা ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর প্রকৃত সান্নিধ্য লাভ করতে পারব।

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔