ভাষান্তরঃ হুজ্জাতুল ইসলাম মো. মুনীর হোসেন খান
- ‘যদি কেউ মহান আল্লাহর নিদর্শনাদির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তাহলে তা তো হবে তার হৃদয়ের তাকওয়া প্রসূত।’ (স‚রা হজ্ব: ৩২)
- ‘নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়াহ আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যুম।’ (স‚রা বাকারাহ্: ১৫৮)
- ‘এবং কা’বার জন্য উৎসর্গীকৃত উটকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যুম নিদর্শন করেছি। এতে তোমাদের জন্য মঙ্গল রয়েছে।’ (স‚রা হজ্ব: ৩৬)
নিঃসন্দেহে মহানবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। তার প্রমাণ প্রাগুক্ত আয়াতসম‚হ। যেখানে সাফা-মারওয়াহ্ পাহাড়দ্বয় এবং হজ্বের কুরবানির উটকে মহান আল্লাহর নিদর্শন বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেখানে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মহান আম্বিয়া ও আউলিয়ায়ে কেরাম বিশেষ করে ন‚রনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, ইমাম হোসাইন (আ.) মহান আল্লাহ পাকের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনাদির অন্যুম। আর তাঁকে সম্মান করা পবিত্র কুরআনের ভাষায় অন্তরের তাক্ওয়াস্বরূপ। তাঁর শাহাদাতের মাসে তাঁকে স্মরণ করা, তাঁর মহান ত্যাগ ও কর্মকাণ্ড আলোচনা করে তা থেকে শিক্ষা নেয়া, অনুপ্রাণিত হওয়া, কারবালার মরুপ্রান্তরে পাপিষ্ঠ ইয়াযীদ, ইবনে যিয়াদের বাহিনীর হাতে তাঁর ও তাঁর সংগী-সাথীদের হৃদয়বিদারক শাহাদাতবরণ ও নির্যাতনের কথা স্মরণ, তাঁদের পুণ্য স্মৃতিকে চিরজাগরুক ও অবস্থান রাখার জন্য শোকানুষ্ঠান পালন, কান্না কাটি ও অশ্রুপাত করা, আসলে তাঁকে অর্থাৎ আল্লাহর নিদর্শনাদির প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তা অন্তরের তাকওয়াপ্রস‚ত। আর তাঁর শোকে শোকাভিভ‚ত না হয়ে হাসি-আনন্দ প্রকাশ করাই যে শয়তান, ইয়াযীদ ও ইয়াযীদীদের অনুসরণ এবং তাক্ওয়াবিরোধী তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ইমাম হোসাইন (আ.) মহানবীর আহলে বাইতের অন্যুম সদস্য। অগণিত হাদীস বিশেষ করে প্রসিদ্ধ হাদীসে কিসার মাধ্যমে প্রমাণিত যে, স্বয়ং মহানবী (সা.), হযরত ফাতেমা, হযরত আলী, হযরত হাসান ও হযরত হোসাইনকে নিয়ে মহানবী (সা.)-এর আহলে বাইত বা নবী পরিবার- যাঁদেরকে মহান আল্লাহ স‚রা আহযাবের ৩৩ নং আয়াতে মাসুম বা সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র (নিষ্পাপ) বলে ঘোষণা করেছেন। মহান আল্লাহ্ বলেন:
- ‘হে (নবীর) আহলে বাইত! নিশ্চয় মহান আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে সকল অপবিত্রতা ও পাপ-পঙ্কিলতা দ‚র করতে এবং তোমাদেরকে প‚র্ণরূপে পবিত্র করতে।’ (স‚রা আহযাব: ৩৩)
অতএব, প্রমাণিত হয় যে, ইমাম হোসাইন (আ.) আহলে বাইতের অন্যুম সদস্য হওয়ার কারণে সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র (মাসুম)।
এ কারণেই মহানবী (সা.) ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন সম্পর্কে বলেছেন: ‘হাসান ও হোসাইন উভয়েই বেহেশতের যুবকদের নেতা।’ (জামে আত্ তিরমিযী, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ. ৩৫০)
সহীহ্ তিরমিযীতে ইয়ালা ইবনে মুয়রা থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন: ‘হোসাইন আমার থেকে এবং আমি হোসাইন থেকে। যে ব্যক্তি হোসাইনকে ভালোবাসে আল্লাহ্ তাকে ভালোবাসেন। নাতিদের মধ্যে একজন হলো হোসাইন।’ (৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ. ৩৫৪)
সালমান ফার্সী (রা.)-এর নিকট থেকে বর্ণিত : মহানবী (সা.) বলেছেন: ‘হাসান ও হোসাইন আমার দুই পুত্র (নাতি)। যে তাদেরকে ভালোবাসে সে আমাকেই ভালোবাসে, আর যে আমাকে ভালোবাসে মহান আল্লাহ্ তাকে ভালোবাসেন। আর যাকে মহান আল্লাহ্ ভালোবাসেন তাকে তিনি জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যে তাদেরকে ঘৃণা করে সে আমাকেই ঘৃণা করে, আর যে আমাকে ঘৃণা করে মহান আল্লাহ্ তাকে ঘৃণা করেন। আর যাকে মহান আল্লাহ ঘৃণা করেন তাকে তিনি জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।’ (আলামুল ওয়ারা, পৃ ২১৯)
৪র্থ হিজরীর ৩ শা’বান ইমাম হুসাইনের জন্মগ্রহণ করার সুসংবাদ মহানবীকে দেয়া হলে তিনি দ্রুত হযরত আলী ও হযরত ফাতেমার ঘরে চলে যান এবং আসমা বিনতে উমাইসকে বলেন: ‘হে আসমা! আমার সন্তানকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’ আসমা বিনতে উমাইস সদ্য ভ‚মিষ্ঠ হোসাইনকে একটি সাদা কাপড়ে জড়িয়ে মহানবীর কাছে আনলেন। মহানবী (সা.) হোসাইনকে নিজের কাছে টেনে নিলেন, তাঁর ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামাত দিলেন। তারপর তিনি হোসাইনকে কোলে নিয়ে কাঁদতে লাগলেন। তখন আসমা বিনতে উমাইস জিজ্ঞাসা করলেন: ‘আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আপনি কেনো কাঁদছেন?’
মহানবী (সা.) বললেন: ‘আমি আমার এ পুত্রকে দেখে কাঁদছি।’
আসমা জিজ্ঞাসা করলেন: ‘এ তো এই মাত্র ভ‚মিষ্ঠ হয়েছে।’
মহানবী (সা.) তখন আসমাকে বললেন: ‘হে আসমা! আমার পর একদল খোদাদ্রোহী তাকে হত্যা করবে। আমি তাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহর কাছে শাফায়াত করব না।’এরপর তিনি বললেন: ‘হে আসমা! তুমি ফাতেমাকে এ ব্যাপারে কিছু বলো না। কারণ, সে সবেমাত্র সন্তান প্রসব করেছে।’
তারপর আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে তাঁর নাতির নাম রাখার জন্য নির্দেশ দিলে তিনি আলীর দিকে তাকিয়ে বললেন: এর নাম রাখ ‘হোসাইন।’ (আল্লামা তাবারসী প্রণীত আলামুল ওয়ারা বি আ’লামিল হুদা, পৃ. ২১৭)
হাদীসে সাকালাইন: যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ‘রাস‚লুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রেখে গেলাম যা তোমরা মজবুতভাবে ধারণ (অনুসরণ) করলে আমার পর কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তার একটি অপরটির চাইতে অধিক মর্যাদাপ‚র্ণ ও গুরুত্বপ‚র্ণ: আল্লাহর কিতাব যা আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত প্রসারিত এবং আমার ইতরাৎ (বংশধর ও সন্তান) আমার আহলে বাইত। এ দু’টি কখনও বিচ্ছিন্ন হবে না হাউযে কাওসারে আমার কাছে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত। অতএব, তোমরা লক্ষ্য কর আমার পরে এতদুভয়ের সাথে তোমরা কীরূপ আচরণ কর।’ (জামে আত্-তিরমিযী, ৬ষ্ঠ খÐ, পৃ. ৩৬০, হাদীস নং ৩৭২৬)
যেহেতু ইমাম হোসাইন (আ.) মহানবীর ইতরাৎ অর্থাৎ সন্তান এবং আহলে বাইত তাই তাঁর সাথে পবিত্র কুরআনের সম্পর্ক যে অবিচ্ছেদ্য তা এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়।
মুবাহিলার আয়াত: ‘অতঃপর তোমার নিকট সত্য জ্ঞান এসে যাওয়ার পর যদি এ ব্যাপারে তোমার সাথে কেউ বিবাদ করে, তাহলে বল: এসো, আমরা ডাকি আমাদের পুত্রদের এবং (তোমরা) তোমাদের পুত্রদেরকে (ডাক), (আমরা ডাকি) আমাদের নারীদেরকে (তোমরা ডাক) তোমাদের নারীদেরকে, এবং (আমরা ডাকি) আমাদের নিজ সত্তাদেরকে (আমাদের একান্ত আপন লোকদেরকে) তোমরা (ডাক) তোমাদের নিজ সত্তাদেরকে (তোমাদের একান্ত আপন ব্যক্তিদেরকে)। আর তারপর চল আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত (লা’নত) করি।’ (স‚রা আলে ইমরান: ৬১)
এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর মহানবী (সা.) নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধিদলকে মুবাহালার আহ্বান জানান যারা হযরত ঈসা (আ.)-কে উপাস্য প্রতিপন্ন করার জন্য মহানবীর সাথে বাদানুবাদ করছিল। মহানবী (সা.) হযরত ফাতেমা, হযরত আলী, ইমাম হাসান এবং ইমাম হোসাইনকে সাথে নিয়ে মুবাহালার জন্য প্রস্তুত হয়ে আসেন। এ আত্মবিশ্বাস দেখে নাজরানের খ্রিস্টান পাদ্রী সাথীদেরকে বলতে থাকেন: ‘তোমরা জান যে, তিনি আল্লাহর নবী। আল্লাহ্র নবীর সাথে মুবাহালা করলে তোমাদের ধ্বংস অনিবার্য। তাই মুক্তির কোনো পথ খোঁজ।’ সংগীরা বলল: ‘আপনার মতে মুক্তির উপায় কী?’ তিনি বললেন: ‘আমার মতে নবীর শর্তানুযায়ী সন্ধি করাই উত্তম উপায়।’ এরপর এ ব্যাপারে প্রতিনিধিদল সম্মত হয় এবং মহানবী (সা.) তাদের ওপর জিযিয়া কর ধার্য করে মীমাংসায় উপনীত হন। (ইবনে কাসীরের তাফসীর, ১ম খন্ড)
মহানবী (সা.) হাসান, হোসাইন, ফাতেমা ও আলীকে নিয়ে মুবাহালার উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় ‘হে (নবীর) আহলে বাইত! নিশ্চয় মহান আল্লাহ চান তোমাদের থেকে সকল পাপ-পঙ্কিলতা ও অপবিত্রতা দ‚র করতে এবং তোমাদের প‚র্ণরূপে পবিত্র করতে’-এ আয়াত পাঠ করে বললেন, ‘এরাই আমার আহলে বাইত।’ আর মুবাহালা করতে যাওয়ার সময় মহানবী (সা.) মুসলমানদেরকে মুবাহালার স্থান থেকে দ‚রে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
মুবাহালার ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, মহানবীর নবুওয়াতের সত্যুার অন্যুম সাক্ষ্যদাতা হযরত ইমাম হোসাইন (আ.)। মহান আল্লাহ যাঁকে বেহেশতের যুবকদের নেতা করেছেন তাঁকেই তিনি তাঁর নবীর নবুওয়াতের সত্যুার সাক্ষী করেছেন।
সমগ্র মুসলিম উম্মাহ মহানবীর যুগ থেকে নামাযে হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর বংশধরদের ওপরই কেবল দরূদ পড়ে আসছে; আর এরই অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন। এ দুর্লভ মর্যাদা ও সম্মান আর কেউ পাননি। দরূদটি নিম্নরূপ:
- “হে আল্লাহ! শান্তি বর্ষিত কর মুহাম্মদ ও তাঁর বংশধরের উপর, যেরূপে শান্তি বর্ষণ করেছিলে ইব্রাহিম ও তাঁর বংশধরের উপর, নিশ্চয়ই তুমি মহিমান্বিত ও প্রশংসার অধিকারী।
- হে আল্লাহ! বরকত দান কর মুহাম্মদ ও তাঁর বংশধরের উপর, যেরূপে বরকত দান করেছিলে ইব্রাহিম ও তাঁর বংশধরের উপর, নিশ্চয়ই তুমি মহিমান্বিত ও প্রশংসার অধিকারী।
আয়াতুল মাওয়াদ্দাহ্: ‘বলুন, আমি (আমার রিসালাতের দায়িত্ব পালন ও দাওয়াতের জন্য) তোমাদের কাছে একমাত্র আমার নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভক্তি-ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য (মাওয়াদ্দাহ্) ব্যুীত আর কোনো পারিশ্রমিক চাই না।’ (সুরা-শুরা: ২৩)
অগণিত রেওয়ায়েত অনুসারে এবং অনেক মুফাস্সিরের মতে উপরিউক্ত আয়াতটি আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইনের শানে অবতীর্ণ হয়েছে।ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ‘ফাযায়েলুস সাহাবা’ গ্রন্থে আমেরের স‚ত্রে বর্ণনা করেছেন, উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হলে সাহাবাগণ মহানবী (সা.)-কে বললেন: ‘আপনার নিকটাত্মীয় কারা যাঁদের প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা আমাদের ওপর ওয়াজিব করা হয়েছে?’ মহানবী (সা.) তাঁদেরকে বললেন: ‘আলী, ফাতেমা এবং তাদের দু’পুত্র।’ এ কথা তিনি তিনবার বললেন।
ইমাম শাফেয়ী যথার্থ বলেছেন: ‘হে রাস‚লুল্লাহর আহলে বাইত! তোমাদের ভালোবাসা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরয এবং তা তিনি পবিত্র কুরআনে অবতীর্ণ করেছেন। তোমাদের গর্বের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, যে ব্যক্তি তোমাদের ওপর দরূদ পড়বে না তার নামাযই হবে না।’
ওপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইমাম হোসাইন (আ.) ছিলেন প‚ত-পবিত্র চরিত্র ও বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী এক অসাধারণ মহাপুরুষ যিনি মহানবীর আহলে বাইতের অন্যুম সদস্য, মহানবীর নবুওয়াতের সাক্ষ্যদাতা, বেহেশতের যুবকদের নেতা। মহান আল্লাহ তাঁকে এ সুমহান মর্যাদার অধিকারী করেছেন। তাঁর রয়েছে পবিত্র কুরআনের সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। তিনি সত্যের ম‚র্ত প্রতীক। তিনি মহানবী থেকে এবং মহানবীও তাঁর থেকে। কুরআনের নির্দেশে তাঁকে ভালোবাসা মুসলিম উম্মাহ্র ওপর ফরয।
আসুন আমরা আল্লাহর এই অনন্য নিদর্শনকে যথাযথ মর্যাদা দান করি ও তাঁর অনুসরণ করে জীবনকে সৌভাগ্যের সোপানে উন্নীত করি।###
