অনুবাদকঃ মাওলানা মোঃ শহিদুল হক, শিক্ষক, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা।
আয়াতসমূহঃ
- ১- সম্মান করাঃ “নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।” (সূরা আল-হুজুরাতঃ ১৩)
- ২-পরহেযগারী সর্বোত্তম পোশাকঃ “হে বনী-আদম! আমি তোমাদের জন্যে পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং অবতীর্ণ করেছি সাজ-সজ্জার বস্তু এবং পরহেযগারীর পোশাক, এটি সর্বোত্তম। এটি আল্লাহর কুদরতের অন্যতম নিদর্শন, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।” (সূরা আল আ’রাফঃ ২৬)
- ৩-আল্লাহ পরহেযগারদের সাথে রয়েছেনঃ “আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, যারা পরহেযগার, আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন।” (সূরা আল বাকারাঃ ১৯৪)
- ৪-ন্যায়বিচারঃ “এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর। এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর।” (সূরা আল-মায়েদাহঃ ৮)
- ৫-সত্য ও মিথ্যা নির্ধারণঃ “হে ঈমানদার! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করতে থাক, তবে তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন এবং তোমাদের থেকে তোমাদের পাপকে সরিয়ে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন, বস্তুতঃ আল্লাহর অনুগ্রহ অত্যন্ত মহান।” (সূরা আল-আনফালঃ ২৯)
হাদীসসমূহঃ
- ১-খোদাভীরুতার গুরুত্বঃ আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “খোদাভীরুতা সাফল্যের চাবিকাঠি।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ২, পৃ. ৭৪৬)
- ২-নৈতিক চরিত্রের প্রধানঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “পরহেযগারীতা নৈতিক চরিত্রের প্রধান।” (গুরারুল হেকাম, খন্ড ২, পৃ. ৭৪৬)
- ৩-উত্তম পোশাকঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “পরহেযগারীর পোশাক ভদ্র ও উত্তম পোশাক।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ২, পৃ. ৭৪৭)
- ৪-আম্বিয়াদের চরিত্রঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “তোমার জন্য প্রয়োজন খোদাভীরুতা অবলম্বন করা কারণ খোদাভীরুতা হল আম্বিয়াদের চরিত্র।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ২, পৃ. ৭৪৭)
- ৫-উত্তম পথের সম্ভারঃ মাওলায়ে কায়েনাত আলী (আ.) বলেছেনঃ “পরহেযগারীতা উত্তম পথের সম্ভার।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ৭৪৫)
বিশ্লেষণঃ ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার মানদন্ড কোন গোত্র ও সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্কিত নয় বরং পরহেযগারী ও খোদাভীরুতার সাথে সম্পর্কিত। যে কারণে হযরত নূহ (আ.)-এর পুত্রকে পানিতে ডুবিয়ে মারা হয়েছে এবং সালমান ফার্সীকে (রা.) আহলে বাইত (আ.)-এর সাথে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
নিজেকে গোনাহ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখা এবং ধ্বংসশীল বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা করা, যা এমন এক সত্যতা, যাকে কুরআনুল কারীম ও রেওয়ায়েতে ‘তাকওয়া’ বলে অবিহিত করেছে। তাকওয়া এমন অবস্থার নামকে বলা হয় যা গোনাহ থেকে দূরে থেকে এবং আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে অর্জিত হয়। আর তাকওয়া ধর্মীয় স্বীকারোক্তি ও আত্মিক সৌন্দর্যের মধ্যে একটি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। শুধুমাত্র মুত্তাকী ও পরহেযগার ব্যক্তিদের মধ্যে আল্লাহর হেদায়েতের চিহ্ন দৃশ্যমান হয়, আর বেহেশতও একমাত্র খোদাভীরুদের জন্য তৈরী করা হয়েছে।
আল্লাহর নিকট দোয়া করি ইমামূল মুত্তাকিন হযরত আলী ইবনে আবি তালেব (আ.) এর উসিলায় আমাদেরকে মুত্তাকী ও পরহেযগার হওয়ার তৌফিক দান করেন।
ঘটনাবলীঃ
১-পরহেযগার যুবকঃ এত্তেসার গোত্রের এক ব্যক্তি বলেনঃ গরমের দিনে একদিন রাসূল করীম (স.)-এর সাথে একটি গাছের ছায়ায় বসে ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি আসল যে তার শরীর থেকে জামা খুলে গরম বালুর ওপর গড়াগড়ী শুরু করল, কখনো বুক কখনো পিট কখনো মুখ গরম বালুর ওপর রেখে বলতে লাগলঃ হে আত্মা! এই গরম বালুর কষ্ট সহ্য কর কেননা বিশ্ব স্রষ্টা আল্লাহর আযাব এর থেকে অধিক কষ্টকর।
রাসূল করীম (স.) এ ঘটনা দেখতে লাগলেন, যখন যুবক ঐ জায়গা থেকে উঠে জামা পরে আমাদের দিকে তাকিয়ে চলে যাবে তখন রাসূল করীম (স.) তাকে নিজের কাছে ডাকলেন। যখন সে হযরত (স.)-এর নিকট আসল তখন হযরত (স.) তাকে বললেনঃ হে আল্লাহর বান্দা! আমি কখনো কাউকে এ ধরণের কাজ করতে দেখিনি, এ কাজ করার উদ্দেশ্য কি? সে বললঃ আল্লাহর ভয়ে, আমি মনস্থ করেছি এভাবে কামভাব ও উদ্ধত্য থেকে নিজেকে রক্ষা করব।
পয়গম্বার (স.) বললেনঃ তুমি আল্লাহকে ভয় করার হক্ আদায় করেছ। আল্লাহ তায়ালা তোমার মাধ্যমে আসমানবাসীর ওপর গর্ব করেন। এরপর হযরত (স.) তাঁর সাহাবীদেরকে বললেনঃ সকল লোকজন এই বন্ধুর নিকট জড়ো হও যাতে সে তোমাদের জন্য দোয়া করে। সকল সাহাবী জড়ো হলে সে এভাবে দোয়া করলঃ হে পালনকর্তা! আমাদের জীবনকে হেদায়েতের ওপর দৃঢ রাখ, তাকওয়াকে আমাদের জন্য পথের সম্ভার ও বেহেশতকে আমাদের জন্য সর্বশেষ ঠিকানা তৈরী কর। [তওবা অগুশে রহমত (উর্দু ভাষায়), পৃ. ২৪৭]
২- পরোয়ারদেগার পরহেযগারদের আমল কবুল করেনঃ হযরত ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেনঃ আমি আহলে সুন্নাতের এক ব্যক্তির প্রচুর প্রশংসা শুনেছি এবং তার আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও মাহত্মের অনেক গল্প শুনে তাকে দেখার ইচ্ছাপোষণ করছিলাম।
হঠাৎ একদিন একটি জায়গায় দেখলাম লোকজন তার আশপাশে জড়ো হয়ে আছে আর সে লোকজনকে তার নিকট থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। সে কাপড় দ্বারা তার চেহারা ঢেকে রেখেছে শুধু তার কপাল ও চোখ দেখা যাচ্ছে। সে ভক্তদের থেকে নিজেকে আড়াল করতে চেয়ে অবশেষে সে একা একটি রাস্তায় গিয়ে হাঁটতে শুরু করল। আমিও নিরবে তার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলাম। রাস্তার ধারে একটি রুটির দোকান ছিল, সেখানে লোকজনের বেশ ভিড় ছিল, ঐ ব্যক্তি সেখানে গেল, আমি দেখলাম সে ঐ দোকান থেকে দু‘টি রুটি চুরি করে নিয়ে হাঁটতে লাগল। কিছু দূরে এক ব্যক্তি ডালিম বিক্রি করছিল, সে বিক্রেতার অন্যমনস্কতার সুযোগে দু‘টি ডালিম চুরি করল। আমি এ ঘটনা দেখে খুব আশ্চর্যান্বিত হলাম যে, এই ব্যক্তিও চুরি করে।
কয়েক পা হাঁটার পর রাস্তায় সে এক অসুস্থকে দেখতে পেল, সে ঐ রুটি দু‘টি ও ডালিম দু‘টি তাকে দিয়ে দিল। আমি তাকে ডাক দিলে সে দাঁড়িয়ে গেল। আমি তাকে বললামঃ হে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার বেশ প্রশংসা শুনেছি এবং তোমাকে দেখার বেশ ইচ্ছা ছিল, কিন্তু আজ আমি তোমাকে দেখলাম, তবে তোমার এ অবস্থা দেখে খুব দুঃখ ও আফসোস হল।
সে বলল, তুমি কি দেখেছো এবং আমার কোন কথায় তুমি দুঃখ পেয়েছো?
ইমাম (আ.) বললেনঃ আমি তোমাকে রুটির দোকান থেকে দু’টি রুটি ও ডালিমের দোকান থেকে দু’টি ডালিম চুরি করতে দেখেছি। যখন আমি এ কথা বললামঃ তখন সে আমাকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত জিজ্ঞেস করল তুমি কে?
আমি বললামঃ আমার সম্পর্ক রাসূল (স.)-এর আহলে বাইতের সাথে।
সে আমার বাড়ীর কথা জিজ্ঞেস করল, আমি বললামঃ আমার বাড়ী মদীনায়। সে বললঃ আমার বিশ্বাস আপনি জাফর বিন মুহাম্মাদ বিন আলী বিন হোসাইন (আ.)।
আমি বললামঃ ঠিক, আমি তাই।
ঐ ব্যক্তি বললঃ রাসূল করীম (স.)-এর সাথে তোমার সম্পর্ক থাকায় তোমার কি উপকার হল? যেহেতু তুমি তোমার নানার জ্ঞান থেকে অজ্ঞ।
আমি বললামঃ বল, আমি কোন কারণে অজ্ঞ?
সে বললঃ হয়তো তুমি কুরআনের এই আয়াত পড়নি, যেখানে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেনঃ
“যে ব্যক্তি একটি নেক কাজ করবে তার আমলনামায় দশটি নেকি লেখা হবে, আর যে একটি অন্যায় করবে তার শাস্তি একটি অন্যায়ের পরিমাণ হবে।”
তাহলে শোনঃ আমি দু’টি রুটি ও দু’টি ডালিম চুরি করেছি, আমার আমলনামায় চারটি গোনাহ লেখা হবে। এরপর আমি ঐ দু’টি রুটি ও দু’টি ডালিম আল্লাহর রাস্তায় এক অসুস্থ ব্যক্তিকে দান করেছি, তাহলে আমার আমলনামায় চল্লিশটি নেকী লেখা হল। চল্লিশটি নেকী থেকে চারটি বিয়োগ করলে ছত্রিশটি নেকী অবশিষ্ট থাকবে।
আমি [ইমাম (আ.)] তার কথা শুনে বললামঃ “তোমার মা তোমার দুঃখে কাঁদবে।” তোমার তো আল্লাহর কেতাব সম্পর্কে বিন্দু পরিমানও জ্ঞান নেই। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে স্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছেনঃ “আল্লাহ পরহেযগারদের আমলসমূহ কবুল করেন।”
তুমি দু’টি রুটি ও দু’টি ডালিম চুরি করেছ। তোমার আমলনামায় চারটি গোনাহ লেখা হল, পরে তুমি ঐ জিনিসগুলো মালিকের বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করেছ, তোমার আমলনামায় আরো চারটি গোনাহ লেখা হল। এভাবে তোমার আমলনামায় আটটি গোনাহ লেখা হল, যেখানে একটিও নেকি লেখা হলো না। ঐ ব্যক্তি ইমাম (আ.)-এর যুক্তি শুনে হতভম্ব হয়ে কাঁদতে শুরু করল। (পান্দে তারিখ, খন্ড ৪, পৃ. ১৪১; গাঞ্জিনে মায়ারেফ, খন্ড ১, পৃ. ৩১০)###
