পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে প্রশিক্ষণ

by Rashed Hossain

অনুবাদকঃ মাওলানা মোঃ শহিদুল হক

আয়াতসমূহঃ

  1. প্রশিক্ষণের নমুনা : “তোমাদের জন্যে রাসূলূল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।” (সূরা আহযাবঃ ২১)
  2. আন্বিয়াদের (আ.) প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য : “তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।” (সূরা আল-জুমুআহঃ ২)
  3. সন্তানদের ওপর পিতা-মাতার অধিকার : “তাদের সামনে ভালবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বলঃ হে পালনকর্তা, তাঁদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।” (সূরা বনী ইসরাঈলঃ ২৪)
  4. সন্তানের প্রশিক্ষণের গুরুত্ব : “মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ তাআলা যা আদেশ করেন তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয় তাই করে।” (সূরা আত-তাহরীমঃ ৬)
  5. সরল পথ : “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার পালনকর্তা এবং তোমাদেরও পালনকর্তা-তাঁর এবাদত কর, এটাই হলো সরল পথ।” (সূরা আল-ইমরানঃ ৫১)

হাদীসসমূহঃ

  1. উত্তম উত্তরাধিকারী : হযরত ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেনঃ “পিতা-মাতা তাঁর সন্তানের জন্য যেসব উত্তরাধিকারী রেখে যায় তার মধ্যে উত্তম উত্তরাধিকারী হল শিষ্টাচার, ধন-সম্পদ না।” (উসুলে কাফী, খন্ড ৮, পৃ. ১৫০)
  2. প্রশিক্ষণের সূচনা : মাওলা আলী (আ.) বলেছেনঃ “উত্তম শিষ্টাচার হল, যে নিজ নিজে থেকে শুরু করে।” (মিযানুল হেকমাহ, খন্ড ১, পৃ. ৫৪)
  3. প্রশিক্ষণের জন্য দোয়া : ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেছেনঃ “(হে আল্লাহ!) বাচ্চাদেরকে প্রশিক্ষণ এবং সংশোধন ও তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য কর।” (সাহিফেহ কমেলাহ, দোয়া নং ২৫, পৃ. ২৩৫)
  4. আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালবাসার প্রশিক্ষণ দেয়া : আল্লাহ রাসূল (স.) বলেছেনঃ “নিজের বাচ্চাদেরকে তিনটি জিনিস শিক্ষা দাও।”
  • নিজ নবী (হযরত মুহাম্মাদ (স.)-এর প্রতি ভালবাসা।
  • তাঁর আহলে বাইতের (আ.) প্রতি ভালবাসা।
  • কুরআন তেলাওয়াত করা।

৫- নেককার সন্তানঃ
রাসূল করীম (স.) বলেছেনঃ “নেককার সন্তান বেহেশতের ফুলের মধ্যের একটি ফুল।” (উসুলে কাফী, খন্ড ৬, পৃ. ৩)

বিশ্লেষণ : বাচ্চাদের লালন-পালনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট চেষ্টা ও মনোযোগী হওয়া দরকার, কারণ বাচ্চারা বড়দের কাজকর্ম ও চাল-চলন দেখে পরে ঐগুলো করে থাকে। বাচ্চারা মনে করে যাকিছু বড়রা করে তা ভাল, তাই আমাদেরও ঐ কাজ করতে হবে। এ কারণে আমাদের ঐ কাজ ও কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে যার বিরূপ প্রভাব বাচ্চাদের ওপর পড়তে পারে। কারণ আমাদের বাচ্চারা খুবই সৎ ও সরল-সোজা। যদি বাচ্চাদেরকে ভাল প্রশিক্ষণ দিতে পারি তাহলে তারা বড় হলে আমাদের জন্য গর্বের কারণ হবে আর যদি বাচ্চাদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিতে না পারি তাহলে তারা আমাদের জন্য অপমান ও অপদস্থের কারণ হবে।

কুরআন ও রেওয়ায়েতে গুরুত্বের সাথে বলা হয়েছে যে, তুমি ও তোমরা পরিবারকে দোযখের আগুন থেকে বাঁচাও। তাদেরকে কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রশিক্ষণ দাও, কেননা বাচ্চারা বেহেশতের ফুলের মধ্যের একটি ফুল। এমন না হয় আমাদের বাচ্চারা খারাপ পথে অগ্রসর হল। বর্তমানে সমাজ খুব দ্রুত খারাপ পথে অগ্রসর হচ্ছে। একটি বাচ্চাকে সুশিক্ষা দেয়ার অর্থ একটি পরিবারকে সুশিক্ষা দেয়া।

আল্লাহর কাছে দোয়া করি মুহাম্মাদ (স.) ও তাঁর পরিবারের অসিলায় আমাদেরকে নিজ বাচ্চাদের সঠিক প্রশিক্ষণ দেয়ার তৌফিক দান করেন। (আমিন)

ঘটনাবলী :
১- নেক সন্তানের গুরুত্ব : রাসূল করীম (স.) বলেছেনঃ একদিন হযরত ঈসা (আ.) একটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন; তখন তিনি দেখলেন ঐ কবরবাসীর আযাব হচ্ছে। আবার পরের বছর যখন ঐ কবরের পাশ দিয়ে যচ্ছিলেন তখন দেখলেন ঐ কবরবাসীর আর আযাব হচ্ছে না। হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে বললেন, হে আমার পরোয়ারদেগার! এক বছর পূর্বে যখন এই কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন কবরবাসীর আযাব হচ্ছিল কিন্তু এ বছর আর আযাব হচ্ছে না এর রহস্য কি?
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হযরত ঈসা (আ.)-কে ওহীর মাধ্যমে বললেনঃ হে আল্লাহর রুহ! এই মৃতব্যক্তির একটি পুত্র ছিল সে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর লোকজনের জন্য একটি রাস্তা তৈরী করেছে, একজন ইয়াতিমকে আশ্রয় দিয়েছে, এই ব্যক্তির ছেলের দু’টি নেক কাজ করার কারণে তার গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। (গাঞ্জিনে মায়ারেফ, খন্ড ৩, পৃ. ২৩৬, ও এবরাত আঞ্জিজে অকেয়াত, পৃ. ১২৮)

২- খাদ্যের প্রভাব : আল্লামা মুহাম্মাদ তাকী (র.) একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যা আয়াত, রেওয়ায়েত ও অভিজ্ঞতার সাথেও সামঞ্জস্য পূর্ণ। আল্লামা মুহাম্মাদ তাকী মাজলেসী (র.) ইসফাহানের জামে মসজিদে নামাজ পড়াতেন। এক রাতে তাঁর সন্তান মুহাম্মাদ বাকের মাজলেসী (র.) কে মসজিদে নিয়ে আসলেন যাতে মসজিদের আঙ্গিনায় খেলাধুলা করে সময় ব্যয় করতে পারেন। আল্লামা মুহাম্মাদ তাকী (র.) নামাযে মশগুল ছিলেন তখন মুহাম্মাদ বাকের মাজলেসী (র.) মসজিদের আঙ্গিনায় রাখা পানি ভর্তি মশকটিকে ছিদ্র করলেন আর তা থেকে যে পানি বেরিয়ে আসল তা দ্বারা খেলতে লাগলেন। নামাযের পর আল্লামা মুহাম্মাদ তাকী মাজলেসী (র.) যখন জানতে পারলেন তখন ভীষণ রাগান্বিত হলেন। ঘরে গিয়ে স্ত্রীর সামনে বসে জিজ্ঞেস করলেনঃ আমি তোমার গর্ভব হওয়ার পূর্বে এবং গর্ভব হওয়ার পরে খাদ্য-খাবারের ক্ষেত্রে ইসলামী বিধান মেনে চলেছি, এবং এই সন্তান জন্মের পর আজ পর্যন্ত প্রশিক্ষণের নিয়মানুযায়ী আমল করেছি, কিন্তু আজ তার আচরণে আমাদের দু’জনের কোন একজনের অসতর্কতার চিহ্ন প্রকাশ পেয়েছে। সন্তানের মা বললেনঃ গর্ভব অবস্থায় একদিন প্রতিবেশীর ঘরে যাওয়ার প্রয়োজন হল, সেখানে ডালিম গাছের ডালিমগুলো আমাকে আকৃষ্ট করল। তখন আমি ডালিমের স্বাদ গ্রহণের জন্য সুচ দ্বারা একটি ডালিমের রস বের করে স্বাদ গ্রহণ করেছিলাম।

জেনে রাখুনঃ গর্ভকালীন সময়ে মা প্রতিবেশীর একটি ডালিমের এভাবে স্বাদ গ্রহণ করার কারণে সন্তানের ব্যক্তিত্বের ওপর যদি এতই প্রভাব পড়ে তাহলে সর্বদা হারাম খাদ্য গ্রহণকারীর সন্তানকে ইসলাম ও মানবতা থেকে কত দূরে সরিয়ে দেবে? (তাহজিবে জেন্দেগী, লেখকঃ মাওলানা সাইয়্যেদ শাহেনশা হোসেইন নাকাভী, পৃ. ২০৪)###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔