“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি। যাতে তোমরা মুত্তাকী হও।” (আল-কোরআন)
মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন এবং আধ্যাত্মিক আনন্দ উপভোগ করার এক অনন্য বারতা নিয়ে সমাগত মাহে রমজান। এই মাসে মু’মিন ব্যক্তি তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং নৈতিক উৎকর্ষ সাধানের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার উচ্চ শিখরে আরোহণ করে। এই মাসে বেহেশতের দরজাগুলি খুলে যায়, জাহান্নামের দরজাগুলি বন্ধ হয়ে যায়, আর শয়তান বাঁধা পড়ে শিকলে। ফলে এই মাসটি বান্দার জন্য জাগতিক বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার এবং আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা অর্জনের অবারিত সুযোগ এনে দেয়।
ইসলামী বর্ণনাগুলোতে রমজান মাসকে বলা হয়েছে বান্দার জন্য খোদায়ী আতিথেয়তা গ্রহণ এবং তাঁর সাথে গভীর প্রেমময় সম্পর্ক তৈরির মাস। সকল গাফিলতি থেকে বেরিয়ে আসার এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতি মনোনিবেশের মাধ্যমে দয়মায় আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার একটি সুযোগ। নিচে যে প্রধান চারটি কারণে পবিত্র রমজান মহিমান্বিত হয়েছে সেগুলো আলোচনা করা হলো।
এক: মহানবী (সা.)-এর কলবে কুরআন নাযিল
পবিত্র রমজান মাসে মহানবী (সা.)-এর কলব মোবারকে কুরআন অবতীর্ণ হয়। নবুওতি মিশন শুরুর আগে ও পর্যায়ক্রমে কুরআন নাযিল হওয়ার আগে একবারে তাঁর কলবে কুরআন নাযিল হওয়ার ঘটনা ইঙ্গিত করে যে এমনকি বে’সাতের পূর্বেও কুরআনের ওপর তাঁর পূর্ণ দখল ছিল। কুরআনের কিছু কিছু আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবী (সা.) মাঝে মাঝে এমন সব আয়াত পাঠ করতেন যা তখনও বাহ্যত নাযিল হয়নি। যেমন সূরা ত্বাহা’র ১১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আপনার উপর কুরআনের ওহী সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাড়াহুড়ো করেন না।” প্রতীয়মান হয় যে কুরআনের পর্যায়ক্রমিক নুযুলের পূর্বেও মহানবী (সা.) এর হকিকতের সাথে পরিচিত ছিলেন। অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর সাথে কুরআন ও এর হকিকতসমূহের মধ্যে গভীর সম্পর্কের পরিচয় পাওয়া যায়।
দুই. শবে কদর এবং এর অপার মহিমা
কদরের রজনী হলো পবিত্র রমজান মাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য। কুরআন সূরা আল-কদরে এই রজনীর গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেছে: “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম”। কদরের রজনীটি ঐশ্বরিক রহস্যে মোড়ানো। এর প্রকৃত সঠিক সময়টি জানা যায় না। তবে রেওয়ায়াতে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলো বিশেষ করে ঊনিশ, একুশ এবং তেইশতম রাতকে কদরের সম্ভাব্য রাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই রজনীতে ইবাদত করা এক হাজার মাস (প্রায় ৮৩ বছর) ইবাদতের সমতুল্য, যা এই রাতের অতুলনীয় মাহাত্ম্য এবং বরকতের কথা তুলে ধরে। লাইলাতুল কদর হল ইলাহী হকিকতসমূহ বোঝার, তওবা করার এবং আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জনের একটি অবারিত সুযোগ। এই রজনীতে আমরা সেই সমস্ত আমল আঞ্জাম দিতে পারি যা আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কদরের রাতে নামাজ আদায় করে, তার পাপ ক্ষমা করা হবে, যদিও তা আকাশের তারার সংখ্যার সমান হয় এবং পাহাড়ের সমান ভারী হয়।” (ওয়াসায়িলুশ শিয়া : ৪/২৭৩) ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত একটি রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে যে, কদরের রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে আসে এবং নামাজরত মু’মিনদের অভ্যর্থনা জানান।
তিন : রমজান মাসে আমলের সওয়াব বেড়ে যায়
বরকতময় রমজান এমন একটি মাস যেখানে আমলের সওয়াব অনেকগুণে বৃদ্ধি পায়। এই মাসে কুরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করার সওয়াব সম্পূর্ণ কুরআন খতম করার সমতুল্য। আর মুস্তাহাব নামাযসমূহ (যেমন তাহাজ্জুদের নামায) এর সওয়াব সারা জীবনের ইবাদতের সমতুল্য। এমনকি ফরয নামাযসমূহ যেমন যোহর ও আসরের নামাযও এই মাসে জামাতের সহিত আদায় করার সওয়াব হাজার গুণেরও বেশি। একটি হাদিসে আল্লাহর রাসূল (সা.) উপদেশ দিয়ে বলেন: “রমজান মাসে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করো।” (ফাযায়েলু আল-আশহুর আস-সালাসাহ্: ৯৫) অতএব, কুরআন তেলাওয়াত করা এই মাসের সেরা আমলগুলির মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয় এবং মু’মিনদের এই দিনগুলির মূল্যবান সুযোগ গ্রহণ করা এবং আয়াতগুলি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা ও অনুধ্যানের মাধ্যমে এই বরকতময় মাসের বরকত থেকে প্রচুর পরিমাণে উপকৃত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
রমজান মাসে আল্লাহর বান্দাদের সেবা করারও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং নবী (সা.) জোরারোপ করে বলেছেন যে এই মাসে আমাদের উচিত আল্লাহর সাথে এবং মানুষের সাথে সম্পর্ককে শক্তিশালী করা। এই মাসে ভালো কাজগুলো ছোট হলেও তার মাধ্যমেও অশেষ সওয়াব অর্জন করা যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর খুতবায়ে শা‘বানীয়্যা’র মধ্যে বলেন: “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রমজান মাসে একজন রোজাদারকে ইফতারী দিবে, সে আল্লাহর কাছে একজন দাস মুক্ত করার সওয়াব পাবে এবং তার অতীতের পাপ ক্ষমা করা হবে।” রমজানে রোজাদারকে ইফতারী করানো অত্যন্ত পুণ্যের কাজ এবং এর সওয়াব রোজাদারের সওয়াবের সমান বলে মনে করা হয়। রমজান মাসে সওয়াবের এই বৃদ্ধি, আমাদের অতীত ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ঘাটতিসমূহ পূরণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ করে দেয়। ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) রমজান মাসে প্রতিদিন দরিদ্র ও অভাবীদের সাহায্য করতেন। এ ব্যাপারে ইমামকে প্রশ্ন করা হলে জবাবে তিনি বলেন: রমজান মাস ক্ষমা ও রহমতের মাস, এবং আমি এই সুযোগটি অন্যদের সাহায্য করার এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাজে লাগাতে চাই।
চার : গোনাহ থেকে দূরে থাকা এবং তাকওয়াকে শক্তিশালী করা
এটা হলো মাহে রমজানের পরম শিক্ষা। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন: “আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এই মাসে সর্বোত্তম কাজ।” রমজানে পানাহার থেকে রোজা রাখার পাশাপাশি চোখ, কান এবং জিহ্বারও রোজা পালন করা উচিত। ইমাম আলী (আ.) বলেন: “অন্তরের রোজা জিহ্বার রোজার চেয়ে উত্তম, আর জিহ্বার রোজা পেটের রোজার চেয়ে উত্তম।” (গুরারুল হিকাম: ১/৪১৭) তিনি আরও বলেন: “যে ব্যক্তি রমজান মাসে তার জিহ্বাকে গীবত ও মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত রাখে, তার রোজা কবুল করা হবে।” পবিত্র কুরআনে (মায়িদা: ২৭) ইরশাদ হচ্ছে : “নিশ্চয়ই, আল্লাহ কেবল তাদের কাছ থেকে কবুল করেন যারা সৎকর্মপরায়ণ।” এই মাসে রোজা ও অন্যান্য আমল কবুল হওয়ার শর্ত হচ্ছে গোনাহ থেকে বিরত থাকা এবং তাকওয়ার শক্তিতে বলীয়ান হওয়া। এভাবে রমজান মাস একজন মু’মিনকে তাকওয়াবান করে তোলে, যা রোজাদারের জন্য রমজানের সেরা উপহার।
রমজান মাসে রোজা পালনের মাধ্যমে একজন রোজাদার ব্যক্তি নিজের এবং তার প্রতিপালকের সাথে বন্দেগীর পথে অবিচল থাকার এবং গোনাহ্ থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করে। এই অঙ্গীকার তার জীবনের শেষ অবধি বহাল থাকা কাম্য।
কোনো এক ঈদুল ফিতরের দিন, ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) একদল লোককে অসার খেলাধুলা এবং অপ্রয়োজনীয় হাসাহাসিতে লিপ্ত থাকতে দেখেন এবং বলেন: “সর্বশক্তিমান আল্লাহ রমজান মাসকে তাঁর বান্দাদের জন্য একটি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র করে দিয়েছেন, যাতে তারা তাঁর আনুগত্যের জন্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতা করে। যারা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল তারা সফল, আর যারা ব্যর্থ হয়েছিল তারা হতাশ এবং পরাজিত। এটা খুবই আশ্চর্যজনক যে যারা এমন একটি দিনে অলস খেলাধুলা এবং হাসিতে লিপ্ত, যখন ধার্মিকদের পুরস্কৃত করা হবে এবং দুষ্টরা ক্ষতি এবং ধ্বংসের সম্মুখীন হবে। আল্লাহর কসম! যদি পর্দা তুলে ফেলা হয়, তাহলে তারা অবশ্যই জানতে পারবে যে ধার্মিকরা তাদের পুরষ্কার পেয়েছে এবং দুষ্টরা তাদের কাজের জন্য শাস্তি পাবে।”
ইমামের এই কথাগুলি আমাদের আধ্যাত্মিক সুযোগগুলি কাজে লাগানোর গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়, বিশেষ করে রমজান মাস এবং ঈদুল ফিতরের দিনে।
ঐশ্বরিক করুণা ও ক্ষমার মাস রমজান তার সমস্ত রহমত ও বরকত নিয়ে সমাগত হয়েছে, দেখতে দেখতে বিদায়ও নিবে। তবে এর আধ্যাত্মিক প্রভাব থেকে যাবে আমাদের সাথে, জীবনের শেষ পর্যন্ত।
127
