পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

by Syed Yesin Mehedi

ইসলামি জীবনবিধানে মহান আল্লাহর ইবাদতের পরেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পিতা-মাতার প্রতি সদয় আচরণ ও তাদের সেবা করার ওপর। এটি কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি ঈমানের একটি অপরিহার্য অংশ। পিতা-মাতা হলেন সন্তানের জন্য দুনিয়াতে আল্লাহর পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ নেয়ামত এবং জান্নাত লাভের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম।

পবিত্র কুরআনের নির্দেশ ও আলোকপাত

পবিত্র কুরআনের একাধিক স্থানে আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের সাথে সাথে পিতা-মাতার প্রতি ইহসান বা উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন।

১. সূরা বনী ইসরাঈল (আয়াত: ২৩-২৪):

“আপনার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না এবং তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো। আর তাদের সামনে বিনয় ও নম্রতার ডানা নত করে দাও এবং বলো: হে আমার পালনকর্তা! তাদের প্রতি দয়া করো, যেভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।”

২. সূরা লুকমান (আয়াত: ১৪):

“আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছেন এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। ফিরে আসা তো আমারই কাছে।”

আহলে বাইত (আ.)-এর পবিত্র হাদিস ও শিক্ষা

পবিত্র আহলে বাইত (আ.)-এর ইমামগণ পিতা-মাতার সেবাকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছেন এবং এর গুরুত্ব অত্যন্ত সুচারুভাবে বর্ণনা করেছেন।

১. ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর বাণী: ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন, “পিতা-মাতার প্রতি সদয় হওয়া এবং তাদের সাথে উত্তম আচরণ করা একজন মানুষের নেক আমলের পাল্লাকে ভারী করে এবং তার রিজিকে বরকত দান করে।” তিনি আরও বলেন, “যদি ‘উহ’ বলার চেয়ে কম কোনো শব্দ কষ্টের অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য থাকত, তবে আল্লাহ তা-ও হারাম করে দিতেন।” (তথ্যসূত্র: আল-কাফি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪৮)

২. ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর দোয়া (রিসালাতুল হুকুক): ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তাঁর বিখ্যাত ‘রিসালাতুল হুকুক’-এ মায়ের অধিকার সম্পর্কে বলেছেন, “মায়ের অধিকার হলো তুমি জানবে যে—তিনি তোমাকে এমনভাবে (গর্ভে) বহন করেছেন যেখানে কেউ কাউকে বহন করে না, তিনি তোমাকে তাঁর হৃদয়ের ফল খাইয়েছেন যা কেউ কাউকে খাওয়ায় না। তিনি তোমাকে নিজের চোখ, কান, হাত, পা এবং সব কিছু দিয়ে রক্ষা করেছেন। তিনি নিজে ক্ষুধার্ত থেকে তোমাকে খাইয়েছেন, তৃষ্ণার্ত থেকে তোমাকে পান করিয়েছেন এবং নিজে রোদে পুড়ে তোমাকে ছায়ায় রেখেছেন।”

৩. ইমাম মুহাম্মদ বাকের (আ.)-এর শিক্ষা: ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন, “তিনটি বিষয় এমন যাতে আল্লাহ কোনো ছাড় দেননি: ১. আমানত রক্ষা করা (মালিক ভালো হোক বা মন্দ), ২. অঙ্গীকার পূরণ করা, ৩. পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা (তারা নেককার হোক বা গুনাহগার)।” (তথ্যসূত্র: বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৭৪)

আমাদের দায়িত্ব ও করণীয়

  • বিনয় প্রদর্শন: পিতা-মাতা বৃদ্ধ হলে তাদের সাথে কখনও উচ্চস্বরে কথা না বলা এবং সব সময় বিনয়ের সাথে কথা বলা।

  • সেবা ও আনুগত্য: আল্লাহর অবাধ্যতা হয় না এমন প্রতিটি কাজে তাদের আদেশ মেনে চলা এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া।

  • দোয়া করা: তারা জীবিত থাকুন বা মৃত, সব সময় তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করা।

  • আর্থিক দায়িত্ব: সন্তান সামর্থ্যবান হলে পিতা-মাতার যাবতীয় খরচ বহন করা তার ওপর আবশ্যিক দায়িত্ব।

পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত। যারা পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়, তাদের ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। অন্যদিকে, যারা তাদের সেবা করে, আল্লাহ তাদের জন্য দুনিয়াতে বরকত এবং পরকালে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করেন। আসুন, আমরা আমাদের পিতা-মাতার প্রতি আরও যত্নশীল হই এবং তাদের দোয়ার মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে ধন্য করি।

ইয়াসিন/ ফজর

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔