বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.): ইসলামী ঐক্যের মূল অক্ষ

by Syed Yesin Mehedi

সত্য ও মিথ্যার লড়াই চলছে মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই। মূর্তিপূজারী মুশরিক ও কাফিররা ইসলামের ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধি, বিকাশ ও জনপ্রিয়তা দেখে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর পবিত্র অস্তিত্ব এবং ইসলাম ধর্ম নির্মূলের আশায় প্রতিদিন নানা ষড়যন্ত্র করত।
সে যুগেও যেমন শত্রুরা ইসলামের অগ্রযাত্রায় আতঙ্কিত ছিল এবং ইতিহাসে তাদের দুর্বলতা বারবার প্রমাণিত হয়েছে, ঠিক তেমনি এ যুগেও ইসলামের শত্রুরা সর্বশক্তি নিয়ে এ পবিত্র ধর্মের মহাপুরুষের চরিত্রহননের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, যাতে ইসলামকে নির্মূল করা যায়।
ইসলামী ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী একসময় বলেছিলেন, “মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের শত্রুরা আজ ইসলামী গণজাগরণের প্রবল জোয়ার দেখে পিছিয়ে পড়ার গ্লানি অনুভব করছে, তাই তারা পাগলের মতো আচরণ করছে।”
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। মানুষের কুসংস্কার ও অজ্ঞতার আঁধার দূর করার ক্ষেত্রে অনন্য সাফল্যের অধিকারী এই মহামানব ছিলেন সাম্য, দয়া ও ক্ষমার সর্বোচ্চ মানবীয় প্রতীক। তিনি মানুষের অন্তরগুলোকে ঘনিষ্ঠ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি মানুষের মধ্যে ধর্মীয় সম্পর্ক ও চিন্তাগত ভিত্তিগুলোকে মজবুত করেছিলেন, ফলে মুসলমানরা আজ তাঁর ইন্তেকালের ১৪০ বছর পরও তাঁকে ঘিরে ঐক্যবদ্ধ এবং একই অঙ্গীকারে আবদ্ধ।
শহীদ আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী মনে করতেন, “বিশ্বনবী (সা.)-এর পবিত্র অস্তিত্ব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন চিন্তাধারা বা আকীদা-বিশ্বাস ও সব মুসলিম জাতির ভালোবাসার সম্মিলন-বিন্দু বা মিলনমেলা।”
তিনি বিশ্বনবী (সা.)-এর মর্যাদা প্রসঙ্গে বলেছেন, “বিশ্বনবী (সা.)-এর মধ্যে সব নবী-রাসূল ও আউলিয়ার গুণের সমাবেশ ঘটেছে। তিনি উচ্চতর সেইসব গুণাবলির পরিপূর্ণ ও পরিপক্ক সংস্করণ—যেসব গুণ যুগে যুগে নবী-রাসূল ও আউলিয়ার মধ্যে দেখা গেছে।”
সম্প্রতি আমেরিকায় বিশ্বনবী (সা.)-এর প্রতি অবমাননাকর ছায়াছবি নির্মাণকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের অনুচরদের গভীর বিদ্বেষের প্রমাণ বলে উল্লেখ করেছিলেন ইরানের এই মহান নেতা। তিনি এ ব্যাপারে পশ্চিমা সরকারগুলোর উদাসীনতা ও নির্বিকার অবস্থানকে মুসলিম বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করতেন।
তিনি আরও বলেছিলেন, “যারা সবচেয়ে দেরিতে সত্যকে বিশ্বাস করেন, এমন সবাই বুঝতে পেরেছেন যে, সত্য ও মিথ্যার লড়াইগুলো কোন অক্ষকেন্দ্রিক। বোঝা গেল, মূল অক্ষটি হলো ইসলাম ও শেষ নবী (সা.)-এর অস্তিত্ব।”
পরিহাসের বিষয় হলো, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো একদিকে ইসলাম-অবমাননার এসব পদক্ষেপের নিন্দা জানাচ্ছে না এবং এই মহাঅপরাধের ব্যাপারে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছে না, অন্যদিকে নিজেরাও এই অবমাননার কাজে জড়িত নয় বলে দাবি করছে।
প্রয়াত এই ইরানি নেতা মনে করতেন, মার্কিন ও ইউরোপীয় সরকারগুলোকে বাস্তবে প্রমাণ করতে হবে যে তারা এই অপরাধে জড়িত নয়; কেবল মুখে অস্বীকার করলেই চলবে না। তিনি বলেছিলেন, “অবশ্য পশ্চিমারা এসব আগ্রাসনের পথ বন্ধ করবে না। এর কারণও স্পষ্ট; ইসলাম ও ইসলামের পবিত্রতার প্রতি অবমাননার পেছনে পশ্চিমা মাধ্যম বা মহলগুলোর বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে। বৃহত্তর ইসলামী জাগরণের জোয়ার দেখেই তারা এ ধরনের উন্মাদসুলভ আচরণ করছে।”
তিনি আরও বলেছেন, “পশ্চিমা সরকারগুলো বলছে, আমরা বাকস্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের তৎপরতা বন্ধ করতে পারি না! বিশ্বের কে এ কথা বিশ্বাস করবে? কারণ, এসব দেশ বিভিন্ন বিষয়ে বাকস্বাধীনতার লালসীমা নির্ধারণ করে রেখেছে এবং কেউ ওই সীমানা লঙ্ঘন করতে গেলেই তাদের সঙ্গে কঠোরতম ও সহিংস আচরণ করে ওই সীমানাগুলো রক্ষা করে তারা; অথচ কেবল ইসলামের পবিত্রতার প্রতি অবমাননার ক্ষেত্রেই তারা বাকস্বাধীনতা রক্ষা করাকে জরুরি মনে করছে।”
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান নাৎসিদের হাতে ইহুদি-নিধনের যে কথিত দাবি রয়েছে—যা খুবই সন্দেহজনক ও অপ্রমাণিত—সে বিষয়ে এবং সমকামিতার মতো অনাচারের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য ও ইউরোপে প্রশ্ন তোলাও নিষিদ্ধ।
তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন, “আমেরিকাতে কেউ যদি সমাজতত্ত্ব ও মনোস্তত্ত্বের আলোকে সমকামিতার বিরুদ্ধে কিছু লিখতে চান এবং তা ছাপাতে বা প্রকাশ করতে চান তবে তাঁকে তা করতে দেওয়া হবে না। তাই তারা বাকস্বাধীনতা মানতে বাধ্য—এ দাবির কি কোনো ভিত্তি আছে? আসলে এখানে ইহুদিবাদীদের নোংরা রাজনীতি সক্রিয়। এসব বিষয়ে বাকস্বাধীনতার কোনো বালাই নেই। কেউ সাহসই করে না ও কারও অধিকার নেই এসব নোংরা নীতির বিরুদ্ধে কিংবা হলোকাস্টের বিরুদ্ধে কিছু বলার বা প্রকাশ করার! অথচ ইসলাম অবমাননা ও মুসলিম বিশ্বের যুবসমাজের কাছে ইসলামের পবিত্রতাগুলোকে হালকাভাবে তুলে ধরতে চাইলে তার অনুমতি রয়েছে এবং তা পাশ্চাত্যে বৈধ!”
আজ বিশ্বজনমত মার্কিন ও ইহুদিবাদী নীতির বিরোধী। শহীদ খামেনেয়ী মনে করতেন, কেবল মুসলমানরাই নয়, ন্যায়বিচারকামী ও মুক্তিকামী সব মানুষই সাম্রাজ্যবাদীদের নানা জুলুম এবং ঐশী ধর্মগুলোর অবমাননার ব্যাপারে ক্ষুব্ধ। এসব জুলুম ও অবমাননার কারণে তারা এখন পাশ্চাত্য ও ইসরাইলকে আগের চেয়েও বেশি ঘৃণা করছে। অন্যদিকে এসব অবমাননা মুসলমানদেরকে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করছে।
তিনি বলেছেন, “আপনারা আজ ইসলামী দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখুন সেখানে কী হচ্ছে? মুসলিম জাতিগুলো আজ কতটা ফুটন্ত ও টগবগে হয়ে উঠেছে তথা ক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেখাচ্ছে। তাদের বেশিরভাগই (রাসূল-অবমাননার) ওই ছায়াছবিটি দেখেননি। তারা শুধু এটুকুই জেনেছে যে, রাসূল (সা.) ও ইসলামের প্রতি অবমাননার একটি ঘটনা ঘটেছে। মুসলিম জাতিগুলো ও জনগণ কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাসূল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্ময়কর। আরব দেশগুলোতে বড় বড় মূর্তি, দাম্ভিক শক্তি ও বড় ধরনের তাগুতি তথা খোদাদ্রোহী ও জালেম শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতাসীন রয়েছে এবং এরা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে নিয়মিত ষড়যন্ত্রের নানা নীলনকশা তৈরি করে চলেছে; কিন্তু তা সত্ত্বেও আরব দেশগুলোর জনগণ প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। ইউরোপ ও আমেরিকাসহ অমুসলিম বহু দেশে মুসলমানরা ও অমুসলমানরাও ময়দানে এসেছেন প্রতিবাদ জানাতে। আর এ থেকেই ইসলামী দুনিয়ার প্রকৃত ক্ষমতা ফুটে উঠেছে।”
শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সব মুসলমানই আজ রাসূল (সা.)-এর অবমাননার বিরুদ্ধে আন্তরিক চিত্তে প্রতিবাদ করছে, কারণ মহানবী (সা.) সব মাজহাবের কাছেই ইসলামী আদর্শের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
তিনি মনে করতেন, শত্রুরা মুসলিম উম্মাহর ক্ষোভ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিভেদকামী ষড়যন্ত্র করছে, কিন্তু তারা ভুলে গেছে যে বিশ্বনবী (সা.) মুসলিম মাজহাবগুলোর অভিন্ন নীতির অন্যতম প্রধান অক্ষ।
বিশ্বনবী (সা.)-এর প্রশংসা করে তিনি আরও বলে গেছেন, “মহানবী (সা.) যেন বিশ্বজগতের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র।… তিনি একাই বহু সৌরজগৎ নিয়ে গঠিত গ্যালাক্সির মতো এবং তাঁর মধ্যে রয়েছে হাজারো গুণের সমন্বিত প্রজ্জ্বলিত উপস্থিতি। তাঁর মধ্যে সম্মিলিত হয়েছিল জ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিকতা, প্রজ্ঞার সঙ্গে রাষ্ট্রনায়কত্বের সমাহার, মিলন ঘটেছিল আল্লাহর ইবাদতের সঙ্গে সৃষ্টির সেবার গুণ, জিহাদের সঙ্গে দয়ার সংমিশ্রণ, খোদাপ্রেমের সঙ্গে খোদার সৃষ্টির প্রেমের গুণ, সম্মান ও নম্রতার অপূর্ব সমন্বয়।”

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔